সারা শহর ঘুরে একসময় মিছিলটা শেষ হল রাজপ্রাসাদের সামনের চত্বরে। মুক্তোসুন্ধু বেদীটা আর বাকী সব মুক্তোগুলো রাখা হল রাজার যাদুঘরে। এই যাদু ঘরেই রাখা আছে, সোনার ঘণ্টা’, আর হীরের চাই’ দু’টো। স্থির হল, পরদিন থেকে যাদুঘর উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে জনসাধারণের জন্যে। রাজার ফরমাস অনুযায়ী দু’দিনব্যাপী সারা রাজ্যে আনন্দ উৎসব চলল।
দেশবাসী তাতে মেতে উঠল। চলল খাওয়া-দাওয়া হৈ হল্লা।
ফ্রান্সিস আর বাড়ি থেকে বিশেষ বেরোয় না। মন্ত্রী মশাইও ওর জন্যে পাহারাদার বসায়নি। একঘেয়ে দিন কাটতে লাগল ফ্রান্সিসের। মা মাস খানেকের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠল। এখন হাঁটাচলা, সংসারের সব কাজকর্ম করে। ফ্রান্সিস আর তার বাবা দু’জনেই নিশ্চিন্ত হলেন। ফ্রান্সিস সময় কাটাবার জন্যে কী করবে ভেবে পায় না। কখনও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ছক্কা পাঞ্জা ফেলে, নয়তোবিছানায় শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবে! হ্যারি, বিস্কো আর অন্যান্য বন্ধুরা অনেকেই আসে। গল্প-গুজব হয়। তবু ফ্রান্সিসের একঘেঁয়েমি কাটতে চায় না।
কিছুদিন কাটলো। একদিন সকালে রাজার একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল ফ্রান্সিসের বাড়ির সামনে। কোচম্যান বাড়ির ভেতরে এল। সঙ্গে একটা চিঠি। ফ্রান্সিস বাইরের ঘরে এসে ওর কাছ থেকে চিঠিটা নিল। রাজা লিখেছেন–
স্নেহের ফ্রান্সিস,
পত্রপাঠ আমার সঙ্গে দেখা কর। বিশেষ প্রয়োজন।
আর কিছুই লেখেন নি রাজামশাই। ফ্রান্সিসও ভেবে পেল না, কী এমন প্রয়োজন পড়লো যে, রাজা একেবারে গাড়ি পাঠিয়ে দিলেন।
অল্পক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিস ভালো পোশাক–টোশাক পরে তৈরি হয়ে নিয়ে গাড়ি চেপে চলল রাজামশায়ের সঙ্গে দেখা করতে। রাজপ্রাসাদের সামনের চত্বরে এসে গাড়ি দাঁড়াতেই একজন প্রাসাদরক্ষী এগিয়ে এল। মাথা নুইয়ে ফ্রান্সিসকে সম্মান জানিয়ে মৃদুস্বরে বলল, মহানুভব রাজা আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে বলেছেন।
ফ্রান্সিস ওর পেছনে পেছনে চলল। সুসজ্জিত কয়েকটা ঘর পেরিয়ে রাজবাড়ির ভেতরে একটা পুকুরের ধারে এল। পুকুরটার চারধার শ্বেতপাথরে বাঁধানো। পরিষ্কার নীল জল তাতে। অনেক মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। কত রঙের কত রকমের মাছ। তারপরেই একটা বাগানমত। এলাকাটা রাজার নিজস্ব চিড়িয়াখানা। বাঘ, ময়ূর, সাপের খাঁচা পেরিয়ে দেখল, রাজামশাই একটা নতুন খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। খাঁচাটায় একাট মেরুদেশীয় শ্বেত ভল্লুকের বাচ্চা। রাজা ভালুকটাকে গমের দানা খাওয়াচ্ছেন, আর পাশে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোকের সঙ্গে মৃদুস্বরে কথা বলছেন।
ফ্রান্সিস রাজার সামনে গিয়ে অভিবাদন করে দাঁড়াল। রাজা এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসের কাঁধে হাত রেখে পাশের ভদ্রলোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, এইহচ্ছেফ্রান্সিস, আমাদের ভাইকিং জাতির গর্ব।
ফ্রান্সিস এত উচ্চ প্রশংসায় বেশ বিব্রত বোধ করল। এবার পাশের ভদ্রলোককে দেখিয়ে রাজা বললেন, ইনি হচ্ছেন এনর সোক্কাসন। দক্ষিণ গ্রীণল্যাণ্ডের রাজা। একটা জরুরি ব্যাপারে উনি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান।
ফ্রান্সিস মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানালো। ভালো করে দেখলো রাজা এনর সোক্কাসনকে। বিশাল দেহ রাজার, মুখে দাড়ি, গোঁফ। পরণে ছাইরঙের গরম কাপড়ের আলখাল্লার মত। গলায় সোনার মোটা চেন, হীরা-বসানো লকেট তাতে। কোমর বন্ধনীটাও সোনার মোটা চেন-এর। মাথায় সীলমাছের চামড়ায় তৈরি টুপি। সোক্কাসন হাত দুটো ঘষে নিয়ে বললেন, চলুন কোথাও বসা যাক–
পুকুরের ধারে শ্বেতপাথরের বেদী রয়েছে। ফ্রান্সিস একটা বেদী দেখিয়ে বলল, ওখানে বসা যেতে পারে।
দু’জনে যখন যাচ্ছে ওদিকে, তখন ভাইকিংদের রাজা বললেন, ফ্রান্সিস এই মেরুভল্লুকটা রাজা সোক্কাসন আমাকে উপহার দিয়েছেন।
ফ্রান্সিস সোক্কাসনকে জিজ্ঞেস করলো, মেরুভল্লুক কি মাংসাশী?
সোক্কাসন বললেন, , ওখানে তো ঘাস-গাছপালা বলে কিছু নেই। বরফের জলের মাছটাছ খায়।
দু’জনে বেদীতে বসল। সোক্কাসন বললেন, এখানকার যাদুঘরে আপনার আনা সোনার ঘন্টা, হীরে, মুক্তো দেখেছি! আপনার দুঃসাহসের প্রশংসা শুনেছি।
ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না, সোক্কাসন বলতে লাগলেন, আসল কথায় আসি। আপনি নিশ্চয়ই এরিক দ্য রেডের নাম শুনেছেন?
–হ্যাঁ উনি তো গ্রীনল্যাণ্ডের প্রবাদপুরুষ। তাঁকে নিয়ে গল্প প্রচলিত আছে।
–আমরা তারই বংশধর। এরিক দ্য রেডই ওখানে প্রথম য়ুরোপীয়দের বসতি স্থাপন করেন। তার আগে ওখানে ল্যাপ্ এস্কিমোরা বাস করত। উত্তরের দিকে আর এক উপজাতি বাস করতো এবং এখনও বাস করে। তাদের বলে ইউনিপেড। এরা অসভ্য বর্বর হিংস্র। এদের রাজারনাম এ্যাভাল্ডাসন। সোক্কাসন একটু থামলেন, তারপর বলতে লাগলেন, এরিক দ্য রেড ওদিকে আলাস্কা, এদিকে আইসল্যাণ্ড, নরওয়ের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য করে প্রচুর ধনসম্পত্তি লাভ করেছিলেন। তা ছাড়া কিছু পথ হারানো জাহাজ, তারমধ্যে জলদস্যুদের জাহাজও তার অধিকারে এসেছিল। এই ধনসম্পত্তি তিনি যে সবটাই সৎপথে উপার্জন করেছিলেন তা নয়। যা হোক, আমার দেশের রাজধানীর নাম বাট্টালিড। সেখানে আমার। প্রাসাদ আছে। একটু থেমে হেসে বললেন, এখানকার প্রাসাদের মত নয় কিন্তু, খুবই সাধারণ! এরিক দ্য রেডের আমলে ওটা তৈরি হয়েছিল। তা ছাড়া বড় গীর্জা আছে একটা। এখন সমস্যা দাঁড়িয়েছে, এরিক দ্য রেডের খামখেয়ালীপনার জন্যে। উনি তার উপার্জিত ধনভাণ্ডার যে কোথায় রেখে গেছেন, সেটা আজও রহস্যময়।
