ফ্রান্সিস ক্লান্তভাবে একটু হাসলো। তারপর সব ঘটনা বললো। ওদের মধ্যে যে ওষুধ টষুধ দেয়, হ্যারি তাকে ডেকে পাঠাল। ফ্রান্সিসের মাথা ভালো করে জল দিয়ে ধুয়ে সেই লোকটা ওষুধ লাগিয়ে দিল। ব্যাথা একটু কমলো। ফ্রান্সিস আস্তে-আস্তে খাবার ঘরে গিয়ে ঢুকলো। পেট পুরে খেলো। তারপর একটু বিশ্রাম করে নিলো। পরে হ্যারিকে ডেকে নিয়ে জাহাজের ডেক-এ এসে দাঁড়ালো। বেশ ভালো গতিতেই জাহাজ চলছে।
রাত বাড়তে লাগলো। ছোট সর্দারের ক্যারাভেল জাহাজের দেখা নেই। ফ্রান্সিস ডেক-এ পায়চারি করে। কখনো দিগন্তের দিকে স্থির দৃষ্টি তাকিয়ে থাকে। জাহাজে কারো চোখেই ঘুম নেই। দাঁড়িরা প্রাণপণে দাঁড় বাইছে। দু-তিনজন মাস্তুলে উঠে বসে আছে। দড়িদড়া টেনে পালগুলো যাতে বেশি বাতাস পায়, তার জন্যে চেষ্টা করছে। জাহাজটা যেন উড়ে চলেছে, এমনি তার গতিবেগ।
হঠাৎ মাস্তুলের ওপর থেকে একজন চেঁচিয়ে বললো–জলদস্যুদের ক্যারাভেলটা দেখা যাচ্ছে। ওটার চেয়ে অনেক বেশি গতিতে আমাদের জাহাজ যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস দিগন্তের দিকে তাকালো। অন্ধকারে অস্পষ্ট ছায়ার মত ক্যারাভেল-এর পালগুলো নজরে পড়ল। ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বললো–জাহাজের সব আলো নিভিয়ে দাও। কেউ কোন শব্দকরবেনা। আমরা অন্ধকারে ক্যরাভেলটার ওপরঝাঁপিয়ে পড়বো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিসদের জাহাজ ক্যারাভেল-এর অনেক কাছে চলে এলো। কিন্তু ছোট সর্দারও কম চালাক নয়। ও জানতো যে ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই ওদেরই পেছনে ধাওয়া করে আসবে। ওরাও সজাগ ছিলো। সেটা বোঝা গেলো, যখন ক্যরাভেল থেকে কামান দাগা শুরু হল। অন্ধকারের মধ্য দিয়ে কামানের আগুনের গোলা ফ্রান্সিসদের জাহাজ লক্ষ্য করে ছুটে এলো। কপাল ভালো। গোলাটা জাহাজ পার হয়ে সমুদ্রের জলে পড়ল। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস ওরা টের পেয়েছে। জাহাজের গতি কমাও। জাহাজ সরিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
–না–ফ্রান্সিস বলল–ওদের লোকসংখ্যা কম। সদার বেশি লোক নিয়ে আসেনি। যদিওদেরদাঁড়ির সংখ্যা বেশি থাকতো, তাহলে এত তাড়াতাড়ি ওদের ধরতে পারতাম না।
–কিন্তু কামানের গোলার মুখে আমরা কি করে এগোব? হ্যারি বললো।
ফ্রান্সিস বললো–যদি জাহাজে আগুন লাগে, তবু আমরা এগিয়ে যাবো। আর একটা গোলা এসে জাহাজটার পেটের কাছে লাগলো। ওই জায়গাটায় কাঠ ভেঙে একটা খোদল হয়ে গেলো। আর একটা গোলা এসে মাস্তুলের ওপর পড়লো। পালে আগুন লেগে গেলো। মাস্তুলের ওপর যে ভাইকিংটা ছিলো, সে ছিটকে জলে পড়ে গেলো। দাঁড়িরা কিন্তু টেনে চললো। পাল থেকে আগুন ছড়ালো। আস্তে আস্তে ডেক-এও আগুন লেগে গেলো। ততক্ষণে ফ্রান্সিসদের জাহাজটা ক্যারাভেল-এর অনেক কাছে চলে এসেছে। আবার একটা গোলা এসে ডেক-এ পড়লো। আগুন আরো ছড়িয়ে পড়লো। ফ্রান্সিস এতক্ষণ একটি কথাও বলে নি। শুধু দেখছিল ক্যরাভেলটা কত দুরে। এবার ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে ফিরে বললো–শীগগির দাঁড়দের উঠে আসতে বলল। হ্যারি ছুটল ওদের ডেকে আনতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই তরোয়াল নিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ো। ঐ ক্যরাভেল-এ উঠে লড়াই শুরু হবে। ঠিক তখনই গোলা ছুটে আসছে দেখা গেলো। একসঙ্গে সবাই চীৎকার করে উঠল ও-হো-হো। তারপরই সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়লো। গোলাটাও এসে ডেক-এর ওপর পড়লো। এক মুহূর্তের ব্যবধানে ওরা বেঁচে গেলো। দাঁতে তরোয়াল চেপে সবাই সাঁতরে চললো ক্যারাভেলটার দিকে। ওদিকে ফ্রান্সিসদের জাহাজটায় তখন অগ্নিকুন্ডের সৃষ্টি হয়েছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে জাহাজটা। ঐ আগুনের আভায় চারদিক আলোকিত হয়ে গেল।
ক্যরাভেল-এর গা থেকে যে দড়িদড়া ঝুলছিলো, ভাইকিংরা সাঁতরে এসে তাই বেয়ে উঠতে লাগলো। দু’তিনজন জাহাজের ডেক-এ ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু পারলো না। জলদস্যুদের তরোয়ালের ঘায়ে কয়েকজনের মৃত্যু হ’লো। ফ্রান্সিস বুঝলো—এভাবে–ওঠা যাবে না। ও তখন পিছনের হালের কাঠের খাঁজে খাঁজে পা রেখে-রেখে নিঃশব্দে ডেক-এর ওপর উঠে এলো। দেখলো আট-দশজন জলদস্যু জাহাজের রেলিং ধরে ঝুঁকে নীচে জলের দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের হাতে খোলা তরোয়াল। ফ্রান্সিস দ্রুতপায়ে ছুটে গিয়ে পরপর দু’জনের পিঠে তরোয়াল ঢুকিয়ে দিলো। অন্য দস্যুরা ঘুরে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে ফ্রান্সিসকে আক্রমণ করুক, এটাই সে চাইছিল। ও নিপুণ হাতে তরোয়াল চালিয়ে ওদের আটকে রাখলো। সেই ফাঁকে দড়ি বেয়ে-বেয়ে ভাইকিংরা ক্যরাভেল–এর ডেক-এ উঠে এলো। শুরু হলো তরোয়ালের লড়াই। জলদস্যুরা দু-একজন মারা পড়তেই বাকিরা প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ফ্রান্সিস চারদিক তাকিয়ে কোথায় সেইটাঙা ছোট সর্দারকে দেখতে পেল না। কোথায় গেলো ছোট সর্দার? ও দ্রুতপায়ে ছুটলো নিচে কেবিনঘরের দিকে। সব কেবিনঘর ফাঁকা। রসুইঘর, ভাড়ারঘর, কয়েদঘর কোথাও ঢ্যাঙা সর্দার নেই। ওপরে ডেক-এ উঠে এলো। রেলিঙে ভর দিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকালো। ওদের জাহাজের আগুনের আভায় দেখলো, একটা ভোঙা-নৌকো ভেসে চলেছে। একটা লোক ডোঙা নৌকাটা দাঁড় দিয়ে বাইছে। নিশ্চয়ই ঢ্যাঙা ছোট সর্দার। নৌকায় চড়ে পালাচ্ছে।
ফ্রান্সিস এক মুহূর্তও দেরী করলো না। তরোয়ালটা দাঁতে চেপে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ঐ ডোঙা-নৌকোটা লক্ষ্য করে প্রাণপণে সাঁতার কাটতে লাগলো। ডোঙা নৌকাটা উঁচু-উঁচু ঢেউয়ের ধাক্কায় বেশিদূর যেতে পারল না। ফ্রান্সিস অল্পক্ষণের মধ্যেই নৌকাটার কাছে পৌঁছে গেলো; সত্যিই ঢ্যাঙা ছোট সর্দার। ফ্রান্সিসকে দেখতে পেলো ও। সঙ্গে সঙ্গে দাঁড় ফেলে কোমর থেকে তরোয়াল খুললো। নৌকোর ওপর থেকে ফ্রান্সিসকে লক্ষ্য করে তরোয়াল চালালো। ফ্রান্সিস স’রে এলো দ্রুত। কিন্তু ততক্ষণে তরোয়ালের ফলাটা ওর বুক ছুঁয়ে গেছে। জামা কেটে গেলো। বুকের অনেকটা জায়গা লম্বালম্বি কেটে গেছে। রক্ত বেরোচ্ছে। ফ্রান্সিস বুঝলো, নৌকোর কাছে গিয়ে ওকে আক্রমণ করা যাবে না। ওকে অন্য উপায়ে মারতে হবে। ফ্রান্সিস তরোয়ালটা দাঁতে চেপে ডুব দিল। ঢ্যাঙা সর্দার নৌকার উপর দাঁড়িয়ে তোয়াল উঁচিয়ে চারদিকে জলে তাকাতে লাগলো। কখন ফ্রান্সিস ভেসে ওঠে। ফ্রান্সিস তরোয়ালটা হাতে নিয়ে নৌকাটার এক হাতের মধ্যে হঠাৎ ভেসে উঠলো। ঢ্যাঙা সর্দার তরোয়ালটা চালাবার আগেইফ্রান্সিস ওর তরোয়ালের বাঁটটা বর্শার মত ধরে দেহের সমস্ত শক্তি একত্র করে ওর বুক লক্ষ্য করে ছুঁড়লো। আর সঙ্গে সঙ্গে ডুব দিলো। তরোয়াল সোজা ঢ্যাঙা সর্দারের বুকে গিয়ে বিধে গেল। ঢ্যাঙা সর্দার নিজের তরোয়াল ফেলে দিয়ে বুকে বেঁধা তরোয়ালটা দুহাতে টেনে বার করবার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। হাঁটু মুড়ে পড়ে গেল। তরোয়ালটা টেনে খোলার জন্যে বার কয়েক নিষ্ফল চেষ্টা করলো। তারপর শুয়ে পড়ে কয়েকবার হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে স্থির হয়ে গেলো।
