–উনি কি সেটা বলে যান নি? –ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।
–না। কারণ চিরশত্রু ইউনিপেডদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তিনি হঠাৎ মারা যান। কাজেই স্ত্রী-পুত্র বা মন্ত্রী কাউকেই গুপ্তধনভাণ্ডারের কথা বলে যেতে পারেন নি। এই নিয়ে আমার দেশে অনেক লোককাহিনী প্রচলিত আছে।
–আচ্ছা, উনি গীর্জা তৈরি করিয়েছিলেন?
–হ্যাঁ, এবং বেশ যত্নের সঙ্গেই সেটা তৈরি করিয়েছিলেন।
–তাহলে খৃষ্টধর্মের প্রতি তার যথেষ্ট শ্রদ্ধাভক্তি ছিল।
–তা ছিল।
–তার ব্যবহৃত কী কী জিনিস আপনাদের কাছে আছে?
–অস্ত্রশস্ত্র, কিছু পোশাক আর নরওয়ের ভাষায় অনুদিত বাইবেল।
–উনি কি নিজেই অনুবাদ করেছিলেন?
–হ্যাঁ, আমাদের তাই বিশ্বাস।
–হুঁ। ফ্রান্সিস একটু থেমে ভাবল। তারপর বলল, ঐ গুপ্তধন কোথায় আছে বলে আপনাদের ধারণা?
–রাজপ্রাসাদের গীর্জায় অথবা সুক্কারটপ পাহাড়ের নীচে কোথাও।
–আপনারা ভালোভাবে খুঁজে দেখেছেন?
–কয়েক পুরুষ ধরেই খোঁজাখুজি চলছে। কিন্তু কেউ কোন হদিস করতে পারে নি।
–এবার রাজা সোক্কাসন, বলুন আমাকে কী বলতে চান?
সোক্কাসন একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। দাড়িতে হাত বুলোলেন। তারপর বললেন, দেখুন, ভেবে দেখলাম আপনি শুধু দুঃসাহসীই নন, বুদ্ধিমানও। আপনিই পারবেন, এ গুপ্তধনের হদিস বার করতে। দেশের রাজা হিসেবে, আপনাকে আমাদের দেশে যাবার সাদর আহ্বান জানাচ্ছি।
ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, আপনার আমন্ত্রণে আমি সত্যিই খুব আনন্দিত। কিন্তু আমার মা এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়নি। কাজেই এখনই আমি কিছু বলতে পারছি না।
–ঠিক আছে, আপনি সময়-সুযোগমত যাবেন। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, আপনার মা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠুন। সোক্কাসন বললেন।
–ফ্রান্সিস সব শুনলো। ভাইকিংদের রাজা এগিয়ে এলেন। দু’জনেই উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস বলল, হ্যাঁ মহারাজ।
–কী? এরিক দ্য রেডের ধন-ভাণ্ডার খুঁজে বের করতে পারবে? রাজা মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন।
–বাট্টাহালিডে আগে যাই, সব দেখে শুনে তবেই বলতে পারবো।
রাজামশাই একটু আমতা আমতা করে বললেন, ইয়ে–আমি তেমাকেই এই কাজের উপযুক্ত বলে মনে করি। তবে তোমাকে কিন্তু বাবা-মার সম্মতি নিয়ে যেতে হবে।
–বেশ।
ফ্রান্সিস সোক্কাসনকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কবে দেশে ফিরছেন?
–দু-তিনদিনের মধ্যেই।
–আচ্ছা, তাহলে চলি। ফ্রান্সিস দু’জনকেই মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানিয়ে রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটকের দিকে পা বাড়াল। রাজার গাড়িওর জন্যেই অপেক্ষা করছিল। গাড়িতে চড়েও বাড়ির দিকে এল। মাঝপথে এরিকদ্য রেডের গুপ্তধনের কথা ভাবতে ভাবতে এল। ফ্রান্সিসের একঘেঁয়ে দিন কাটতে লাগল। বন্ধুরা আসে, গল্পগুজব হয়। ওরা চলে গেলে ফ্রান্সিস আবার একা। সময় পেলেই অবশ্য মার বিছানায়, মা’রপাশে এসে বসে। মা’কে তার আমদাদ নগর, চাঁদের দ্বীপ, আফ্রিকার বন জঙ্গল এসব গল্প শোনায়। ছাড়া ছাড়া ভাবে বলে, মা তাই শোনে। মা’রভাবতেও অবাক লাগে, পৃথিবীতে এমন সবমানুষেরা আছে, এমন সব দেশ আছে। গল্প করার সময়ইও একদিন বলল, মা, তুমি কিআর কোথাও যেতে দেবেনা?
–না। মা শান্তস্বরেই বলল, অনেক হয়েছে, এবার সংসার করো।
ফ্রান্সিস বুঝল, মা’কেরাজী করানো খুবমুস্কিল হবে। ও মা’র কাছে রাজা সোক্কাসনের গল্প করলো, কিন্তু তিনি যে ওকে গ্রীনল্যাণ্ডে যেতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, এসব কিছু বলল না।
কথায় কথায় হ্যারিকে একদিন এরিক দ্য রেডের গুপ্তধন, রাজা সোক্কাসনের আমন্ত্রণের কথা বলল। হ্যারি সব শুনে একটু ভাবল। তারপর বলল, তুমি ওখানে গেলে, তোমাকে ওরা রাজার হালে রাখবে সন্দেহ নেই, কিন্তু পারবে কি গুপ্তধন খুঁজে বের করতে?
–সেটা বাট্টাহালিডে না গিয়ে তো বলতে পারছি না।
–তোমার বাবা-মা যেতে দেবেন?
–না দেন তো আবার জাহাজ চুরি করে ওদেশে যাবো?
আস্তে আস্তে বন্ধুরাও শুনল, রাজা সোক্কাসনের আমন্ত্রণ, এরিক দ্য রেডের গুপ্তধনের কথা। ওরা তো ফ্রান্সিসকে উত্যক্ত করলো, চলো আবার ভেসে পড়ি।
ফ্রান্সিস হাসে আর বলে, হবে হবে, সময় আসুক।
মা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। আবার সংসারের সব ভার কাঁধে তুলে নিয়েছে। ফ্রান্সিস র সঙ্গে বাগান দেখাশোনা করে। অনেক নতুন ফুলের চারা লাগিয়েছে। কয়েকটা ফলের গাছও লাগিয়েছে। বাগানটা যেন আবার শ্রী ফিরে পেয়েছে।
একদিন দুপুরে বাবা ফ্রান্সিসকে তার নিজের ঘরে ডেকে পাঠালেন। এ-সময়টা বাবা রাজাবাড়িতেই থাকেন। আজকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছেন। ফ্রান্সিস ঘরে ঢুকতেই বাবা বললেন, বসো কথা আছে।
ফ্রান্সিস আসনপাতা কাঠের চেয়ারটায় বসল।
একটু কেশে নিয়ে বাবা বললেন, রাজামশাই আমাকে সব কথা বলেছেন। বাট্টা-হ্যালিড থেকে রাজা সোক্কাসন চিঠি পাঠিয়েছেন। তুমি কবে নাগাদ যেতে পারবে, জানতে চেয়েছেন।
ফ্রান্সিস চুপ করে রইল। কোন কথা বলল না।
–তোমার কী ইচ্ছে?
–বাবা তুমি তো জানো, গৃহবন্দী জীবন আমার অসহ্য।
–হুঁ।
–তোমরা অনুমতি দিলেই আমি যাবো। মা’র শরীর এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। তাছাড়া গ্রীনল্যাণ্ড এমন কিছু দূরের দেশনা। যাচ্ছিও রাজার অতিথি হয়ে।
কিছুক্ষণ চুপ করে দেখে বললেন, দেখি তোমার মা কী বলেন?
ফ্রান্সিস আর মা’কে কিছু বলল না। কিন্তু বাবার কাছ থেকে মা সবকিছুই জানলো। সেদিন মার ঘরে ঢুকতেই মা বলল, হ্যাঁরে, তুই নাকি গ্রীনল্যাণ্ড যাবি ঠিক করেছিস?
