–আমারও তাই মনে হয়। হ্যারি মাথা নেড়ে বললো।
***
দিন পনেরো-কুড়ি কাটলো। খুব সাংঘাতিক ঝড়ের মুখে পড়তে হলো না ওদের। দু-একদিন যা ঝড়বৃষ্টি হলো, তাতে ওদের কোন ক্ষতি হ’ল না।
দূর থেকে দেখা গেলো ডাইনীর দ্বীপ। সেই সবুজ পাহাড় গাছ-গাছালি ঘেরা। চাঁদের দ্বীপ আর বেশি দূরে নেই।
দিন কয়েক পরেই ওরা চাঁদের দ্বীপের কাছে এলো। দূর থেকেই দেখা গেলো কালো কাঁচপাহাড়ের টানা এবড়ো-খেবড়ো প্রাচীর। তখন দুপুরবেলা। ফ্রান্সিস জাহাজ থামাতে বলল। রাত হলে তবে সোফালা বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো হলো। ফ্রান্সিস হ্যারির সঙ্গে পরামর্শ করলো। বললো–আমরা কেউ দ্বীপে নামবো না। আমাদের কাউকে দেখলে লা ব্রুশের দস্যুদলের লোকেরা চিনে ফেলতে পারে।
–এক কাজ করা যাক’, হ্যারি বলল, চুকোকে পাঠাও। ভাজিম্বাদের দু-একটা নৌকো ও অনায়াসে বন্দরের ঘাট থেকে নিয়ে আসতে পারবে।
–আমিও চুকোকে পাঠাবার কথাই ভাবছিলাম।
রাত হলো। ফ্রান্সিসরা আস্তে-আস্তে জাহাজটা সোফালা বন্দরের কাছে নিয়ে এলো।
চুকোকে ডাকা হলো। কি করতে হবে, বলা হলো। চুকো মাথা নেড়ে বললো–ওসব আমি পারবো না। সবে খেয়ে উঠেছি। আমার ঘুম পাচ্ছে।
ফ্রান্সিসরা পড়ল মহা সমস্যায়। ওরা যতই চুকোকে বোঝায়, চুকো ততই মাথা নাড়ে আর বলে–আমার এখন ভীষণ ঘুম পেয়েছে।
এবার হ্যারি এগিয়ে এলো। চুকোর কাঁধে হাত রেখে হ্যারি ডাকল–চুকো।
–হুঁ। চুকো চোখ বুজে ঝিমুতে-ঝিমুতে বলল।
–তুমি একটা জাহাজের মালিক হতে চাও?
চুকো চোখ খুলে বড়-বড় চোখে হ্যারির দিকে তাকাল।
–হ্যাঁ–হ্যারি বলল–যদি ডোঙা-নৌকো একটা এনে দিতে পারো তুমি তার বদলে একটা জাহাজ পাবে।
–বাজে কথা। চুকো আবার চোখ বুজল।
–আচ্ছা–মুক্তোর সমুদ্রের নাম শুনেছো?
–ওখানে গেলে কেউ ফেরে না।
আমরা ওখান থেকে মুক্তো তুলে আনবো। হ্যারি বললো।
–তোমার মাথায় গোলমাল হয়েছে, ঘুমোগে যাও। চুকো নিস্পৃহস্বরে বললো।
–চুকে আমার মাথা ঠিক আছে। তোমাকে আমরা হাঁসের ডিমেরমত দুটো মুক্তো দেব।
চুকো এবার চোখ তুলল। বলল মুক্তোর সমুদ্র থেকে মুক্তো আনতে পারবে?
–অনায়াসে পারবো, যদি তুমি শুধু একটা নৌকা এনে দাও।
–তোমরা যাচ্ছ না কেন?
–সে অনেক কথা। তোমাকে পরে বলবো। এখন এই কাজটুকু করে দাও। তোমরা হচ্ছো স্পেন দেশের লোক। বীরের জাত সামান্য কাজটুকু করতে পারবে না।
হঠাৎ চুকো উঠে দাঁড়ালো। একবার চারপাশের দাঁড়ানো ভাইকিংদের দিকে জামাটা হাত দিয়ে ঝেড়ে নিল। ওর ভাবভঙ্গী দেখে অনেকেই আড়ালে হাসলো। হাসি সামলাতে অনেকে কেবিনঘরের বাইরে চলে গেল। চুকে গেল। চুকো গম্ভীর ভঙ্গীতে বললো–একটা নৌকো নিয়ে আসা এ আর কি এমন কাজ। ও দরজার দিকে এগোলো। হঠাৎ পেছন ফিরে বলল–হ্যারি–আমাকে দুটো মুক্তো দিতে হবে কিন্তু।
–কথা যখন দিয়েছি নিশ্চয়ই দেবো। তুমি মুক্তো বিক্রী করে জাহাজ কিনো।
চুকো বীরদর্পে বেরিয়ে গেলো। জাহাজ থেকে দড়ি বেয়ে-বেয়ে জলে নেমে গেল। তারপর সাঁতরে চললো সোফালা বন্দরের দিকে চারদিকে নিশ্চিদ্র অন্ধকার। জাহাজের আলোগুলো নেভানো। ফ্রান্সিস আর হ্যারি ডেক-এ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো।
কিছুক্ষণ পরেই অন্ধকারে জলভাঙার শব্দ উঠলো। অন্ধকারে ফ্রান্সিস ভালো করে তাকিয়ে দেখলো দু’টো নৌকো আসছে। একটাতে ভূতের মত চুকো বসে আছে। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বললো–চুকো–নৌকোদু’টো দড়ির সঙ্গে বেঁধে রাখো।
নৌকো দু’টো জাহাজের ঝোলানো দড়ির সঙ্গে চুকো বেঁধে দিলো। তারপর উঠে এলো জাহাজের ডেক-এ। গম্ভীরচালে হেঁটে কেবিন-ঘরের দিকে চলে গেলো।
ফ্রান্সিস বন্ধুদের ডেকে বলল–আর এক মুহূর্তও এখানে থাকা নয়। এই অন্ধকারের মধ্যেই আমাদের পালাতে হবে। সবাই যে যার জায়গায় যাও। জাহাজ দক্ষিণমুখে চালাও।
নোঙর তোলা হলো। জাহাজ চললো দক্ষিণমুখো। কিন্তু মরিটাস দ্বীপ কি ঠিক দক্ষিণ দিকে? সংশয় দেখা দিলো ফ্রান্সিসের মনে। ও কেবিনঘরে গিয়ে ঢুকলো। দেখলো চুকোর ভিজে জামাকাপড় পালটানো হয়ে গেছে। ও ঘুমোবার উদ্যোগ করছে। ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো–চুকো–এখন আমরা কোনদিকে যাবো?
দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। চুকো গম্ভীর ভঙ্গীতে বললো।
–মরিটাস দ্বীপে পৌঁছতে কতদিন লাগবে?
–হুঁ! চুকো হেসে বললো–কাল সকালেই পৌঁছে যাবো।
সত্যিই তাই। পরদিন ভোর-ভোর সময়ে দূর থেকে মরিটাস দ্বীপ দেখা গেলো। কাছাকাছি আসতে দেখা গেল দ্বীপটার একদিকে ন্যাড়া পাহাড়, পাথর, ধুলো-বালি। সবুজের চিহ্নমাত্র নেই। অন্যদিকে সবুজ ঘাসে ঢাকা পাহাড়, গাছ-গাছালি।
চুকোর নির্দেশমত এখন জাহাজ চলছে। প্রবালের স্তরের কাছাকাছি এসে চুকো হাত তুলে জাহাজ থামাবার নির্দেশ দিলো। চুকো ঠিকই বলেছিল। জাহাজের কাছ থেকে তীর পর্যন্ত আগুনে প্রবালের স্তর। জাহাজ থেকে সেই লাল প্রবাল স্তর স্বচ্ছ জলের মধ্যে জি দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এবড়ো-খেবড়ো লাল সজে রঙের প্রবাল স্তর বিস্তৃত। এই স্তরের কাছে আরো দুটো জাহাজ নোঙর করা ছিলো। তার মধ্যে একটা জাহাজ ছোট ভাঙাচোরা। অন্য জাহাজটা নতুন। জলদস্যুদের ক্যারাভেল সেটা! তবে মাস্তুলের মাথায় কোন পতাকা উঠছে না। কাজেই বোঝা যাচ্ছে না, ওটা অন্য কোন দেশের জাহাজ।
ফ্রান্সিস এসব দেখছিলো। চুকো ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বললো–একটা ভাঙা নৌকায় মাত্র একজনই যাওয়া যাবে।
