–কেন? দু’তিনজন উঠলে কি হবে?
–নৌকো নীচের প্রবাল স্তরে আটকে যাবে।
কাজেই ফ্রান্সিস আর চুকো দড়ি বেয়ে-বেয়ে দু’টো নৌকোয় নেমে এলো। তারপর দাঁড় বেয়ে দ্বীপের দিকে চললো। ফ্রান্সিস জলের দিকে তাকিয়ে দেখলো, স্বচ্ছ নীল, জলের মধ্য দিয়ে প্রবালস্তর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কত বিচিত্র রকমের মাছের আঁক ঘুরে বেড়াচ্ছে।
নৌকো দু’টো দ্বীপের মাটির কাছে এসে লাগলো। ফ্রান্সিস দেখলো ওরকম আরো দুটো ডোঙা নৌকো তীরে বাঁধা রয়েছে। ওরা নৌকো দুটো বেঁধে রেখে উঁচু নীচু ধুলোটে পথ ধরে এগোতে লাগলো। একটু দূরেই বাজার দেখা গেল। সারি-সারি আয়নার দোকান। আয়না ছাড়াও রয়েছে নানা কারুকাজ করা গ্লাস, রেকাবি, জগ। ফ্রান্সিস পরপর কয়েকটা দোকানে জিজ্ঞেস করল বসির আয়না-ওলার দোকান কোনটা? কিন্তু কেউই বলতে পারলো না। ওরা ঘোরাঘুরি করছে তখনই একজন লোক চুকোকে জড়িয়ে ধরলো। চুকো প্রথমে চমকে উঠলো। তারপর লোকটাকে দেখে স্প্যানিশ ভাষায় চেঁচিয়ে উঠলো–আরে তুমি? রাস্তার মধ্যেই দু’জনে গলা জড়াজড়ি করে গল্পে মেতে উঠলো। ফ্রান্সিস তফাতে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো। ওদের বকবক তখনও চলছে। ও বুঝলো, অনেকদিন পরে দুই বন্ধুর দেখা। ওদের কথা তাড়াতাড়ি ফুরোবেনা। ফ্রান্সিস ডাকল–চুকো–আমার ভীষণ তাড়া। চুকো বলে উঠলো–আমি আমার বন্ধুকে পেয়েছি। ওদের জাহাজই যাবো। তোমাদের সঙ্গে যাবো না।
ফ্রান্সিস হাসল–কিন্তু তোমার পাওনা মুক্তো দুটো?
–হুঁ–চুকো আবার হেসে বললো ভাজিম্বাদের প্রবাদ জানো তো–যদি তুমি চিরদিনের জন্যে কোথাও যেতে চাও তাহলে মুক্তোর সমুদ্রে যাও। তোমরা কোনোদিনই মুক্তো আনতে পারবে না কেউই।
–ঠিক আছে। তাহলে চলি চুকো–তুমি আমাদের অনেক উপকার করছে। তোমার কাছে আমরা ঋণী রইলাম।
ফ্রান্সিস এবার একাই এ দোকানে ও দোকান ঘুরতে লাগলো। কিন্তু বসির আয়নাওলার দোকান কোথায় ঠিক বলতে পারলো না।
ঘুরতে-ঘুরতে বেলা হলো। খিদেও পেয়েছে ভীষণ। ফ্রান্সিস ভাবলো জাহাজে ফিরে যাবে। বিকেলের দিকে আসবে। কিন্তু কেমন একটা জেদ চেপে গেলো। বসির আয়নাঅলার হদিশ আজকেই খুঁজে বের করবো। জিজ্ঞেস করতে-করতে একজন বৃদ্ধ দোকানদার বললো, বসিরের কোন দোকান নেই। ও নিজের বাড়িতেই আয়না বানায়, আর ওখান থেকেই বিক্রী করে।
–ওর বাড়িটা কোথায়?
–সোজা চলে যাও। একটা ন্যাড়া পাহাড়ের নীচে দেখবে পান্ডানাস গাছ। ওখানেই কোথাও ও থাকে।
হাঁটতে-হাঁটতে এসে ফ্রান্সিস পান্ডানাস গাছটা দেখতে পেলো। ওখানে দাঁড়িয়ে এদিক দেখছে, তখনই একটা দশ বারো বছরের ছেলে এসে ইসারায় জানতে চাইলো, ফ্রান্সিস কি চায়। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে থেমে-থেমে বললো, বসির আয়নাঅলার বাড়ি। ছেলেটি মাথা ঝাঁকিয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকল। ফ্রান্সিস ওর পেছনে-পেছনে একটা বাড়িতে ঢুকলো। ট্রাভেলার্স ট্রীর কান্ড ডাল দিয়ে বাড়িটা তৈরি। ওপরটা পান্ডানাস গাছের পাতায় ছাওয়া। একটা ঘরের দিকে দেখিয়ে ছেলেটি চলে গেলো। ফ্রান্সিস দরজাটার কাছে গেলো। একটু ঠেলা দিতেই দরজাটা খুলে গেলো। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে ডাকলো–বসির, বসির। কোন উত্তর এলো না। ও দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। ভেতরের অন্ধকারে কি একটা নড়ে উঠল, আর সঙ্গে-সঙ্গে মাথায় একটা আঘাত পেয়ে ফ্রান্সিস উবু হয়ে মেঝেয় পড়ে গেলো। পড়বার সঙ্গে সঙ্গেই জ্ঞান হারালো।
যখন ওর জ্ঞান ফিরলো দেখলো, সেই ঘরের একটা খুঁটির সঙ্গে ওর হাতদুটো বাঁধা। মাথায় অসহ্য ব্যথা। তাকিয়েই আবার চোখ বন্ধ করল।
হা—হা–হা হাসির শব্দে ফ্রান্সিস চমকে তাকাল। দেখলো, খোলা তরোয়াল হাতে সামনে দাঁড়িয়ে লা ব্রুশের সেই ঢ্যাঙামত ছোট সর্দার।
–জ্ঞান ফিরেছে তাহলে। হা-হা–আমি ভাবলাম তরোয়ালের হাতলের এক ঘায়েই বুঝি অক্কা পেলে। ফ্রান্সিস কোন কথা বললো না। ঢ্যাঙা সর্দার বললো–আমাদের জাহাজ পুড়িয়ে দিয়েছিলে। মুক্তো বিক্রী করে লা ব্রুশনতুন জাহাজ কিনেছে। আসার সময় নিশ্চয়ই সেটা চোখে পড়েছে।
ফ্রান্সিসের মনে পড়লো আসার সময় একটা নতুন জাহাজ দেখেছিল। ও দুর্বলস্বরে বললো–হ্যাঁ দেখেছি। কিন্তু তুমি এখানে কেন?
–হা-হা–যে কারণে তুমি বসিরের কাছে এসেছো, আমিও সেই জন্যেই এসেছি। কথাটা বলে ঢ্যাঙা সর্দার গলার কাছে হাত নিয়ে বললো–এই দেখো বসিরর হাতে তৈরি আয়না। এটাই ওর হাতে তৈরি শেষ আয়না। ওকে আমি খতম করে দিয়েছি। ফ্রান্সিস দেখলো সেই ভাঙা আয়নার মত একটা আয়না ওর গলায় ঝুলছে। ওকোন কথা বললো না। মনে-মনে বললো–কি নির্মম এই জলদস্যুরা। ঢ্যাঙা সর্দার বলে উঠলো–তোমাকেও খতম করতাম। কিন্তু এখনও সে সময় আসে নি।
–আয়নার কথা তোমরা জানলে কি করে? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।
–ভাজিম্বাদের সেনাপতি জঙ্গলের মধ্যে পাতা ফাঁদে ধরা পড়েছে। প্রাণের মায়া সকলেরই আছে। মেরে ফেলার ভয় দেখাতে ও যা জানে, সব বলেছে। রাজপুরোহিত মরিটাস দ্বীপে এসে বসির আয়নাঅলার কাছ থেকে আয়না বানিয়ে যেতো। তারপর মুক্তোর সমুদ্রে সে আয়না নিয়ে নামতো আর মুক্তো নিয়ে অক্ষতদেহে ফিরে আসতো। এটুকু আমরা তার কাছ থেকে জেনেছি। কিন্তু আয়নাটা কোন কাজে লাগতো, সেটা সেনাপতির জানা নেই। নানাভাবে আমরা সে কথা বের করবার চেষ্টা করেছি। শাস্তিঘরের কোন শাস্তিই বাদ দিইনি। শেষে বোঝা গেল আয়নাটা কি কাজে লাগতো, ও সত্যিই সেটা জানে না। একটু থেমে ঢ্যাঙাসদার তরোয়ালের সরু মাথাটা ফ্রান্সিসের গলায় ঠেকালো। একটু চাপ দিয়ে বললো–এবার তুমি বলো আয়নাটা কি কাজে লাগে। আমি তোমার জন্যেই এখানে এতক্ষণ অপেক্ষা করেছিলাম।
