–কী করবো বলল, ঘরে বসে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছি।
–তাই বলে আবার ঘরবাড়ি ছেড়ে, অজানা অচেনা দেশে নানা’!
–বুঝছো না কেন–ফ্রান্সিস কে বোঝাতে লাগলো, রাজা সোক্কাসনের অতিথি হয়ে আমি যাচ্ছি। দেশটা এমন কিছু দূরেও না।
–তবু বিপদ আপদের কথা কি কিছু বলা যায়?
–তাই যদি বলো মা, তাহলে তো এক্ষুনি ভূমিকম্প হতেপারে, তখন কোথায় থাকবে তুমি, আর কোথায় থাকবো আমি।
–অমন অলুক্ষুণে কথা বলিস নে। মা বলল।
–ঠিক আছে, আজই চলো রাজার যাদুঘর দেখতে।
–কেন।
–কত দূর-দূর দেশ থেকে আমরা কী এনেছি তোমাকে দেখাবো।
–সে তো সব শুনেছি।
–শুধু শুনেছো, আজকে নিজের চোখে দেখবে, চলো।
কিছুক্ষণের মধ্যে মা তৈরি হয়ে নিল। ফ্রান্সিসও তৈরি হয়ে মাকে ডাকতে এলো। আজকে খুব খুশী। মা তো সোনার ঘণ্টা, হীরে, মুক্তো এসব দেখেনি। আজকে দেখবে।
ওদের গাড়ি চললো। অনেকদিন পরে বাইরে বেরিয়ে মা’র ভালোই লাগছিল। যাদুঘরের সামনে এসে গাড়ি দাঁড়াল। ফ্রান্সিস কে হাত ধরে গাড়ি থেকে নামালো। যাদুঘরের দরজায় দু’জন ভাইকিং সৈন্য খোলা তরোয়াল হাতে পাহারা দিচ্ছিলো। দু’জনেই ফ্রান্সিসকে চিনতে পেরে মাথা নুইয়ে সম্মান জানালো।
প্রথম ঘরটাতে রাখা ছিল সোনার ঘণ্টাটা। মা তো সোনার ঘণ্টা দেখে হতবাক। এত বড়ো ঘণ্টা, তাও নিরেট সোনায় তৈরি। মা বিশ্বাস করতে চাইল না। ফ্রান্সিস হেসে বলল, হাত দিয়ে দেখো।
মা ঘণ্টাটার গায়ে হাত বুলোতে লাগলো। মা’র তখনও বিস্ময়ের ভাব কাটে নি। বলল, তোরা এটা এনেছিস।
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস বলল, চলো মা পাশের ঘরে।
পাশের ঘরে রাখা হয়েছে হীরের টুকরো দুটো। আবার মা’র অবাক হবার পালা। এতো বড় হীরে? মা’র সংশয় তবু যেতে চায় না। বলল, এই সবটাই হীরে?
ফ্রান্সিস হাসলো, যা-মা।
পরের ঘরটায় গেল ওরা। একটু উঁচু বেদীমত করা হয়েছে সেখানে। গাঢ় বেগুনী রঙের ভেলভেট কাপড়ে ঢাকা। তা’তে মুক্তোগুলো রাখা হয়েছে। এত বড়ো-বড়ো মুক্তো? মা’র মুখে আর কথা নেই। পাশেই রাখা হয়েছে লা ব্রুশের লুঠ করা মোহর অলঙ্কার ভর্তি বাক্স দুটো। ফ্রান্সিস বলল, মা তোমাকে তো লা ব্রুশের গল্প বলেছি। এসব হচ্ছে ঐ কুখ্যাত খুনী জলদস্যুটার সম্পত্তি।
মা অবাক হয়ে দেখতে লাগল। কত মোহর, কত অলঙ্কার। ফ্রান্সিস বলল, মা, তুমি এই থেকে একটা অলঙ্কার নেবে?
–না। মা দৃঢ়স্বরে বলল, কত নিরীহ মানুষের রক্তে ভেজা ও সব অলঙ্কার। এসব পরলে অমঙ্গল হয়।
ফ্রান্সিস বুঝলো, মাকে অলঙ্কার নিতে রাজী করানো যাবে না। মা আর একবার সব ঘুরে ঘুরে দেখল। তারপর গাড়িতে এসে উঠলো। মা’র তখনও বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি। গাড়ি চললো। ফ্রান্সিস একসময় হেসে বলল, এবার বিশ্বাস হলো তো?
–হুঁ। মা আর কোন কথা বলল না।
–এবার বুঝলে তো, তোমার ছেলে কতটা সাহস আর বুদ্ধি রাখে।
–আমার বুঝে দরকার নেই। তুমি আমার চোখে চোখে থাক, তাহলেই হবে। ফ্রান্সিস একটু চুপ করে রইল, তারপর মৃদুস্বরে ডাকল, মা।
–বল।
–তাহলে এবার আমাকে গ্রীনল্যাণ্ডে যেতে দেবে তো?
–আবার?
–রাজা সোক্কাসনের অতিথি হয়ে। ভয়ের কিছু নেই।
–কদ্দিনের মধ্যে ফিরবি?
–কদ্দিন আর? ফ্রান্সিস কে নিশ্চিত করবার জন্যে বললো, মাস দুয়েক। একটু থেমে বলল, মা তুমি রাজী হলেই বাবা আর আপত্তি করবেন না।
–দেখি তোর বাবার সঙ্গে কথা বলে। মা বালাখুশীতে ফ্রান্সিস মাকে জড়িয়ে ধরলো। মা মৃদু হেসে বলল, ছাড় ছাড় পাগল ছেলে।
ক’দিন পরে রাজবাড়ি থেকে গাড়ি এলো। কোচম্যান ফ্রান্সিসকে রাজকুমারীর চিঠি দিলো। চিঠিতে শুধু লেখা
আপনার মুক্তো আনার গল্পটা শুনবো। অবশ্যই আসবেন। –মারিয়া।
মা ফ্রান্সিসকে সাজিয়ে গুছিয়ে দিল। সে রাজপরিবারের গাড়ি চড়ে রাজবাড়িতে চললো।
অন্দরমহলে একজন পরিচারিকা ওকে একটা ঘরে বসালো। কী সুন্দর সাজসজ্জা সেই ঘরে। দেয়ালে লাল-হলুদ পাথর বসানো। নানা রঙের মোজাইকের কাজকরা মেঝে। জানলায় রঙীন কাঁচ। তার মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো নানা রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে ঘরটাতে। মারিয়া ঘরে ঢুকলো। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়ালো, মাথা নুইয়ে সম্মান জানালো। একটা হালকা সবুজ রঙের গাউন পরেছে মারিয়া। মাথায় সোনালী চুল বিনুনী বাঁধা কী সুন্দর যে লাগছে দেখতে। ফ্রান্সিস কথা বলবে কি, ওযেন একটা স্বপ্নের ঘোরে ডুবে গেল।
–খেয়ে নিন আগে।
মারিয়ার কথায় ফ্রান্সিস যেন সম্বিত ফিরে পেল। দেখলো, একজন পরিচারিকা শ্বেতপাথরের গ্লাসে সরবৎ এনেছে, সঙ্গে একথোকা আঙ্গুর। ফ্রান্সিস সুগন্ধি সরবতটা একচুমুকেই খেয়ে নিল। তারপর আঙ্গুর খেতে খেতে মুক্তোর সমুদ্রের গল্প বলতে লাগলো। মারিয়া গালে হাত দিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে সেই গল্প শুনতে লাগলো। গল্প সবটা সেদিন শেষ হলো না। আর একদিন আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফ্রান্সিস সেদিন বাড়ি চলে এলো।
আবার একদিন মারিয়ার চিঠি নিয়ে রাজ পরিবারের সেই কালো চকচকে কাঠে সোনালী-রূপালী কাজ করা গাড়িটা এলো। সেদিন সরবৎ আপেল খাওয়ার পর ফ্রান্সিস মুক্তোর সমুদ্রের গল্পটা বলতে লাগল, জলের নীচে নেমে দেখি একটা নরম নীলচে আলো। মেঝের মতো তলায় কত মুক্তো ছড়ানো। সেই আলো আসছে ছড়ানো মুক্তোগুলো থেকে। সে এক অপার্থিব দৃশ্য। অবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখছি, হঠাৎ গা ঘেঁষে চলে গেলো কুৎসিত মুখে একটা লাফ মাছ।
