আস্তে আস্তে একসময় ও পারে চলে এল। গাছের কাণ্ডটা দু হাতে জড়িয়ে ধরে একটুক্ষণ দম নিল। তারপর কাণ্ড ডাল ধরে নিচে মাটিতে নেমে এল। দেখল গাছটার গোড়ায় প্রায় হাতখানেক উঁচু পাথরের টুকরোর স্তূপ। বড় টুকরোও আছে। যেন কেউ সাজিয়ে রেখেছে। এটা প্রকৃতির খেয়াল হয়ে নি। ও ভুরু কুঁচকে ভাবল–এরকম ছোট বড় পাথরের টুকরো কারণ কি? কোন বাচ্চা ছেলেমেয়ের কাণ্ড এটা নয়। এভাবে পাথরের টুকরো সাজিয়ে রাখার কারণ কি? ততক্ষণে শাঙ্কো আর সিনাত্রা ওর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। একটুক্ষণ ঘাসের ওপর বসে বিশ্রাম নিয়ে ফ্রান্সিস বলল-কেমন এই চেস্টনাট গাছের তলাটা আর চারপাশ খুঁটিয়ে দেখতে হবে। একটাই গাছ, ঝোঁপজঙ্গলও বেশি নেই। খোঁজা শুরু কর। ইবু সালোমনের দেহরক্ষীরা এপারে নিশ্চয়ই এসেছিল আর চুপ করে বসে থাকে নি। এখানেও ওরা কিছু করেছে। কী করেছে সেটা খুঁজে দেখতে হবে। সমস্ত জায়গাই তন্ন তন্ন করে খোঁজো। বেলা বাড়ছে।
ওপারে একটা পাথরের ওপর বসে রব্বানি দূর থেকে ফ্রান্সিসদের কাণ্ডকারখানা দেখছিল। ওরা ওপারে কী করছে বোঝা যাচ্ছে না। ওপারে ওর কোন যোদ্ধাও। নেই। রব্বানি দ্রুত উঠে বসল। ও সজাগ হল। যদি ঐ তিনজন ভাইকিং সুযোগ বুঝে পালিয়ে যায় ইবু গ্যাব্রিয়েল ওদের গর্দান নেবে। ও তাড়াতাড়ি হ্যারির কাছে এল। রব্বানি বলল–ওপারে আমাদের কোন যোদ্ধা এ যাবৎ যায় নি। তোমাদের বিশ্বাস নেই। আমি দুজন যোদ্ধাকে নিয়ে ওপারে যাবো।
বেশ। চলুন নৌকোয় চড়ে আমিও একসঙ্গে যাবো।
রব্বানি দু’জন যোদ্ধাকে ইশারায় ডাকল। ওরা কাছে এলে বলল
–চলো ওপারে যাবো। তোমরা কাছিতে ঝুলে ঝুলে যাবে।
–ওভাবে কি যাওয়া যাবে? একজন যোদ্ধা বলল।
–ঐ ভাইকিংটা গেল কী করে?
–ওর বোধহয় জীবনের ওপর কোন মায়া দয়া নেই। যোদ্ধাটি বলল।
–মরুক গে। চলো নৌকোয় চড়েই যাবে। রব্বানি বলল। হ্যারি আর রব্বানিরা ঝোঁপঝাড় ভেঙে পাথরের চাঁইয়ের গাছের মোটা মোটা শেকল এড়িয়ে নৌকাগুলির দিকে চলল।
–কিন্তু কী খুঁজব? শাঙ্কো ঠিক বুঝতে না পেরে বলল।
–এমন কিছু যা প্রকৃতির সৃষ্টি নয়। মানুষের হাতে গড়া। গাছটার গোড়ায় পাথর-টুকরো কেমন যেন মানুষের হাতে সাজিয়ে রাখা। অবশ্য এলোমেলোভাবে। নাওখোঁজা শুরু করো।
তিনজনে চারপাশ মাথা নিচু করে খুঁজতে লাগল। ততক্ষণে আরো কয়েকজন ভাইকিংও কাছি ঝুলে ঝুলে এপারে চলে এসেছে। সবাই মিলে খোঁজা শুরু হল। তারপরই হ্যারি এল। সঙ্গে রব্বানির দুজন যোদ্ধা সবাই মিলে খোঁজা শুরু হল। ঝোঁপঝাড় টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হল। হঠাৎ শাঙ্কো নদীর জলের কাছাকাছি দেখল ওখানেও টানা পাথরের ছোটো-বড়ো টুকরো যেন একটানা এই গাছটার দিকে এসে শেষ হয়ে গেছে। ও গলা চড়িয়ে ডেকে বলল–ফ্রান্সিস, এদিকে দেখো তো। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ছুটে এল। দেখল পাথরের সারি যেখানে এসে শেষ হয়েছে সেখানে বালি-মেশানো মাটি কেমন যেন চেপে বসানো। ফ্রান্সিস বলে। উঠল–সবাই হাত লাগাও। পাথরের খণ্ডগুলো সরিয়ে ফেলো। দেখা যাক নীচে কী। আছে। ততক্ষণে হ্যারিও এসে দাঁড়িয়েছে। সবাই ছুটে এসে হাত লাগাল। অল্পক্ষণের মধ্যেই পাথরখণ্ডগুলো সরিয়ে ফেলতেই দেখা গেল টানা গর্তমতো। গর্তের ওপরকার বালি মেশানো মাটি তুলে ফেলতেই দেখা গেল একটা মোটা কাছি। ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল–হ্যারি, রহস্য আর রহস্য নেই। এই কাছি দিয়ে সিন্দুকটা বেঁধে ফেলে দেওয়া হয়েছিল ঐ ঘূর্ণির মধ্যে। পরে প্রয়োজনে যাতে সিন্দুকটা টেনে তুলে আনা যায়।
–বলো কী? শাঙ্কো প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।
–তাহলে তো এই দড়ি ধরে টানলেই ঐ সাংঘাতিক ঘূর্ণি থেকে সিন্দুকটা উঠে আসবে। হ্যারি বলল।
–অবশ্যই। ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
তবে তো যে কেউ এসে এই কাছি টেনে সিন্দুকটা তুলে আনতে পারত। শাঙ্কো বলল।
–পারত যদি সে বুঝতে পারত এভাবে পাথরখণ্ড মানুষই সাজিয়েছে, প্রকৃতি নয়। এটা বুঝতে গেলে তাকে অন্তত আমার মতো বুদ্ধিমান হতে হবে। যাক গে, দেরি নয়। সবাই মিলে কাছিটা টেনে তুলে ফেলল।
সবাই কাছি টেনে তুলে ফেলল সবটা তুলতে দেখা গেল কাছির মাথাটা চেস্টনাট গাছের গোড়া পর্যন্ত গেছে। আর অনুমান নয়। চেস্টনাট গাছটার ঠিক গোড়ায় কাছিটা বেঁধে রাখা হয়েছে। তাই ওখানে পাথরখণ্ড দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল।
–তাহলে তো এখন সব পরিষ্কার হয়ে গেল। নিশ্চয়ই ঐ সিন্দুকের হাতল দুটোয় এই কাছিটা বেঁধে ওরা টানা কাছিতে ঝুলিয়ে এনে ঐ ঘূর্ণির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। ওরা সত্যিই দুঃসাহসী ছিল। কোনও সন্দেহ নেই। হ্যারি বলল। কাছি টানতেই বোঝা গেল ওটার সঙ্গে খুব ভারী কিছু বাঁধা আছে।
শাঙ্কোরা বারকয়েক টানতেই বুঝল, যে ভারী জিনিসটা বাঁধা আছে সেটা উঠে আসছে। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে কাছি ছেড়ে দিয়ে দু’হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠল–ফ্রান্সিস, কাছিটার সঙ্গেই সিন্দুকটা বাঁধা আছে। মারো টান।
হ্যারি হেসে বলল–ফ্রান্সিস, এত সহজে সিন্দুকটা উদ্ধার হবে ভাবিনি।
ফ্রান্সিস কিন্তু হাসল না। বলল–হ্যারি, সিন্দুকটা জলের তলা থেকে এখনও কিন্তু পারে নিয়ে আসতে পারোনি। পারলে বুঝব সফল হলাম। ফ্রান্সিসের কথা শেষ হতে না হতেই কাছিটা ছিঁড়ে গেল। শাঙ্কোরা ভারসাম্য হারিয়ে এ ওর গায়ে গড়িয়ে গেল। ছেঁড়া কাছিটা জল থেকে উঠে এল। সবাই হতবাক।
