-যাঃ। বিনোলা মুখে হতাশার শব্দ করে ঘাসে ঢাকা বালির ওপর বসে পড়ল। ছেঁড়া কাছিটা হাতে নিয়ে ভাইকিংরা এ ওর মুখের দিকে হতাশার ভঙ্গিতে তাকাল। হ্যারি ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–ফ্রান্সিস, এটা কী হল? এত মোটা কাছিটা–
-হ্যাঁ ছিঁড়ে গেল। কিন্তু কেন? কথাটা বলেই ফ্রান্সিস কাছির ছেঁড়া জায়গাটা মাটি থেকে তুলে খুঁটিয়ে দেখে বলল–বোঝাই যাচ্ছে কাছিটার এই জায়গাটা দীর্ঘদিন অত্যন্ত ধারালো কিছুর সঙ্গে ঘষা খেয়ে খেয়ে ছিবড়ে মতো বেরিয়ে গেছে। জোরে টান পড়তে একেবারে ছিঁড়ে গেছে।
জলের নীচে এমন কী ধারালো জিনিস থাকতে পারে? হ্যারি বলল।
–অনেক কিছু! বড় শামুকের ভাঙা খোল, কাঁচ বা পাথরের চাইয়ের ধারালো মাথা। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে তো আর স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধারের কোনও আশাই রইল না। শাঙ্কো বলে উঠল।
উঁহু। হাল ছাড়তে আমি রাজি নই। একটু সময় চাই। ছক কষতে হবে। কথাটা বলে ফ্রান্সিস ঘাসে-ঢাকা বালির ওপর বসে পড়ল। বন্ধুরা সব একজন দুজন করে এসে ফ্রান্সিসকে ঘিরে দাঁড়াল। হতাশায় ম্লানমুখ সকলেরই। এত কষ্ট করে এতদূর এগিয়ে এসে হার স্বীকার করতে হবে? ফ্রান্সিস দু’হাত হাঁটুতে রেখে মাথা নিচু করে ভাবতে লাগল। সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। নিস্তব্ধ চারিদিক। শুধু পাখপাখালির ডাক আর ঘূর্ণিরত পাক খাওয়ায় জলের শব্দ শোনা যেতে লাগল।
হঠাৎ ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল–দড়ির কুণ্ডলীটা নিয়ে এসো। শাঙ্কো আর সিনাত্রা কাঁধে দড়ির কুণ্ডলীটা নিয়ে ফিরে এল।
–দড়ি দিয়ে কী করবে? শাঙ্কো কিছু বুঝতে না পেরে বলল।
ঐ ঘূর্ণিতে নামতে হবে। ফ্রান্সিস দড়ির মুখটা বের করতে করতে বলল।
–সর্বনাশ! ফ্রান্সিস, এ তো আত্মহত্যা। হ্যারি ভীতস্বরে চেঁচিয়ে বলল।
–না হ্যারি। কাপুরুষ আত্মহত্যা করে। বীরপুরুষ লড়াই করে বেঁচে থাকে। এটা জীবনের ঝুঁকি। বলা যায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষা। এই ঝুঁকি নিতেই হবে। নইলে হার মেনে মাথা নিচু করে চলে যেতে হবে। সেই বৃদ্ধ অভিজ্ঞ নাবিক বলেছিল–ঘূর্ণির একেবারে নীচে ওপরের চক্করের দাপট থাকে না। সেখানে জল অনেক শান্ত থাকে। আজকে সেটা হাতেকলমে পরীক্ষার সময় এসেছে।
ফ্রান্সিস লম্বা দড়িটার একটা মাথা কোমরে দুটো প্যাঁচ দিয়ে বাঁধল। তারপর বলল–আমি দড়ির মাথাটা নিয়ে কাছিতে ঝুলে ঘূর্ণির ঠিক ওপরে যাব। ওখান থেকে ঘূর্ণির মধ্যে নামব। তারপর ঘূর্ণির পাকই আমাকে দ্রুত টেনে নিচে নামাবে। একেবারে নীচে অনেকটা শান্ত জলস্তর পাব। কোমর থেকে দড়ির মাথাটা বের করে ছেঁড়া কাছিটায় শক্ত করে বেঁধেই দড়িতে জোরে দুটো হ্যাঁচকা টান দেব। সঙ্গে সঙ্গে দড়ির অন্য মুখটা ধরে তোমরা সবাই মিলে আমাকে টেনে তুলবে। খুব সাবধান। এতটুকু দেরি করা চলবে না। জলের নীচে সাধারণ মানুষের চেয়ে আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারি। দেশের ডুবুরিদের কাছ থেকে এই কৌশলটা আমার শেখা আছে। আমার নিরাপত্তার কথা একেবারে ভাববে না। তাতে সময় নষ্ট হবে। তৈরি হও সবাই।
কোমরে দড়ি বাঁধা অবস্থায় ফ্রান্সিস চেস্টনাট গাছটায় উঠে পড়ল। তারপর কাছিটা ধরে ঝুলে পড়ল। হাত দুটো দিয়ে কাছি ধরে দুলতে দুলতে চলে এল ঠিক ঘূর্ণির ওপর। একটুক্ষণ দম নিল। তারপর দু’হাত ছেড়ে দিয়ে দ্রুত হাঁটু দুটো দু’হাত দিয়ে বুকে চেপে ধরে মাথা নিচু করে ঘূর্ণির মাঝখানে পড়ল। মুহূর্তে প্রচণ্ড পাক খেয়ে মাথাটা ঘুরে উঠল। জোর পাক খেতে খেতে নীচে তলিয়ে গেল। হাত-পা খোলা থাকলে বোধহয় ছিঁড়ে বেরিয়ে যেত ঘূর্ণির প্রচণ্ড পাকে। ওর মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। আশ্চর্য! নীচে জলের সেই প্রচণ্ড পাক নেই বললেই চলে। ফ্রান্সিস একটা বড় পাথরের মাথায় পা রাখল। জলের নীচেটা কিন্তু পুরোপুরি অন্ধকার নয়। ঘোলা জলের মধ্যে দিয়েও সূর্যের অল্প একটু আলো জলতল অবধি পৌঁছচ্ছে। সেই স্নান আলোয় ফ্রান্সিস দেখল ছেঁড়া কাছিটা ঐ পাথরের চাঁইয়ের মাথার কাছে পড়ে আছে। পাশেই একটা অন্ধকার গভীর খাদে কাছিটা নেমে গেছে। এই গহরের জন্যেই এখানে এরকম প্রচণ্ড ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়েছে। কোমর থেকে দড়ির মাথাটা বের করতে করতে দেখল পাথরের চাইয়ের মাথাটা উঁচিয়ে আছে। ভীষণ ধারালো। এখানে ঘষা খেয়ে খেয়েই কাছিটার ছিবড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। তাই জোর টান পড়তেই ছিঁড়ে গেছে। অভিজ্ঞ হাতে দ্রুত কাছিটার ছেঁড়া মাথায় দড়িটা শক্ত করে বেঁধে পাথরের ছুঁচোলা মাথা থেকে এক ঝটকায় দড়িটা সরিয়ে দিয়ে পরপর দুটো হ্যাঁচকা টান মারল ফ্রান্সিস। ওপরে দড়ি ধরে দাঁড়ানো শাঙ্কোরা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠে দড়ি টানতে শুরু করল।
ফ্রান্সিস প্রাণপণে দড়িটা হাতে-পায়ে জোরে চেপে ধরে রইল। ঘূর্ণির মুখ থেকে অনেকটা সরে এসেছে বলে ঘূর্ণির প্রচণ্ডতা এখানে কম। এর পাক খাওয়া জলের টান চোখ বুজে সামলাতে লাগল। চোখের সামনে একটা কালচে ভাব বাড়তে লাগল। মাথা ঘোরা বেড়ে গেল। কিন্তু ফ্রান্সিস প্রাণপণে দড়ি চেপে ধরে রইল। এখন এই দড়িই একমাত্র ভরসা। ঘূর্ণির পাক তখনও ওকে নীচে টানছে।
দম ফুরিয়ে আসছে। চোখের সামনে সবকিছু কেমন অন্ধকার হয়ে আসছে। তবু ফ্রান্সিস ভয় পেল না। চোখ বুজে দড়ি চেপে ধরে রইল। মুঠি আলগা করল না। প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় ফ্রান্সিস জলের ওপর ভুস করে মাথা তুলল। মুখ হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগল। ফ্রান্সিসকে জলের উপরে মাথা তুলতে দেখেই শাঙ্কোরা কয়েকটা জোর টান দিয়ে ফ্রান্সিসকে তীরের বালুর ওপর টেনে আনল। কোমরের ওপরটা তীরের বালিতে কোমর থেকে পা জলের মধ্যে। হ্যারি দ্রুত ছুটে এসে ফ্রান্সিসের মাথার কাছে বসল। মাথাটা আস্তে কোলে তুলে নিয়ে উৎকণ্ঠার সুরে বলে উঠল– ফ্রান্সিস, ফ্রান্সিস, ভালো আছ তো? ফ্রান্সিস চোখ খুলল। দেখল বন্ধুদের ঝুঁকে পড়া মুখগুলো কেমন নড়ছে। মাথা ঘুরছে তখনও। ও চোখ বুজল।
