–কথা দিলি, মনে থাকে যেন।
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
ফ্রান্সিস ভাবছিল একা-একা খেয়ে নেবে। কিন্তু সেটা হল না। খাবার টেবিলে বাবার মুখোমুখি বসে দু’জনেই চুপচাপ খেতে লাগল।
একসময় বাবা বলল–আবার কোথাও বেরোবে নাকি?
–না। মা ভালো না হওয়া পর্যন্ত আমি বাড়িতেই থাকবো।
–তাহলে বাড়িতে পাহারাদার রাখার প্রয়োজন নেই?
–না।
–ভাল। আর কোন কথা না বলে বাবা খেতে লাগলেন।
অনেকদিন পরে নরম বিছানায় শান্ত পরিবেশে শুয়ে ফ্রান্সিস জেগে থাকতে পারল না। ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল। একটানা বিকেল পর্যন্ত ঘুমলো ও।
সন্ধ্যার পর থেকেই মা’র তাগাদা শুরু হলো–রাজবাড়িতে নিমন্ত্রণ। যা, ভালো পোশাক–টোশাক পরে নে।
মা বিছানায় শুয়ে শুয়েই পরিচারিকাকে দিয়ে ফ্রান্সিসের পোশাকগুলো আনাল। তাই থেকে বেছে বেছে একটা খুব ভালো পোশাক বের করল। ফ্রান্সিস বেশ কষ্ট করে পোশাকটা পরল। বোতাম–টোতাম আটকাল। গলা পর্যন্ত আঁটা সেই পোশাক পরে ও অস্বস্তিই হতে লাগল। কিন্তু উপায় নেই। রাজবাড়ির নিমন্ত্রণ।
ও যখন সেজেগুজে মার কাছে এল, তখন মা ওকে দেখে খুশিই হলো। পোশাকটা বেশ মানিয়েছে ফ্রান্সিসকে। মা ওর গায়ে সেন্ট ঢেলে দিল। বাবাও ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে নিয়েছিলেন দু’জনে গিয়ে উঠতেই গাড়ি চলল রাজবাড়ির দিকে।
রাজপ্রাসাদের সিঁড়ির নিচের চত্বরে অনেক গাড়ি ঘোড়া। গাড়ি-গুলোর গঠন-ভঙ্গ ও বিচিত্র। বোঝা গেল, অনেক লোকজন এসেছেন।
আলোকোজ্জ্বল বিরাট হলঘরের একদিকে রাজা-রাণী বসে আছেন–পিঠের দিকেউঁচু বিরাট দু’টো চেয়ার। রাজার পরণে চকচকে সোনালী-রূপালী কাজ করা পোশাক। রানীও খুব সেজেছেন। পরণে চকচকে রুপালী সাটিনের পোশাক। কাঁধের কাছে ঝালর দেওয়া টকটকে লাল কাপড়ের ফুল। রাণী ফ্রান্সিসকে দেখে হাসলেন তারপর ডান হাতের দস্তানাটা খুলে হাত বাড়িয়ে দিলেন। ফ্রান্সিস প্রথমতঃ হাতে চুম্বন করল। রাজাও ফ্রান্সিসকে দেখে হাসলেন। রাজা-রাণীর পাশের চেয়ারটা খালি ছিল এতক্ষণ। হঠাৎ দেখা গেল, রাজকুমারী মারিয়া নাচের আসরের দিক থেকে এগিয়ে আসছে। দুধের মত সাদা একটা গাউন পরণে। সকালের চেয়ে এখন আরো বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে। চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে। একটু হাঁপাচ্ছেও। বোধহয় নেচে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিসকে দেখে মারিয়া হাসল। তারপর বলল–আমার সঙ্গে খেতে বসবেন। মুক্তোর সমুদ্রের গল্প শুনবো।
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানিয়ে হাসল। মারিয়া নিজের চেয়ারটায় বসে পড়ল। ফ্রান্সিস এবার ওখান থেকে সরে এসে ভীড়ের মধ্যে বন্ধুদের খুঁজতে লাগল।
প্রথমেই বিস্কোর সঙ্গে দেখা। বেশ জমকালো পোশাক পরেছে। বিস্কো এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, বোধহয় নাচের সঙ্গিনী খুঁজছে। অন্যসব বন্ধুদের মধ্যে অনেকের সঙ্গেই দেখা হলো। বাকিরা সব মহানন্দে বাজনার তালেতালে নাচছে।
হঠাৎ একটা খুব রঙচঙে পোশাক পরা মেয়ে এসে ফ্রান্সিসের সামনে দাঁড়াল। ভুরুর ভঙ্গী করে বলল, নাচবেন আসুন।
ফ্রান্সিস খোঁড়াতে খোঁড়াতেদুপাপিছিয়ে গেল। মেয়েটি বলেউঠল–কীহয়েছে আপনার?
ফ্রান্সিস মুখ-চোখ কুঁচকে বলল, ডান পাটা মচকে গেছে। কাজেই বুঝতেই পারছেন।
মেয়েটি দু’হাত ছড়িয়ে হতাশার ভঙ্গী করল, তারপর চলে গেল যেদিকে ফ্রান্সিসের অন্য সব বন্ধুরা দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস এদিকে ওদিকে তাকিয়ে আড়াল খুঁজতে লাগল। একটাকে ঠেকানো গেছে। আবার কার পাল্লায় পড়তে হয়। ঘরের পেছনের দিকে দুটো বড় থাম। ফ্রান্সিস দ্রুত হেঁটে দিয়ে একটা থামের আড়ালে দাঁড়াল। অস্পষ্ট শিস দেওয়ার শব্দ শুনে পেছনে তাকাল। অন্য থামটার আড়ালে হ্যারি দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস একছুটে গিয়ে হ্যারির কাছে দাঁড়াল। বলল, খুব ভালো জায়গা বেছেছে। কেউ খুঁজে পাবেনা আমাদের।
–অত সহজে রেহাই পাবেনা তুমি। হ্যারি বলল।
–তার মানে?
–মারিয়া তোমাকে ঠিক খুঁজে বের করবে।
–দেখি, যতক্ষণ গা ঢাকা দিয়ে থাকা যায়। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল, এত আলো-বাজনা-নাচ-জমকালো পোশাক পরা মেয়ে পুরুষ, এর চেয়ে জাজিম্বাদের নাচের আসর অনেক সুন্দর, উপভোগ করার।
ওরা দুজনে এসব নিয়ে কথাবার্তা বলছে, হঠাৎ রাজকুমারী মারিয়া এসে হাজির। হাসতে হাসতে বলল, ঠিক জানি আপনি এখানে লুকিয়ে আছেন। নাচবেন চলুন।
ফ্রান্সিস হতাশা ভঙ্গিতে হ্যারির দিকে তাকাল। হ্যারি হাসি চাপতে মুখ ফেরাল। নাচের জায়গায় বেশ ভিড়। ওর মধ্যেই ফ্রান্সিস আর মারিয়া নাচতে লাগল। যখন নাচিয়েরা মারিয়ার সামনে পড়ে যাচ্ছে, তখনই মাথা নুইয়ে সম্মান জানাচ্ছে। নাচতে-নাচতে হঠাৎ সেই জমকালো পোশাকপরা মেয়েটি মুখোমুখি পড়ে গেল ফ্রান্সিসের। মেয়েটি অবাক চোখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। ওরনাচের জুটিকে কানে কানে কী বলতে লাগল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে নাচ থামিয়ে হাত দিয়ে হাঁটুটা চেপে ধরল। মারিয়া বলে উঠল, কী হলো?
ফ্রান্সিস চো-মুখ কুঁচকে বলল–সকালে হঠাৎ পা ফসকে মুচকে গেছে।
–ইস আগে বলেন নি কেন? এই পা নিয়ে কেউ নাচতে আসে?
–কী করবো, আপনি ডাকলেন।
–তাই বলে, যাক গে আপনি বন্ধুদের কাছে যান।
ফ্রান্সিস খোঁড়াতে খোঁড়াতে নাচের আসর থেকে বেরিয়ে এল। আবার থামটার আড়ালে হ্যারির কাছে এসে দাঁড়াল। হ্যারি বেশ অবাকই হলো। বলল, এত তাড়াতাড়ি ছাড়া পেলে?
