ফ্রান্সিস, হ্যারি দুই বন্ধুও খুশি। তবে ফ্রান্সিস মাঝে-মাঝে বলে হ্যারিকে–দেখ ভাই, দেশে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমি নিশ্চিন্ত হতে পারবো না। জানো তো হীরে নিয়ে যাবার সময় কী করে লা ব্রুশের পাল্লায় পড়েছিলাম।
হ্যারি হেসে বলে–মিছিমিছি দুশ্চিন্তা করছে। এবার অনেক সাবধান হয়েছি।
–তবু বলা যায় না কিছু। ফ্রান্সিস বলে। হ্যারি ঠিকই বলেছে। এবার জাহাজের পাহারাদারের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। প্রায় কুড়ি–পঁচিশজন রাত জেগে পাহারা দে..। পরের দিন বাকীরা। ঘরে-ঘরে সকলের ওপরই রাত জেগে পাহারা দেবার ভার পড়ে। ফ্রান্সিস, হ্যারি, বিস্কো কেউ বাদ যায় না। তবে ফ্রান্সিসের বন্ধুরা হ্যারিকে সারারাত জাগতে দেয় না। ওকে জোর করে ঘুমুতে পাঠিয়ে দেয়। হ্যারি বড় একটা সুস্থ থাকে না। এটা ওটা লেগেই আছে। হ্যারি তাই দুঃখ করে বলে–ফ্রান্সিস আমাকে না আনলেই ভালো করতে।
ফ্রান্সিস মাথা নাড়ে। বলে–তোমাকে ছাড়া আমি কোথাও বেরোবোই না।
–তোমাদেরই তো ভোগান্তি।
–হোক ভোগান্তি। তারপর থেমে বলে–এ্যান্তনীকে সেই জন্যেই সঙ্গে এনেছিলাম। এ্যানী রাজ-চিকিৎসকের সাগরেদ। ও অনেক ওষুধ-পত্তরও সঙ্গে এনেছে। কখন কে অসুস্থ হয়ে পড়ে, কে আহত হয়। চিকিৎসা করতে হবে তো।
–তারপর বরাবরের রোগী আমি তো আছিই।
দু’জনেই দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।
হ্যারি এর মধ্যেই একদিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ল। সেদিন বিকেলে হ্যারি ডেক-এ দাঁড়িয়ে দু’একজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে, হঠাৎ ওর মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল। তারপর বুকে একটা মোচড়। দু’হাত শূন্যে তুলে হ্যারি ডেকের ওপর পড়ে গেল। ধারে কাছে যারা ছিল ছুটে এল। হ্যারির মুখটা তখন বেঁকে গেছে। হাত-পা শক্ত কাঠ। মুখ দিয়ে গাজলা বেরুচ্ছে। চোখে শূন্য দৃষ্টি। খবর পেয়ে ফ্রান্সিস ছুটে এল। একটু পরে এ্যান্তনী : ওর ওষুধ রাখার বেতের বাক্সটা নিয়ে এল। ও হ্যারির শক্ত হাত-পা বারকয়েক টানাটানি করল। তারপর বুকে কান রাখল। নাকের সামনে আঙ্গুল রাখল। খুব ধীরে শ্বাস পড়ছে। তুয়ারে গুপ্তধন প্রায় বোঝাই যায় না। বুকে হৃদস্পন্দনও অস্পষ্ট। বেতের বাক্স খুলে একটা চিনেমাটির বোয়াম বের করল। দু’হাত তুলে সবাইকে বলল–সরে যাও–হাওয়া ছাড়ো।
সবাই সরে গেল। এ্যান্তনী বোয়াম থেকে আঙ্গুলের ডগায় করে ওষুধ বার করল। তারপর হ্যারির নাকের কাছে ধরল। হ্যারি সেই শক্ত হাত-পা নিয়ে একই রকমভাবে শুয়ে রইল। এ্যান্তনী কিছুটা ওষুধ হ্যারির নাকে লাগিয়ে দিল।
বেশ কিছুক্ষণ পর হ্যারির মুখ থেকে গোঁ গোঁ শব্দ বেরুলো। কয়েকবার মাথাটা এপাশ-ওপাশ করে হ্যারি সহজ দৃষ্টিতে তাকালো। মাথা ঘুরিয়ে চারদিক তাকিয়ে নিল। শক্ত হাত-পা নরম হল। ও আস্তে আস্তে উঠে বসল। ফ্রান্সিস ওর মুখের ওপর ঝুঁকে বলল-এখন কেমন লাগছে।
–একটু ভালো। দুর্বল স্বমোরি বলল–আমার কী হয়েছিল?
–কিছু না, মাথা ঘুরে গিয়েছিল বোধহয়।
–মাথা ঘুরে গিয়েছিল ঠিকই, তারপর বুকে একটা চাপা ব্যথা। তারপর সব কেমন অন্ধকার হয়ে গেল।
–ও ঠিক হয়ে যাবে। এখন কেবিনে যেতে পারবে? আমার কাঁধে ভর দিয়ে?
–বোধহয় পারবো।
হ্যারি উঠে দাঁড়াতে গেল, কিন্তু পারলো না। বোঝা গেল, ওর শরীরের দুর্বল ভাবটা এখনও কাটেনি। ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে ওর হাতটা নিজের কাঁধে তুলে নিল। তারপর ধরে–ধরে আস্তে আস্তে সিঁড়ির দিকে নিয়ে চলল। হ্যারিকে বিছানায় শুইয়ে দিল ফ্রান্সিস। অল্পক্ষণের মধ্যেই হ্যারি অনেকটা সহজ হল। এ্যান্তনী একটা মোটা কাপড়ের পুঁটুলি থেকে দুটো কালো কালো বড়ি বের করল। হ্যারির হাতে দিয়ে বলল–খেয়ে নাও।
একজন জলের গ্লাস নিয়ে এল। হ্যারি বড়ি দুটো খেয়ে নিল। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলল ও। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল। এবার ফ্রান্সিস এ্যান্তনীকে জিজ্ঞেস করল হ্যারির কী হয়েছে?
–ঠিক বুঝতে পারছি না। এ্যান্তনী বেতের বাক্স বন্ধ করতে করতে বলল মনে হয় মৃগী রোগের মত কিছু। দেশে ফিরে ওর ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
–হুঁ।
ফ্রান্সিস মুখ নীচু করে কি যেন ভাবলো কিছুক্ষণ। তারপর কেবিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আর যারা ছিল তারাও বেরিয়ে এল।
জাহাজ চলেছে। দু’একবার অল্প ঝড় উঠেছিল সমুদ্রে। কিন্তু জাহাজের কোন ক্ষতি করতে পারেনি। দিন-রাত জাহাজ পাহারা দেওয়া চলল। শুধু হ্যারিকে কোন কাজে ডাকা হতো না। হ্যারি এখন মোটামুটি সুস্থ। ও কাজ চাজ করতে চায়। কিন্তু ফ্রান্সিস চড়া গলায় বলে দিয়েছে-তোমাকে কোন কাজ করতে হবে না। এখন শুধু বিশ্রাম।
হ্যারি আর কি করে। চুপচাপ শুয়ে বসে থাকে। ফ্রান্সিসরা ওর ঘরে আসে গল্পটল্প করে ওর সঙ্গে। ফ্রান্সিস মাঝে মাঝে ওকে ডেকের ওপর নিয়ে যায়। ফ্রান্সিসের হাত ধরে আস্তে আস্তে পায়চারী করে। কিছুদিন যেতে হ্যারি সুস্থ হয়ে উঠল। আগের মতই কাজকর্ম করতে লাগল।
পর্তুগালের কাছাকাছি আসতে ফ্রান্সিসদের জাহাজটা এক প্রকাণ্ড ঝড়ের মুখে পড়ল। তখন বিকেল। সূর্য অস্ত যায়-যায়। হঠাৎ একটা কালো মেঘ উঠল পশ্চিম আকাশের দিকে। সেই মেঘ বড় হতে হতে, ছড়াতে ছড়াতে সমস্ত আকাশ ঢেকে দিল। ওরমধ্যে পূর্ব আকাশটা কেমন আগুনরঙা হয়ে উঠল। টিপটিপ বৃষ্টি পড়তে লাগল। সারা আকাশ জুড়ে ঘন-ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। আঁকা-বাঁকা বিদ্যুৎরেখা সারা আকাশ চিরে ফেলতে লাগল যেন। তারপরই হঠাৎ প্রচণ্ড গোঁ গোঁ শব্দ উঠল। আর তারপরই বিরাট বিরাট ঢেউ ছুটে এলো। সেইসঙ্গে প্রচণ্ড বাতাস। ঢেউগুলো কান ফাটানো শব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ল ফ্রান্সিসদের জাহাজের ওপর। ভাইকিংরা অভিজ্ঞ নাবিক। ওরা আকাশের চেহারা দেখেই বুঝেছিল, বেশ বড় রকমের ঝড় আসছে। ওরা সমস্ত পাল নামিয়ে ফেলেছিল। দাঁড়গুলো বন্ধ করে দিয়েছিল। তারপর তৈরি হয়ে ডেক-এ এসে দাঁড়িয়েছিল ঝড়ের মোকাবিলা করবার জন্য।
