সেনাপতি সঙ্গে সঙ্গে ভাজিম্বাদের ভাষায় চীৎকার করে একনাগাড়ে কি বললো। বোধহয় লা ব্রুশের পরাজয় সংবাদ দিলো। ফ্রান্সিসরা যে ওদের বন্ধু, এ কথাও বললো। বনজঙ্গলের গাছ-গাছালির আড়াল থেকে ভাজিম্বা যোদ্ধারা বর্শা হাতে কাছে আসতে লাগলো। কাছে এসে ফ্রান্সিসদের চারপাশে ঘিরে দাঁড়ালো ওরা। রোগাৰ্ত, পাংশুমুখ ওদের। কতদিন না খেয়ে আছে, কে জানে। সেনাপতি ওদের কি বললো। ওদের মধ্যের একজন ছুটে গিয়ে একটা লতাগাছ নিয়ে এলো। ফ্রান্সিসের জখমের দু’পাশে লতা দিয়ে বেঁধে দিলো। রক্তপড়া একটু কমলো। তারপর ঐ ভাজিম্বাটি লতাগাছটার কয়েকটা পাতা মুখে পুরলো। কিছুক্ষণ চিবিয়ে তারপর উরুর ক্ষতের উপর সেই চিবিয়ে থ্যালানো পাতাগুলো লাগিয়ে দিলো। একটু জ্বালা করে উঠলো। আস্তে আস্তে ঠান্ডা লাগলো ক্ষতের জায়গাটা। ফ্রান্সিস একটু আরাম বোধ করলো।
সেনাপতি ওদের কি জিজ্ঞেস করলো। ওরা বাড়িয়ে দূরের পাহাড়টা দেখলো। সেনাপতি ফ্রান্সিস আর হ্যারির দিকে তাকিয়ে পর্তুগীজ ভাষায় বললো–ঐ পাহাড়ের কোন গুহায় রাজা আছেন। আমি রাজা-মন্ত্রী ওদের আনতে যাচ্ছি। ওদের বলে যাচ্ছি এর মধ্যে ওরা গাছের ডালপালা কেটে মাচামতো তৈরী করবে। তাতে আপনাকে শুইয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি রাজা-মন্ত্রী নিয়ে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাপতি রাজা, মন্ত্রী এবং অন্য সব গণ্যমান্য ভাজিদের নিয়ে সেখানে এলো। সেনাপতি ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে দেখিয়ে রাজাকে কি বললো। রাজা হেসে ফ্রান্সিস আর হ্যারির গায়ে হাত বুলালো। চারজন জিম্বা ফ্রান্সিসের মাচাটা কাঁধে তুলে নিল। সকলে মিলে এবার ফিরে চললো রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে। এবার ভাইকিংবদের দেশে ফেরার পালা। এর মধ্যে একদিন ফ্রান্সিস হ্যারিকে বললো–হ্যারি, আমাকে একবার রাজদরবারে নিয়ে চলো।
–ওখানে যাবে কেন?
–আমি যে মুক্তোর সমুদ্র থেকে অনেক মুক্তো এর মধ্যেই এনেছি, সেই কথাটা রাজাকে বলবো। দেশে মুক্তো নিয়ে যাবার অনুমতি চাইবো।
-মনে তো হয় না; রাজা এতে আপত্তি করবে। –তবু বলে কয়ে নেওয়াটাই ভালো। ফ্রান্সিস আর হ্যারি নৌকোয় চড়ে চাঁদের দ্বীপে এলো। রাজদরবারে ওরা যখন পৌঁছলো, তখন দুপুর হয়ে গেছে। দেখলো, রাজসভার কাজ চলছে। ওদের দরবার ঘরে ঢুকতে দেখে সেনাপতি এগিয়ে এসে ওদের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে বসার জায়গা করে দিলো। ফ্রান্সিস সেনাপতিকে বললো, রাজাকে আমরা একটা কথা বলতে চাই।
–কি কথা?
–আপনি রাজাকে বলুন, যে আমি রাজার অনুমতি না দিয়ে মুক্তোর সমুদ্র থেকে কিছু মুক্তো তুলেছি। এখন এ সব মুক্তো নিয়ে যেতে পারি কিনা।
তখন রাজসভায় একটা বিচার চলছিলো। সেটা শেষ হতেই সেনাপতি উঠে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিসের কথাগুলো রাজাকে বললো। রাজা মৃদু হেসে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে জিম্বা ভাষায় কি সব বলে গেলো। সেনাপতি সেটা পর্তুগীজ ভাষায় বলে দিলো–রাজা বলছেন, আপনি যে সৎ এবং মহৎ প্রকৃতির মানুষ, এটা আপনার ব্যবহারেই প্রকাশ পেয়েছে। আপনি আমাকে না জানিয়ে অনায়াসে মুক্তোগুলো নিয়ে চলে যেতে পারতেন। আপনি তা করেননি। এতেই আপনার সততা প্রকাশ পাচ্ছে। আপনি সাহস আর বুদ্ধিবলেই মুক্তো সংগ্রহ করেছেন। ঐ মুক্তোগুলো আপনার সাহসিকতার পুরস্কার। তবে চাঁদের দ্বীপে অধিষ্ঠাতা দেবতার নামে শপথ করে বলছি, ঐ মুক্তোগুলো নিয়ে ব্যবসা করবেন না। আমি ঐ ব্যবসা করতে চেয়েছিলাম বলেই রাজত্ব হারিয়েছিলাম। চাঁদের দ্বীপের অধিষ্ঠাতা দেবতার অভিশাপ লেগেছিলো। আমার অনুরোধ, আপনি তা করবেন না। যে সব মুক্তো আপনি সংগ্রহ করেছেন, সে সবই আপনার। ফ্রান্সিস মাথা নুইয়ে বারবার রাজাকে ধন্যবাদ দিলো। তারপর জাহাজে ফিরে এলো।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি জাহাজে ফিরতেই সবাই ছুটে এলো। ফ্রান্সিস ওদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো জাহাজ ছাড়া, এবার দেশে ফেরা যাক্।
সকলেই একসঙ্গে চীৎকার করে উঠলো ও-হো-হো-।
ঘর ঘর শব্দে নোঙর তুলে নতুন জাহাজটা দ্রুত বেগে ঢেউ ভেঙে ছুটলো।
বিকেল হয়ে এসেছে। ফ্রান্সিস আর হ্যারি জাহাজের রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিম আকাশে নেমে আসা সূর্যের শেষ আলোয় ওখানে যেন রঙের বন্যা চলেছে। সেইদিকে–আনমনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফ্রান্সিস কোমরের ফেটিতে গোঁজা কি যেন বের করলো। হ্যারি দেখলো। হ্যারি দেখলো, বেশ বড় আকারের মুক্তো একটা। হেসে বললো—কি ব্যাপার? এই মুক্তোটা এখনও যে হাতছাড়া করছো না?
ফ্রান্সিস হেসে বললো–এটা সবচেয়ে বড়। এটা রাজকুমারীকে উপহার দেবো।
০–তাই বলো। হ্যারি হাসলো। ও আর কোনো কথা বললো না। লাল আলোময় দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস তখন কি কথা ভাবছিলো, তা ফ্রান্সিসই জানে।
[শেষ]
তুষারে গুপ্তধন – ফ্রান্সিস সমগ্র – অনিল ভৌমিক
জাহাজ চলেছে ভাইকিংদের স্বদেশের দিকে। সমুদ্র শান্ত। হাওয়ার বেগও যথেষ্ট। পালগুলো প্রায় বেলুনের মত ফুলে উঠেছে। নিরুদ্বেগ সমুদ্রযাত্রা। ভাইকিংরা সকলেই খুশি। অনেকদিন পর স্বদেশে ফিরে চলেছে। হাওয়া ভাল থাকাতে দাঁড় টানতে হচ্ছে না। শুধু ডেক ধোয়া-মোছা, পালের দড়ি ঠিকঠাক করা এসব কাজ। সে আর কতক্ষণের কাজ। বাকী সময় ওরা হৈ হল্লা, করে, ছক্কা-পাঞ্জা খেলে। গান গায়, বাজনা বাজায়, নাচে। রাত হলে ডেকের এখানে ওখানে সবাই গোল হয়ে বসে। দেশের বাড়ির গল্প করে। সোনার ঘণ্টা নিয়ে গেছে ওরা, অত বড় দুটো হীরে। এবার নিয়ে যাচ্ছে হাঁসের ডিমের মত মুক্তো। দেশের লোকেরা অবাক হয়ে যাবে। মানুষের কল্পনাতেও আসেনা এত বড় মুক্তো! কী সম্বর্ধনাটাই না ওরা পাবে!
