–ফ্রান্সিস, শরীর ঠিক আছে? হ্যারি ব্যাকুলকণ্ঠে জিগ্যেস করল।
ফ্রান্সিস চোখ বোজা অবস্থায় আস্তে ডান হাত তুলে মাথায় ছুঁইয়ে আঙুল ঘোরাল। তার মানে ওর মাথা ঘুরছে।
–এক্ষুনি মাথা ঘোরা কমবে। তুমি চোখ বুজে বিশ্রাম করো। ভেন তো নেই। ভেন থাকলে ওষুধ দিতে পারত। হ্যারি বলল।
কারো মুখে কথা নেই বালি ঘাসের মধ্যে কেউ কেউ বসে আছে, কেউ কেউ শুয়ে পড়েছে। শুধু শাঙ্কো ফ্রান্সিসের শিয়রের কাছে একঠায় দাঁড়িয়ে রইল। পারে তুলে আনা কাছিটার কাছে কেউ গেল না। কাছিটা দিয়ে ফ্রান্সিস সিন্দুকটা বাঁধতে পেরেছে কিনা এই নিয়ে কেউ ভাবলই না। কতক্ষণে ফ্রান্সিস সুস্থ হবে–এই একটাই দুশ্চিন্তা সবার।
ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ খুলল। হ্যারি ঝুঁকে পড়ে জিগ্যেস করল– মাথা ঘোরাটা কমেছে? ফ্রান্সিস দুর্বল ভঙ্গিতে আস্তে মাথাটা কাত করল। হ্যারি বলে উঠল–শাঙ্কো, ফ্রান্সিসের মাথা-মুখ আস্তে আস্তে মুছে দাও। এতক্ষণ জলে ছিল।
শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে নিজের জামাটা খুলে ফেলল। হাঁটু গেড়ে বসে ফ্রান্সিসের মুখ কপাল মাথায় আস্তে আস্তে একটু চাপ দিয়ে মুছে দিতে লাগল। মোছা শেষ হলে ফ্রান্সিসের বোধহয় একটু ভালো লাগল। ম্লান হাসল। শাঙ্কো তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে। ডাকল–সিনাত্রা, এখানে এসো। ফ্রান্সিসকে জল থেকে তুলে আনব। তুমি ধরো।
তারপর দুজনে আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসকে টেনে বালি ঘাসের ওপর তুলে আনল। এবার শাঙ্কো আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের জামাটা টেনে বুকের কাছে তুলে দিল। তারপর বুক-পেট মুছিয়ে দিতে লাগল। জলে ভিজে শরীর কেমন সাদাটে হয়ে গেছে। তারপর পা মুছিয়ে দিল। বেশ আরাম হল ফ্রান্সিসের। ও হাত দিয়ে ছেঁড়া কাছিতে বাঁধা দড়িটার দিকে ইঙ্গিত করল। হ্যারি বুঝল সেটা বলল-জাহান্নামে যাক ঐ সিন্দুক। আগে তুমি সুস্থ হও। ফ্রান্সিস চোখ বুজল!
মাথার ওপরে সূর্য তখন পশ্চিম আকাশের দিকে অনেকটা ঝুঁকে পড়েছে। সারাদিন এত খাটুনি গেছে। সবাই উপোসী। কিন্তু কেউ এই নিয়ে একটি কথাও বলল না।
বেশ কিছুক্ষণ পরে ফ্রান্সিস নড়েচড়ে উঠল। আস্তে ডাকল–হ্যরি!
হ্যারি তাড়াতাড়ি ঝুঁকে পড়ল।
–কাছিতে বাঁধা–দড়িটা-টানো। ফ্রান্সিস থেমে থেমে বলল।
–আগে তুমি সুস্থ হও তো তারপর। হ্যারি প্রায় ধমকের সুরে বলল।
উঁহু, হাতে একদম সময় নেই। ইবু গ্যাব্রিওল মোটেই ভালো মানুষ নয়। ফ্রান্সিস দম নিয়ে নিয়ে নিম্নস্বরে বলল।
হ্যারি শাঙ্কোর দিকে তাকাল। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল-ভাইসব, এসো। দড়ি টেনে সিন্দুকটা তুলতে হবে। হাত লাগাও। কিন্তু খুব আস্তে আস্তে টানতে হবে। আবার না দড়ি ছিঁড়ে যায়।
শুয়ে-বসে থাকা ভাইকিং বন্ধুরা ছুটে এল। কাছিতে বাঁধা দড়িটা আস্তে আস্তে টানতে লাগল। নীচের ধারালো মাথাওয়ালা পাথরের চাইটা এড়িয়ে ফ্রান্সিস কাছিটা সরিয়ে রেখে এসেছিল। দড়ির ঘষা খাওয়ার আশঙ্কা ছিল না। ছিঁড়ে যাবার আশঙ্কাও ছিল না। আস্তে আস্তে সিন্দুকটা টেনে এনে তীরে তোলা হল। ফ্রান্সিসের অনুমান ঠিক। চারপাশে এখানে-ওখানে সোনার গিল্টি করা সিন্দুকটার ওপরেও একটা মোটা লোহার হাতল। দু’পাশের লোহার হাতল দুটোও বেশ মোটা। হ্যারি বুঝল ইবু সালোমন বেশ ভেবেচিন্তেই এসব করেছিলেন। এই লোভাত নদীর তীরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে তিনি মাঝে মাঝে আসতেন। হয়তো তখনই এই পরিকল্পনা করেছিলেন। অসৎ দুরাচারী পুত্রকে তিনি অনেকদিন আগেই চিনেছিলেন।
সিন্দুকটার কাছে গিয়ে সবাই ভিড় জমিয়েছে। সামনের কড়ায় একটা বড় তালা জ্বলছে। শাঙ্কো তালাটা ধরে টানাটানি করল। কিন্তু তালা খুলল না। তখন ও কোমর থেকে বড় ছোরাটা বের করল। তালা লাগানো কড়াটায় ছোরাটা ঢুকিয়ে প্রাণপণে চাড় দিতে লাগল। চাড় দিতে দিতে জলে ভেজা জংধরা কড়াটা বেশ খানিকটা আলগা হল। এবার কড়ার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে জোরে হ্যাঁচকা টান। কড়াটা আরো আলগা হল। হাঁপাতে হাঁপাতে শাঙ্কো বলল–তোমরা একে একে কড়াটা টানতে থাকো। একজন একজন করে বন্ধুরা কড়া ধরে টান মারতে লাগল। একসময় কড়াটা সশব্দ খুলে এল। শাঙ্কো ডালার ওপরের কড়া ধরে টান দিল। ডালা খুলল না। শাঙ্কো আবার টান দিল। আবার–আবার। শেষ পর্যন্ত ডালা খুলে গেল। বিকেলের নিস্তেজ আলোতেও ঝিকিয়ে উঠল আরবী স্বর্ণমুদ্রাগুলি। বেশ কিছু হিরে বসানো স্বর্ণালঙ্কার ও চুনি-পান্না একপাশে রয়েছে দেখা গেল। ভাইকিং বন্ধুরা উল্লাস ধ্বনি তুলল–ও হো হে।
ততক্ষণে ফ্রান্সিসকে উঠে বসতে দেখে ওরা ছুটে গিয়ে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল।
–দেরি নয়। এখনই ফিরব। ফ্রান্সিস ঝোলা সিন্দুকটার দিকে একবার তাকিয়ে নিল। এরকম বহুমূল্য গুপ্তধন ওর কাছে তো নতুন কিছু নয়।
রব্বানিরা তখন ছুটে এল। ভিড়ের মধ্যে এসে ওরাও অবাক চোখে তাকিয়ে রইল ঝিকিয়ে ওঠা কুফি অলঙ্কারের দিকে। রব্বানি জীবনের কোনদিন এত সোনার ভাণ্ডার অলঙ্কার দেখেনি। হঠাৎ রব্বানি হাসলেন উল্লাস দু’হাত ওপরে তুলে নাচতে লগাল। ভাইকিংরা আনন্দে ধ্বনি তুললও হো হো। ওরা অবশ্য ফ্রান্সিসের উদ্ধার করা এরকম স্বর্ণভাণ্ডার আগেও দেখেছে। কাজেই ওরা খুব আশ্চর্য হল না। ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুরাও বুঝল ফ্রান্সিস স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধার করেছে। ওরাও ও-হো-হো হো ধ্বনি তুলল। রব্বানি তখনও নেচেচলেছে। কাছে এসে মৃদু হেসে হ্যারি বলল ঐ সিন্দুকের একটা কুফিও কিন্তু আপনি পাবেন না। রব্বানি নাচা থামাল। সত্যই তো এবারই তো গ্যাব্রিয়েল নিয়ে নেবে দয়া করে দু’চারটে স্বর্ণমুদ্রা দিতে পারে। এবার ও ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল- তোমরা কিন্তু একটা কুফিও পাবে না।
