হঠাৎ রাজার পেছনে রাজকুমারী মারিয়া এগিয়ে এল হাসতে হাসতে।
ফ্রান্সিস এতক্ষণ মারিয়াকে দেখতেই পায়নি। ওরা দু’জনে মাথা ঝুঁকিয়ে রাজকুমারীর হস্ত চুম্বন করল। একটা ফিকে সবুজ রঙের গাউন পরে আছে মারিয়া। ফ্রান্সিসের মনে হল যেন সবুজ ডাটায় সদ্য ফোঁটা একটা লিলাক ফুল। মারিয়া হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে উঠল–আমার জন্যে যে মুক্তো আনবেন বলেছিলেন।
–এই যে–ফ্রান্সিস কোমরের ফেট্টি থেকে মুক্তোটা বের করে মারিয়ার হাতে দিল। মুক্তোটা হাতে নিয়ে মারিয়া খুশিতে মাথা দুলিয়ে হেসে উঠল। বাবা ও মাকে মুক্তোটা দেখাতে লাগল। ওদিকে সমবেত অমাত্যরা অভিজাত ব্যক্তিরা হাঁ হয়ে দেখতে লাগল এই মুক্তোটা। এতবড় মুক্তো। ও–যে মানুষের কল্পনার বাইরে। বেশ গুঞ্জন উঠল সেই ভীড়ের মধ্যে।
ফ্রান্সিস বলল–রাজকুমারী।
–বলুন। মারিয়া খুব খুশি ভরা চোখে ওর দিকে তাকাল।
–জাহাজে আরও মুক্তো রয়েছে। তাই থেকেও মুক্তো বেছে নিতে পারেন।
–না–মারিয়া মাথা ঝুঁকিয়ে আস্তে-আস্তে বলল–আপনি যেটা দিয়েছেন, সেটাই আমি নেবো।
একথা শুনে ফ্রান্সিসও খুশি হল। কারণও খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছিল বাছাই করা মুক্তোটা।
রানী একটু এগিয়ে এসে ডাকলেন–ফ্রান্সিস।
ফ্রান্সিস সসম্ভ্রমে বলল–বলুন।
–আজকে রাত্রে এখানে তোমাদের সকলের নিমন্ত্রণ। তোমরা সবাই আসবে।
–নিশ্চয়ই রাণী-মা। ফ্রান্সিস মাথা ঝুঁকিয়ে বলল।
এবার রাজামশাই উপস্থিত সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন-কালকে জমকালো মিছিল করে মুক্তোগুলো জাহাজ থেকে এখানকার যাদুঘরে আনা হবে। আগামী দু’দিন দেশব্যাপী আনন্দ উৎসব হবে।
সকলেই করতালি দিল। এদিকে রাজপ্রাসাদের বাইরে উৎসুক সাধারণ মানুষের ভীড় বাড়তে লাগল। সকলেই ফ্রান্সিসকে দেখতে চায়। রাজার ঘোষণাটা তাদের মধ্যে প্রচারিত হল। সকলে সমস্বরে ধ্বনি দিল–আমাদের রাজা দীর্ঘজীবী হোন।
রাজার এই ঘোষণা প্রচার করতে একদল অশ্বারোহী সৈন্য বেরিয়ে পড়ল।
এবার ফ্রান্সিস একটু এগিয়ে এসে রাজামশাইকে বলল–আমরা অনেকদিন ঘর ছাড়া আমাদের যেতে অনুমতি দিন।
–নিশ্চয়ই। তোমরা এবার বাড়ি যাও। রাজা বললেন।
সকলেই রাজা-রানী ও রাজকুমারীকে সম্মান জানিয়ে নিজেদের গাড়িতে গিয়ে উঠতে লাগল। ফ্রান্সিসও হ্যারি রীতিমাফিক রাজা-রাণী ও রাজকুমারীর কাছে বিদায় নিল। ওরা সিঁড়ি দিয়ে নামছে তখনই ফ্রান্সিস শুনল, পেছন থেকে ওর বাবা বলছেন–তোমরা দুজনে আমার গাড়িতে গিয়ে ওঠ।
ফ্রান্সিস কোন কথা না বলে হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে ওর গাড়িতে গিয়ে উঠল। ওর বাবাও এসে বসলেন। গাড়ি ছেড়ে দিল।
গাড়ি প্রাসাদের বাইরে আসতেই সমবেত জনতা ধ্বনি দিল–আমাদের রাজা দীর্ঘজীবী হোন। ফ্রান্সিস দীর্ঘজীবী হোক।
সকলেই ফ্রান্সিসদের গাড়ির কাছে এগিয়ে আসতে চায়। ভালো করে দেখতে চায় ওদের। ফ্রান্সিস আর হ্যারি হেসে হাত নাড়তে লাগল। গাড়ি আস্তে আস্তে চলল। ভীড় ছাড়িয়ে গাড়ি দ্রুত ছুটল। হ্যারির বাড়ির কাছে এসে থামল।
হ্যারি নেমে যাবার সময় বলল–রাত্তিরে দেখা হচ্ছে।
এবার বাবার সঙ্গে একা। গাড়ি চলেছে। আবাল্য-পরিচিত শহরের রাস্তাঘাট। ভালোই লাগছিল ফ্রান্সিসের। কতদিন পরে এখানে ফিরল। হঠাৎ কেন জানি মা’র জন্যে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ও থাকতে না পেরে বলল–মা কেমন আছেন?
–শয্যাশায়ী’! বাবা গম্ভীর গলায় বলল।
ফ্রান্সিস চমকে উঠল–বলল কি বাবা?
বাবা আর কোন কথা বললেন না।
–বৈদ্যিরা কী বলছে?
–নানা রকম অসুখের কথা বলছে। তবে আমার মনে হয়—
বাবা একটু কাশলেন–তোমার জন্যে ভেবেভেবেই এই অবস্থা।
ফ্রান্সিস আর কোন কথা বলল না।
বাড়ির গেটের সামনে গাড়িটা এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস গাড়ি থেকে নেমে দেখল দেয়ালের গায়ে জড়ানো লতাগাছটা আরো অনেক দূর ছড়িয়েছে। নীল ফুলে ছেয়ে আছে। দেওয়ালটা। বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখল বাগানটা অযত্নে শ্রীহীন হয়ে আছে। কিছুআগায়ও গজিয়েছে এখানে-ওখানে।
এবার ফ্রান্সিস বুঝল–মা নিশ্চয়ই বিছানায় শুয়ে। কে আর বাগানের দিকে লক্ষ্য রাখবে। বাড়িতে ঢুকে ফ্রান্সিস আর অন্য কোনদিকে তাকাল না। ছুটল মার শোবার ঘরের দিকে। দোরগোড়া থেকেই ডাক দিল–মা-মাগো।
ওর মা তখন একটা বালিসে ঠেসান দিয়ে আধশোয়া হয়ে শুয়েছিলেন। ফ্রান্সিস দেখল মা আরো রোগা হয়েছে। মুখের কপালের বলিরেখাগুলো আরও স্পষ্ট হয়েছে।
চোখ কুঁচকে মা ওর দিকে তাকিয়ে বলল–ফ্রান্সিস এসেছিস বাবা?
ফ্রান্সিস আর কোন কথা বলতে পারল না। ওর বুক ঠেলে কান্না এল। কিন্তু ও কাঁদল না।
জানে ওর চোখে জল দেখলে মা আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। মা-ও ওর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে শান্তস্বরে বলতে লাগল-কবে যে আর এসব পাগলামি যাবে। তোর বাবা তোর জন্যে এতভাবে, যে কী বলবো। কত রাত দেখেছি, বারান্দায় পায়চারী করছে।
কথা বলতে বলতে মার চোখ থেকে জল ঝরতে লাগল। ফ্রান্সিসও বুকে একটা শূন্যতা অনুভব করল। অনেকক্ষণ মাকে জড়িয়ে ধরে থেকে নিজের আবেগ সামলাল।
মা বলে উঠল-নে ওঠ, হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নে। ফ্রান্সিস মুখ তুলল।
বলল–এখন কেমন আছ মা?
–তুই এসেছিস, এবার ঠিক ভালো হয়ে যাবো।
–তুমি ভালো না হওয়া পর্যন্ত আমি দুরে কোথাও যাবো না।
