ফ্রান্সিস নৌকাটায় উঠলো। নৌকাটা জোরে দুলে উঠলো। ও ঢ্যাঙা সর্দারের গলা থেকে আয়নাটা খুলে নিলো। তখনইহঠাৎ একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা কাত হয়ে গেলো। ফ্রান্সিস দুহাতে জল ঠেলে-ঠেলে ক্যারাভেলে-এর দিকে সাঁতরাতে লাগলো।
দড়ি বেয়ে-বেয়ে ক্যারাভেল-এ উঠলো। মাথার তীব্রযন্ত্বনাটা এতক্ষণেঅনুভব করলো। সমস্ত শরীর জুড়ে অসহ্যক্লান্তি। চোখের সামনে সব কেমন ঝাপসা হয়ে এলো। হ্যারি ছুটে এসে ওকে ধরলো। ফ্রান্সিসের শরীরে আর একফেঁটা শক্তি নেই। ও শরীর ছেড়ে দিলো। কয়েকজন ভাইকিং ছুটে এল। সবাই ধরাধরি করে ফ্রান্সিসকে ওর কেবিনঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলো। বৈদ্যিকে ডাকা হলো। সে এলে ফ্রান্সিসের মাথায় ও বুকে ওষুধ লাগিয়ে দিলো। মাথার তীব্রতা একটু কমলো বটে, যা হোক ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়লো। আয়নাটা তখনও ওর হাতে ধরা। হ্যারি হাত থেকে আয়নাটা নিয়ে ওর শিয়রের কাছে রেখে দিলো।
সকাল হ’লো। ভাইকিংরা সকলেই খুব খুশি। একটা ঝকঝকে নতুন জাহাজ পাওয়া গেছে। রাত্রে ভালো করে দেখা হয় নি। এখন সবাই ঘুরে-ঘুরে ক্যারাভেলটা দেখতে লাগলো। সত্যিই ক্যারাভেলটা সুন্দর। ভালো জাতের কাঠে তৈরি।
ফ্রান্সিসের ঘুম ভাঙলো। মাথার ব্যথাটা অনেক কমেছে। আবার বৈদ্যি এসে ওষুধ দিয়ে গেলো। ও শিয়রের কাছ থেকে আয়নাটা এনে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগলো। ঠিক ফ্রেদারিকোর সেই আয়নার মত কাটা। নীচে ছিদ্র। হ্যারি ঘরে ঢুকলো। বললো কি হে কেমন আছো?
ফ্রান্সিস হাসলো এখন অনেকটা ভালো।
–কি করবে এবার ভেবেছো কিছু?
–হুঁ। ভেবেছি জাহাজটা দু’দিন এখানেই থাকবে। আমি ভীষণ ক্লান্ত। দু’টো দিন বিশ্রাম চাই। তারপর চাঁদের দ্বীপে–লা ব্রুশের সঙ্গে মোকাবিলা।
পরের দু’দিন জাহাজ ওখানেই থেমে রইলো। পাল নামিয়ে রাখা হ’লো। জাহাজের কোন কাজ নেই। বেশ একটা ছুটির আবহাওয়া। সবাই ডেক-এর এখানে-ওখানে জটলা বাঁধলো। কোথাও ছক্কাপাঞ্জা খেলা চললো, কোথাও মোটা ভারি গলায় গান চললো, কোথাও দেশের বাড়ির গল্পগাছা চললো। দুদিন পরে সন্ধ্যেবেলা আবার সাজ-সাজ রব। একদল উঠলো মাস্তুলে। একদল পাল বাঁধলো, একদল চলে গেল দাঁড়ঘরে! জাহাজ চললো চাঁদের দ্বীপ লক্ষ্য করে।
সোফালা বন্দরে গিয়ে জাহাজটা যখন নোঙর করল, তখন গভীর রাত্রি। যে ক’টা ভোঙা-নৌকা জাহাজটার সঙ্গে বাঁধা ছিল, সেই নৌকোয় চড়ে দফায় দফায় ভাইকিংরা সবাই সমুদ্রতীরে গিয়ে সারি বেঁধে দাঁড়ালো।
আকাশে ভাঙা চাঁদ। অল্প জ্যোত্সায় ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে গুদোমঘর, নির্জন বাজার পেরিয়ে সবাই রাজবাড়ির দিকে চললো।
রাজবাড়ির কাছে পৌঁছেঅল্প চাঁদের আলোয় দেখলোদু’জন জলদস্যু খোলা তরোয়াল হাতে রাজবাড়ি পাহারা দিচ্ছে। এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। ফ্রান্সিস নিম্নস্বরে বলল–আমি আর হ্যারি ঐ দুটোকে ঘায়েল করছি। তারপর আমি ইসারা করলেই সবাই রাজবাড়ির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি ঘরের আড়ালে-আড়ালে পাহারাদার দুই জলদস্যুদের কাছাকাছি–চলে এলো। তারপর সুযোগ বুঝে দু’জনে একসঙ্গে পাহারাদার দু’জনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। গলা চেপে ধরে দু’জনকেই মাটিতে ফেলে দিলো। হ্যারি একজন পাহারাদারের বুকে সোজা তরোয়াল চালিয়ে দিল। অল্প গোঙানি বেরুলো ওর গলা থেকে। ফ্রান্সিস অন্যটাকে তরোয়ালের বাঁট দিয়ে মাথায় মারলো। জলদস্যুটা জ্ঞান হারালো। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়িয়ে তরোয়াল তুলে আক্রমণের ইঙ্গিত করলো।
ও–হো-হো–প্রচন্ড চীৎকারে রাত্রির আকাশকে বিদীর্ণ করে ভাইকিংরা রাজবাড়ির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। ঘুমন্ত জলদস্যুর দল আচমকা এই আক্রমণে বিছানা ছেড়ে ওঠারও সময় পেল না। দু-একজন অন্ধকারে বাইরে ছুটে এলো। তারপর ধরবার আগেই গা ঢাকা দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাকি সব ক’জন জলদস্যুকে বন্দী করা হল। ওদের রাখা হ’ল শাস্তিঘরে।
এরমধ্যে ফ্রান্সিস বেঞ্জামিনকে খুঁজল। কিন্তু কোন ঘরেই তাকে পেলোনা। বারান্দায় নেই, বাইরের চত্বরেও নেই। বুঝলো, লা ব্রুশ ওকে মেরে ফেলেছে। ফ্রান্সিস ছুটলো, দরবার ঘরের মধ্যে দিয়ে ভেতরের অন্দরমহলে।
অন্দরমহলের ঘরে তখন লা ব্রুশ চীৎকার চাঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে সবে উঠে বসেছে। তাড়াতাড়ি পিস্তল নিয়ে ঘরের বাইরে আসতে যাবে, তখনইদরজারমুখে একেবারে ফ্রান্সিসের মুখোমুখি। লা ব্রুশ পিস্তল তুললো। ফ্রান্সিস তার আগেই দ্রুত বসে পড়লো। গুলি ছুটে গিয়ে দরজাটায় লাগলো। ফ্রান্সিস আর দ্বিতীয়বার গুলি চালাবার সময় দিলোনা। লা ব্রুশের পিস্তল ধরাহাত লক্ষ্য করে বিদ্যুৎবেগে তরোয়াল চালালো। আঙুল কেটে গেলো। পিস্তলটাও ছিটকে পড়লো লা ব্রুশ বিছানার পাশে রাখা হাতীর দাঁতের বাঁটঅলা তরোয়ালের দিকে হাত বাড়ালো। কিন্তু কাটা আঙ্গুল নিয়ে তরোয়ালটা তুলতে পারলো না। ফ্রান্সিস ততক্ষণে দ্রুতহাতে তবোয়ালটা ওর বুকে আমূল বিধিয়ে দিল। মুখ দিয়ে একটা কাতরশব্দ বেরিয়ে এল। দু-নিবার এপাশ ওপাশ করে লা ব্রুশ বিছানার ওপর পড়ে গেলো। ওর শরীরটা স্থির হয়ে গেল।
ফ্রান্সিস তখন হাঁপাচ্ছে। হ্যারির সঙ্গে আর কয়েকজন ভাইকিং ছুটে ঘরে ঢুকলো। দেখলো লা ব্রুশের মৃত শরীরটা পড়ে আছে। ওরা আনন্দে চীৎকার করে উঠল–ও—হো–হো’ বাইরের উঠোন থেকে, বারান্দা থেকে অন্য সব ভাইকিংরা চীৎকার করে সাড়া দিল। অর্থাৎ যুদ্ধে জয় হয়েছে।
