কিন্তু ওরা যতটা আশঙ্কা করেছিল, ঝড় তার চেয়েও ভয়াবহ চেহারা নিল। মুষলধারে বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে মুহুর্মুহু জলের উত্তাল ঢেউ, জাহাজের ডেকের ওপর ভেঙে পড়তে লাগল। ভাইকিংরা ঐ প্রচণ্ড ঢেউয়ের ধাক্কার মধ্যে, পালেরদড়ি মাস্তুল হুলি আঁকড়ে ধরে রইল। সবাই ভিজে জবজবে হয়ে গেল। যে হুইল ধরে দাঁড়িয়েছিল, সে ওর মধ্যেই হুইল ঘুরিয়ে চলল। জাহাজের গতি পরিবর্তন করে ঝড়ের প্রচণ্ড ঝাঁপটার মোকাবিলা করতে লাগল। জাহাজের প্রচণ্ড দুলুনির মধ্যে পা ঠিক রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। কয়েকজন পারলও না পা ঠিক রাখতে। রেলিঙের গায়ে, মাস্তুলের গায়ে ধাক্কা খেয়ে কয়েকজন আহতও হল। একেবারে নতুন জাহাজ। তাই ঝড়ের এই প্রচণ্ডতা সহ্য করতে পারল। মাত্র আধঘণ্টা ঝড় চলল। তাতেই সবাই কাহিল হয়ে পড়ল। ঝড় কমল। অল্প-অল্প বৃষ্টি চলল কিছুক্ষণ। তারপরেই আকাশ পরিষ্কার। সন্ধ্যার আকাশে আবার তারা ফুটল।
তারপরে আর ঝড়ের পাল্লায় পড়তে হল না। কিছুদিন পরেই জাহাজভিড়ল ভাইকিং দেশের বন্দরে। অনেকদিন পর দেশে ফেরা। সকলেই খুশি। তার ওপর অত বড় বড় মুক্তো নিয়ে ফিরেছে। দেশের মানুষেরা তো তাই দেখে অবাক হয়ে যাবে।
জাহাজটা যখন জাহাজ ঘাটায় ভিড়ল, তখন ভোর হয়-হয়। জাহাজঘাটায় লোকেরা তাকিয়েও দেখল না ফ্রান্সিসদের জাহাজের দিকে। তারা তো জানে না কি নিয়ে কত দূর দেশ পাড়ি দিয়ে, এই জাহাজ আসছে। ফ্রান্সিসদের বন্ধুদের আর তর সইল না। ওরা বাড়ি যাবার জন্যে বার বার ফ্রান্সিসকে বলতে লাগল। ফ্রান্সিস আর কী করে। ওদের বাড়ি যেতে অনুমতি দিল। শুধু বিস্কোকে বলল–রাজপ্রাসাদে গিয়ে রাজাকে জানিয়ে যাবে যে, আমরা ফিরেছি। সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত মূল্যবান মুক্তো। রাজামশাই যেন এসব নিয়ে যাবার জন্যে একদন সৈন্য পাঠিয়ে দেন।
সৈন্যদল না আসা পর্যন্ত ফ্রান্সিস আর হ্যারি জাহাজে থাকবে, এটাই স্থির হল। বন্ধুরা সব হৈ হৈ করতে করতে পথে নামল, তারপর গাড়িভাড়া করে ছুটল যে যার বাড়ির দিকে। আধঘণ্টার মধ্যে একদল অশ্বারোহী সৈন্য এল। সৈন্যদের দলপতি জাহাজে উঠে ফ্রান্সিসের কাছে এল। সসম্মানে রাজার একটা চিঠিওর হাতে দিল। মোটা কাগজে মোড়ানো চিঠিটা খুলে ফ্রান্সিস পড়ল–তুমি আর হ্যারি অপেক্ষা করবে। আমার গাড়ি যাবে তোমাদের আনতে।
হ্যারি চিঠিটা পড়ে বলল–এখন অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
সৈন্যরা! জাহাজের দেখাশোনার ভার নিল। ফ্রান্সিসের কেবিন ঘরে একটা বড় কাঠের বাক্সে মুক্তোগুলো রাখা ছিল। সৈন্যরা পাহারা দিতে লাগল সেই কেবিন ঘর।
এরমধ্যে শহরে রটে গেছে বড় বড় অনেক মুক্তো নিয়ে ফ্রান্সিসদের ফেরার কথা। আস্তে-আস্তে জাহাজঘাটায় লোক জমতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই উৎসুক জনতার ভীড় বাড়তে লাগল। ভীড় ক্রমে জনসমুদ্রে পরিণত হল। রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। উৎসুক জনতা ধ্বনি দিতে লাগল–ফ্রান্সিস, দীর্ঘজীবী হও। তারপর চিৎকার শুরু হল–আমরা ফ্রান্সিসকে দেখতে চাই।
কেবিন ঘরে বসেছিল ফ্রান্সিস আর হ্যারি। হ্যারি হেসে বলল–আর লুকিয়ে থাকা চলবে না। চলো ডেকে গিয়ে দাঁড়াই।
–আমার এসব আর ভালো লাগে না। বিরক্তির সঙ্গে বলল ফ্রান্সিস।
–উপায় নেই, চলো–বলে হ্যারি উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসকেও উঠতে হল।
দু’জনে ডেক-এ এসে দাঁড়াতেই মুহুর্মুহু ধ্বনি উঠল–ফ্রান্সিস দীর্ঘজীবী হও।
দু’জনেই হেসে হাত নাড়াতে লাগল। উৎসুক জনতা মুক্তোগুলো দেখতে চেয়ে চিৎকার করতে লাগল। ফ্রান্সিস কোমরের ফেট্টি থেকে ওর বাছাই করা মুক্তোটা বের করল। তারপর হাত তুলে দেখাতে লাগল। জনারণ্যে চাঞ্চল্য জাগল। সকলেই অবাক–এত বড় মুক্তো। অনেকক্ষণ ধরে করতালি চলল। সে শব্দে কান পাতা দায়। আবার শুরু হল ধ্বনি–ফ্রান্সিস দীর্ঘজীবী হও।
এর মধ্যে রাজার পাঠানো আটটা ঘোড়ায় টানা গাড়ি এল। জনতার ভীড় স’রে গিয়ে পথ করে দিল। গাড়ির চালকের মাথায় পালকগোঁজা টুপি। পরণে জেল্লাদার পোশাক। ঘোড়াগুলি সুসজ্জিত। কালো গাড়িটার গায়ে সোনালী পাতের কারুকাজ। গাড়িটা জাহাজঘাটায় এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি জাহাজ থেকে নেমে এল। উঠল গাড়িটায়। তখনও জনতার উল্লাসধ্বনি চলেছে। ওদের নিয়ে গাড়ি চলল রাজপ্রাসাদের উদ্দেশ্যে।
গাড়ির সামনে ও পেছনে দু’দল সুসজ্জিতঅশ্বারোহী সৈন্য চলল। জনসমুদ্রের মধ্যে দিয়ে পথ করে গাড়ি চলল। দর্শকের অনুরোধে ফ্রান্সিসকে মাঝে মাঝে মুক্তোটা তুলে দেখাতে হল। অতবড় মুক্তো দেখে সবাই হতবাক। পরক্ষণেই উল্লাসে চিৎকার করে উঠছে সবাই।
একসময় রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটক পেরোল গাড়িটা। ফ্রান্সিসরা দেখল রাজপ্রাসাদের বড় বড় সিঁড়িগুলির ওপর লাল কার্পেট পাতা। সিঁড়িগুলি যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে রাজা ও রানী দাঁড়িয়ে আছেন। সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন প্রধান প্রধান অমাত্য ও শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। আবার রাজার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন মন্ত্রীমশাই, ফ্রান্সিসের বাবা।
গাড়ি এসে সিঁড়ির কাছে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস, হ্যারি গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। সমবেত সকলেই করতালি দিয়ে ওদের অভ্যর্থনা জানাল। ওরা প্রথমে রানীর কাছে দাঁড়াল। রানীর পরণে একটা গোলাপী রঙের গাউন। গলায় ছোট ছোট মুক্তোর হার। রাণী হেসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। দুজনেই বাপা ঝুঁকিয়ে মাথা নীচু করে রাণীর হাত চুম্বন করল। রাজার দিকে ফিরে দাঁড়াতেই রাজা ফ্রান্সিসকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর হ্যারিকে। রাজা শুধু বললেন-তোমরা আমার দেশের গৌরব।
