দরবার কক্ষে গিয়ে ফ্রান্সিস বসলো। একটু পরে কয়েকজন ভাইকিং ভাজিম্বা সেনাপতিকে নিয়ে এল। সেনাপতিকেওরা শাস্তিঘর থেকে ধরে নিয়ে এলো। সেনাপতির হাঁটবার ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে। তার সারা শরীরে আগুন দিয়ে ছ্যাকা দেওয়ার দাগ। চোখ দুটো কোটরে বসা। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি উঠে সেনাপতিকে বললো আপনি জেনে খুশি হবেন অত্যাচারী লা ব্রুশ মারা গেছে। ওর ছোটো সর্দারও মারা গেছে। অন্য সঙ্গীরা অনেকেই বন্দী, কিছু অন্ধকারে পালিয়েছে। সেনাপতি কথাগুলো শুনলো। একটু হাসি ফুটলো তার মুখে।
–আপনি দিন কয়েক খাওয়া-দাওয়া করুন, বিশ্রাম করুন, তারপরে আপনাকে নিয়ে বনে-পাহাড়ে যাবো। রাজা, মন্ত্রী আরসব ভাজিম্বাদের ফিরিয়ে আনবো। আপনাদের চাঁদের দ্বীপ আপনাদের হাতেই ফিরিয়ে দিয়ে আমরা চলে যাবো। ফ্রান্সিস বললো।
অন্দরমহলে যে ঘরে লা ব্রুশ থাকত একটা কারুকার্য করা কাঠের বাক্সে তিনটে মুক্তো পাওয়া গেল। আর কোথাও মুক্তো পাওয়া গেল না। বাকি যে দু-তিনটে মুক্তো লা ব্রুশ পেয়েছিল, বোধহয় বিক্রী করে জাহাজ কিনেছে। ফ্রান্সিস স্থির করলো, তাহলে এবার মুক্তোর সমুদ্র থেকে কিছু মুক্তো তুলতে হবে।
কয়েকদিন পরে হ্যারি আর দু’জন ভাইকিংকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সিস চললো মুক্তোর সমুদ্রের উদ্দেশ্যে, সঙ্গে নিলো আয়নাটা। এখানে-ওখানে ভাজিম্বাদের পাতা ফাঁদ এড়িয়ে ওরা যখন আগুনে প্রবালের স্তর পেরিয়ে মুক্তোর সমুদ্রের ধারে এলো, তখন বেলা দুপুর। জলে শির শির ঢেউ উঠছে। চারিদিকে শুধু পাখির ডাক। আর কোন শব্দ নেই।
ফ্রান্সিস একটা কম্বলের ঝুলিমত এনেছিল। সেটা নিয়ে আর আয়নাটা কোমরে গুঁজে জলে ঝাঁপ দিল। সোজা নীচে নেমে গেল। অসমান তলদেশে আগে কোমর থেকে খুলে আয়নাটা রাখলো। তারপর জলের ওপরে উঠে এলো। ভালো করে দম নিয়ে আবার ডুব দিলো। দেশে মুক্তো শিকারীদের সঙ্গে জলের নীচে ডুব দেওয়া, সাঁতার দেওয়া, এসব ভালোভাবেই অভ্যেস করেছিল। এখন সেটা দারুণভাবে কাজে লাগলো।
সেই অপরূপ দৃশ্য জলের তলদেশে। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মুক্তো। বড়-বড় ঝিনুকের মুখখোলা পেটেও মুক্তো। ঝিনুকের সংখ্যাও কত। সেইনীলচে-বেগুনী আলোর বন্যা। ফ্রান্সিস দেখলো বেশ কয়েকটা লা মাছ আয়নাটাতে ফুঁ দিচ্ছে। রক্ত বেরুচ্ছে মাছগুলোর থেকে। তবুষ্টু দেবার বিরাম নেই। ফ্রান্সিস মুক্তো তুলতে লাগলো। ভরতে লাগলো সঙ্গে আনা কম্বলের ঝোলাটাতে। দম ফুরিয়ে গেলে উপরে উঠে এলো। আবার ডুব দিলো। আবার মুক্তো তুলতে লাগলো। ঝোলাটা ভরে গেলো। অনেকমুক্তো তুলে ফেলাতে জলের তলদেশে আলোর তেজ কমে গেলো। আয়নাটা থেকে যে আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগলো, তাতে আগের উজ্জ্বলতা আর রইলো না। আর এখানে থাকা বিপজ্জনক। ওর দিকে লাফ মাছের নজর পড়তে পারে। ও উপরে উঠে এলো। সাঁতরে এসে পারে উঠে ঝোলাটা হ্যারির হাতে দিলো।
এত মুক্তো? আর কত বড়-বড়। হ্যারি খুশিতে ঝোলাটা উঁচিয়ে হাসতে লাগলো। ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ জলের ধারে বসে দম নিলো, তারপর সকলেই ফিরে চললো।
ফ্রান্সিস ঝোলা ভর্তিমুক্তো এনেছে, দেখে ভাইকিংরা আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে গেলো। রাত হলে চত্বরে আগুন জ্বেলে তার চারপাশে সবাই ঘুরে-ঘুরে নাচতে লাগলো, আর গলা ছেড়ে গান গাইতে লাগলো। সারারাত আনন্দের আসর চললো। যখন আনন্দের জোয়ার ঝিমিয়ে এলো, তখন ভোর হয়-হয়।
***
দিন সাতেক কেটে গেলো। ভাজি সেনাপতি এখন একেবারে সুস্থ। সে ভাঙা পর্তুগীজ ভাষায় বারবার ফ্রান্সিসকে ধন্যবাদ দিলো। ওদের জন্যেই সে বেঁচে গেছে, এটা সে জীবনেও ভুলবে না, একথাই বারবার বলতে লাগল।
কদিন পর ফ্রান্সিস একদিন সেনাপতিকে বললো, চলুন বনে গিয়ে রাজা, মন্ত্রী আর অন্য যারা আছে, তাদের নিয়ে আসি। আমরা এবার দেশে ফিরবো।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি সেনাপতিকে নিয়ে চললো। ভাঙা-ভাঙা পর্তুগীজ ভাষায় সেনাপতি সেই সব অত্যাচারের কাহিনী বলছিল পথ চলতে-চলতে।
বনের মধ্যে ঢুকল ওরা। হ্যারি বললো–আর কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে এলে হতো। ফ্রান্সিস বললো–আমিও তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আনি নি। কারণ অত লোকজন দেখলে আত্মগোপনকারী আজিম্বারা আমাদের ভুল বুঝতো। আমাদের বিপদই বাড়তো তাতে। হ্যারি ভেবে দেখলো কথাটা ঠিক।
প্রথমে ছাড়া গাছপালা। তারপর বন ঘন হতে লাগলো। সূর্যের আলো পর্যন্ত ঢোকে, না, এমন নিবিড় সেই বন। সেনাপতি ব’লে যেতে লাগলো, এই বনে-পাহাড়ে কি কষ্টের মধ্যে দিন কেটেছে। ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে কত ভাজি যুবক লা ব্রুশের সঙ্গীদের হাতে ধরা দিয়েছে। লা ব্রুশ ওদের পেট পুরে খেতে দিয়েছে। তারপর ধরে নিয়ে গেছে মুক্তোর সমুদ্রে। জোর করে বর্শার খোঁচা মেরে ওদের মুক্তো আনতে জলে নামিয়ে দিয়েছে। তারপর কেউ বেঁচে ফিরে আসেনি।
ওরা নানা কথা বলতে বলতে বনজঙ্গল ভেঙে চলেছে। তখনই ফ্রান্সিস লক্ষ্য করলো বাঁদিকে একটা পান্ডানাস গাছের ডাল ভীষণ জোরে দুলে উঠলো। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই ফ্রান্সিস দেখলো একটা বর্শা বিদ্যুৎ বেগে ছুটে আসছে হ্যারির দিকে। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে হ্যারিকে জোরে ধাক্কা দিল। হারি উবু হয়ে একটা ঝোঁপের ওপর পড়ে গেল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। ফ্রান্সিস দ্রুত সরে যেতে গেলো, কিন্তু ততক্ষণে বর্শাটা ছুটে এসে ফ্রান্সিসের উরু ছুঁয়ে চলে গেলো। এক পলকে ঘটনাটা ঘটে গেল। ফ্রান্সিসের উরু অনেকটা জখম হ’ল। গলগল করে রক্ত ছুটলো। ও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। মাটিতে শুয়ে পড়লো। হ্যারি পাগলের মত ছুটে এসে ওর উরুটা চেপে ধরলো। কিন্তু রক্ত পড়া বন্ধ হ’লো না। ফ্রান্সিস ব্যথায় গোঙাতে লাগলো। হ্যারি চীৎকার করে সেনাপতিকে বললো শীগগির ভাজিম্বাদের বলুন, আমরা ওদের শত্রু নয়।
