ফ্রান্সিস চুপ করে রইলো৷ তরোয়ালের ডগায় চাপ বাড়ল। ও ঢ্যাঙা সর্দারের চোখের দিকে তাকালো। কি নির্মম ভাবলেশহীন চোখ। বুঝলো, ওকে এই মুহূর্তে হত্যা করতে ঢ্যাঙা সর্দার বিন্দুমাত্র ইতস্ততঃ করবে না। ওর হাতও কাঁপবে না। ঢ্যাঙা সর্দার চেঁচিয়ে উঠলো–বলো–নইলে মরো।
ফ্রান্সিস বলল–ঐ আয়না রাখলে লা মাছগুলো ঐ আয়নাটার প্রতিবিম্ব দেখে বিভ্রান্ত হয়। প্রাণপণে আয়নাটার ওপর চুঁমারতে থাকে। মুখ ফেটে যায়, আয়নার কোণায় লেগে মুখ ফালা হয়ে যায়, তবু ওরা ঢু মেরে চলে। সেই ফাঁকে মুক্তো তুলে নিতে হয়।
–তাহলে এই ব্যাপার। ঢ্যাঙা সর্দারের মুখে খুশি যেন উপচে পড়ছে। বললো–কত মুক্তো আছে ওখানে?
–যত মুক্তো আছে তা বিক্রী করে তোমার পরের চার পুরুষ পর্যন্ত কাউকে কিছু করতে হবে না। যে অর্থ তারা পাবে, দু’হাতে খরচ করেও তা শেষ করতে পাবে না।
ঢ্যাঙা সর্দারের মুখ হাঁ হয়ে গেল। এত মুক্তো? ওর আর তর সইছিল না। ও কোমরে তরোয়াল গুঁজলো। বললো তোমার কাছে যা জানার জেনে নিয়েছি। তুমি আমাদের জাহাজ পুড়িয়ে দিয়েছিলে। আমিও এই বাড়িটায় আগুন লাগিয়ে দেবো। মর পুড়ে তুই। ঢ্যাঙা সর্দার ছুটে বাইরে চলে গেলো। একটু পরেই ঘরের কোণার দিকটা ধোঁয়ায় ভরে গেলো। তারপরেই দেখা গেলো আগুনের শিখা।
ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো। চারদিকে তাকিয়ে দেখলো ছোট-বড় আয়না সাজানো। পা বাড়িয়ে দেখলো আয়নাগুলোর নাগাল পাওয়া যায় কিনা। অসহ্য যন্ত্রণায় মাথাটা ঝিমঝিম করছে। কিন্ত বাঁচতে হলে আর এক মুহূর্তও দেরি নয়। শরীরের সমস্ত জোর দিয়ে ফ্রান্সিস আয়নাগুলোতে লাথি মারলো। চৌচির হয়ে ভেঙে আয়নার টুকরোগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে গেলো। একটা ধারালো মুখওলা টুকরো ফ্রান্সিস পা দিয়ে টেনে-টেনে কাছে আনলো। তারপর বসে পড়ে অতিকষ্টে হাত বেঁকিয়ে টুকরোটা তুলে নিল। ঘরের একপাশের ট্রাভেলার্স ট্রীর কান্ড কেটে তৈরি বেড়া আগুনে পুড়ে ফুলকি তুলে ধপাস করে পড়ে গেল। আগুন পাতায় ছাওয়া চালায় উঠে আসছে। ফ্রান্সিস কাঁচের টুকরোটা হাতে বাঁধা দড়িটায় ঘষতে লাগলো। কব্জি কেটে রক্ত পড়তে লাগলো। ফ্রান্সিস সব ব্যথা-যন্ত্রণা ভুলে একনাগাড়ে কাঁচটা ঘষতে লাগলো। দড়িটা কিছুটা কেটে যেতে এক হ্যাঁচকা টানে দড়িটা ছিঁড়ে ফেললো। ততক্ষণে মাথার ওপরের ছাউনিতে আগুন লেগে গেছে। বাইরে অনেক মানুষের চীৎকার, চেঁচামেচি কানে এলো। একবার দেখতে হয় বসির বেঁচে আছে কি না। ফ্রান্সিস দৌড়ে পেছনের ঘরে এল। দেখল, কম্বল পাতা বিছানায় শুভ্র দাড়ি-গোঁফঅলা এক বৃদ্ধ শুয়ে আছে। কাছে এসে দেখলো, একটা ছোরা তার বুকে আমূল বেঁধা। বুঝলো, বসির বেঁচে নেই। মাথার ওপর থেকে ছাউনির। একটা অংশ সশব্দে ভেঙে পড়লো। আগুনের ফুলকি উড়ল। আর এক মুহূর্তও দেরি নয়। ফ্রান্সিস জ্বলন্ত দরজার মধ্যে দিয়ে এক লাফে বাইরে চলে এলো। দেখলো, অনেক লোক জড়ো হয়েছে। তারা জল ছিটিয়ে আগুন নেভাবার চেষ্টা করছে।
আগুন থেকে ফ্রান্সিসকে বেরিয়ে আসতে দেখে অনেকেই অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। দু’একজন কিছু জিজ্ঞেস-টিজ্ঞেস করতে এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিস কোনোদিকে তাকাল না। একছুটে রাস্তায় উঠে এলো। তারপর সমুদ্রতীর লক্ষ্য করে জোরে ছুটতে লাগলো।
হাঁপাতে-হাঁপাতে সমুদ্রের তীরে পৌঁছলও। দেখলো, ওদের জাহাজ আর অন্য ভাঙাচোরা জাহাজটা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু নতুন জাহাজটা নেই। ও আর এক মুহূর্তও দেরী করলো না। লাফিয়ে ডোঙা নৌকায় উঠলো। দ্রুত হাতে দাঁড় বেয়ে ওদের জাহাজের দিকে চললো।
জাহাজে উঠে দেখলো ডেক-এর এখানে-ওখানে দল বেঁধে সবাই খেলায় মত্ত। ওর মধ্যে আবার নাচের আসরও বসেছে। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলতে লাগল–ভাইসব–এক্ষুণি পাল তুলে দাও–দাঁড়িরা দাঁড়ঘরে চলে যাও। আপ্রাণ চেষ্টায় জাহাজের যতটা গতি বাড়ানো সম্ভব বাড়াও। কেউ দেরি করবে না।
সকলেই প্রথমে হকচকিয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলো কিছু একটা হয়েছে। জাহাজের ডেক-এর মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেলো। একদল দড়ি-দড়া ঠিক করে পাল খুলে দিলো। গড়গড় শব্দে নোঙর তোলা হ’ল। দাঁড়িরা দাঁড় টানতে শুরু করলো। একটা পাক খেয়ে জাহাজ চললো উত্তর-পূর্ব মুখো।
ফ্রান্সিস ডেক-এ দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো–কিছুক্ষণ আগে একটা নতুন জাহাজ নোঙর তুলে চলে গেছে, তোমরা নিশ্চয়ই দেখেছো। সেই জাহাজটায় আছে লা ব্রুশের ছোট সর্দার। যেভাবেই হোক চাঁদের দ্বীপে পৌঁছবার আগেই ওটাকে সমুদ্রপথে ধরতে হবে! আমরা ভাইকিংরা নাকি জাহাজ চালাতে ওস্তাদ। আজকে তা প্রমাণের সময় এসেছে। চূড়ান্ত গতিতে জাহাজ চালাও। ঐ জাহাজটাকে ধরা চাই-ই চাই। ডেক এ যারা ছিল, তারা একসঙ্গে ও-হো-হা-শব্দ ধ্বনি দিল। দাঁড়িঘর থেকেও ঐ ধ্বনি ভেসে এলো। জাহাজ দ্রুত বেগে জল কেটে ছুটল।
এতক্ষণে ফ্রান্সিসের শরীর জুড়ে অবসাদ নামলো। এতক্ষণ মাথায় তরোয়ালের হাতলের ঘা-এর ব্যাথা ভুলে ছিল। তার ওপর সারাদিন এক ফোঁটা জলও পায় নি। বলতে-বলতে লক্ষ্য করলো ফ্রান্সিসের মাথার পেছনদিকের চুলে জমাট রক্তের জট, ঘাড়ে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। দু’হাতের কব্জিতে কালচে রক্তের দাগ। হ্যারি বলে উঠলো, ফ্রান্সিস এসব কি?
