ফ্রান্সিস হেসে নিজের মাথায় টোকা দিয়ে বলল, মস্তিষ্ককে কাজে লাগাও। অনেক সমস্যার সমাধান পেয়ে যাবে।
থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ দুজনে গল্প করে কাটাল। এক সময় ফ্রান্সিস বলে উঠল, কখন খেতে ডাকবে রেবাবা। এসব পোশাক টোশাক পরে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
একটু পরে ঢং করে ঘণ্টা বাজল। বাজনা থেমে গেল, নাচও বন্ধ হলো। সবাই পাশের ঘরে খাবার টেবিলের দিকে যেতে লাগল। আবার মৃদু বাজনা উঠলো। সবাই খাবার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। রাজা ও রাণী এলেন, সঙ্গে রাজকুমারী। তারা চেয়ারে আসন গ্রহণ করতে সব নিমন্ত্রিতরা বসলেন। রাজকুমারীর পাশের চেয়ারটা তখনও খালি। ফ্রান্সিস আর হ্যারি বসতে যাচ্ছে, হেড বাবুর্চি এসে ফ্রান্সিসকে মাথা নিচু করে অভিবাদন জানিয়ে মৃদুস্বরে বলল, আপনি রাজকুমারীর পাশে বসবেন।
অগত্যা ফ্রান্সিসের আর হ্যারির পাশে বসা হলো না। ও রাজকুমারীকে মাথা নীচু করে অভিবাদন জানিয়ে রাজকুমারীর পাশের চেয়ারটায় বসল।
বিরাট লম্বা টেবিলে কত খাবার সাজানো। যে যেমন খুশি তুলে নিয়ে খাও। বাবুর্চিরাও টেবিলের চারপাশে ঘুরছে। যে চাইছে, সন্তর্পণে প্লেটে তুলে দিচ্ছে। খাওয়া দাওয়া খুব জোরে চলছে। রাজকুমারী খেতে খেতে বলল, আপনার মুক্তোটা লকেট করে একটা হার গড়াতে দিয়েছি।
ফ্রান্সিস হাসল। বলল, মুক্তোটা আপনার পছন্দ হয়েছে?
–খুব। রাজকুমারী বলল, এবার আপনার মুক্তোর সমুদ্রের গল্পটা বলুন।
ফ্রান্সিস এতক্ষণে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কী নিয়ে রাজকুমারীর সঙ্গে কথা বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। ও জলদস্যু লা ব্রুশের হাতে ধরা পড়া থেকে গল্পটা শুরু করে দিল। মাঝে মাঝে খেতে ভুলে যাচ্ছিল। তখন রাজকুমারী হেসে বলছিল, খেতে খেতে বলুন।
ফ্রান্সিস লজ্জিত মুখে খেতে শুরু করছিল তখন।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো, কিন্তু ফ্রান্সিসের গল্প শেষ হলো না। নিমন্ত্রিতরা রাজা রানী রাজকুমারীকে সম্মান জানিয়ে একে একে বিদায় নিতে লাগল। বিভিন্ন রকমের ঘোড়ার গাড়ি তাঁদের নিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগল। ফ্রান্সিস আর হ্যারিও রাজা রাণীও রাজকুমারীকে সম্মান জানিয়ে বিদায় নিল। ওরা সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে, তখনই হ্যারি ফিস্ ফিস্ করে বলল, রাজকুমারী তোমাকে লক্ষ্য করছে যেন।
সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিস খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল। হ্যারি অবাক হয়ে বলল, কী হলো তোমার?
–কিছু না, চলো। দুজনে বাইরে চত্বরে এসে দাঁড়াল। বাবা আসতেই ফ্রান্সিস বলল–বাবা হারিদের গাড়িতে যাচ্ছি।
–বেশ, কিন্তু সোজা বাড়ি। মন্ত্রীমশাই চলে গেলেন। ওরা দুজনে গাড়িতে উঠল। গাড়ি চলল।
একটু পরে হ্যারি বলল, তোমার বাবা তোমাকে একা ছেড়ে দিল?
–মা খুব অসুস্থ।
–ও জানতাম না তো।
–জানো হ্যারি মা’কে কথা দিয়ে ফেলেছি, মা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কোথাও যাবো না।
–তুমি শান্ত হয়ে বসে থাকবে, এ আমার বিশ্বাস হয় না।
–উপায় নেই, তাই।
গাড়ি চলল। রাজবাড়ির নিমন্ত্রণে খাওয়া-দাওয়া, এসব নিয়ে কথা হল। এক সময় ফ্রান্সিসদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল গাড়িটা। ফ্রান্সিস নেমে গেল। নামার সময় বলল, হ্যারি মাঝে মাঝে এসো।
হ্যারি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ফ্রান্সিস সোজা মা’র ঘরে এসে হাজির হ’ল। মা ওর জন্যই জেগে ছিল। ঘুমোয় নি তখনও। ফ্রান্সিস র বিছানায় বসল। মা’র একটা হাত ধরে বলল, মা এখন কেমন আছো?
–আমার কথা থাক। তোমাদের নাচ-গান, খাওয়া-দাওয়া কেমন হ’ল বল।
ফ্রান্সিস উৎসাহের সঙ্গে সে সব কথা বলতে লাগল। রাজকুমারী মারিয়ার কথাও বলল। পা চমকানোর বাহানা তুলে নাচের আসর থেকে পালানো, সে সব কথাও বলল। মা হেসে বলল, তোর মাথায় এত দুষ্টুবুদ্ধিও খেলে।
এক সময় ফ্রান্সিস বলল, মা, কতকিছু নিয়ে এলাম, তুমি কিছুই দেখলে না।
–দাঁড়াও, তুমি ভালো হয়ে ওঠ। তোমাকে রাজার যাদুঘরে নিয়ে যাবো। সব দেখাবো তোমাকে।
–সে দেখা যাবে’খন। এবার যা, রাত হল।
ফ্রান্সিস নিজের ঘরে এল পোশাক–টোশাক ছেড়ে যখন শুয়ে পড়ল, তখন রাত হয়েছে। ও শুয়ে শুয়ে নানা কথা ভাবতে লাগল। মা সুস্থ হয়ে উঠলেই আবার বেরিয়ে পড়বে। এবার কোনদিকে দেখা যাক, মূল্যবান কিছুর খোঁজ পাওয়া যায় কিনা। একসময় এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন জাহাজঘাটায় হাজার হাজার লোকের ভীড় জমে গেল। সকলেই মুক্তো দেখতে চায়। মুক্তো ভরা বাক্সটা নিয়ে মিছিল বেরোবে। ফ্রান্সিসের অনুরোধে বিস্কোই সমস্ত দায়িত্ব নিল। একটা কালো গাড়ি। নানা সোনালী-রূপালী কাজ করা তাতে। সেই গাড়িটার মাঝখানে একটা বেদীমত করা হয়েছে। গাঢ়নীল রঙের ভেলভেটের কাপড় মোড়া হয়েছে সেটা। তারই ওপর আটটা গর্ত মতো করা হয়েছে। আটটা মুক্তো রাখা হয়েছে তাতে। বাকী মুক্তোগুলি রাখা হয়েছে বেদীর ভেতরে। বিস্কো রইলো সেই গাড়িতে। সঙ্গে দু’জন তিনজন বন্ধু। গাড়ির সামনে ও পেছনে ঝালর দেওয়া সবুজ পোষাক পরা সুসজ্জিত দুইদল অশ্বারোহী সৈন্য। জাহাজঘাটা থেকে মিছিল শুরু হল। হাজার হাজার লোক ফ্রান্সিস ও রাজার নামে জয়ধ্বনি দিল। মিছিল এগিয়ে চলল প্রধান রাজপথ দিয়ে। সবাই যাতে মুক্তোগুলো ভালভাবে দেখতে পায়, তার জন্যে বিস্কো আর তার বন্ধুরা মাঝে মাঝে বেদী থেকে মুক্তো তুলে হাত উঁচু করে দেখাতে লাগলো।
