বেশকিছুক্ষণ পর সেই কাণ্ডে কাটাদড়ি বাঁধা গাছটার নিচে এল সবাই। হ্যারি রব্বানির কাছে গিয়ে বলল–আপনারা এখানে গাছের নিচে পাথরে বসুন বিশ্রাম করুন। আমরা কাজে নামছি। রব্বানি কিন্তু হাঁ করে দেখছিল ফ্রান্সিসদের। এরা কাছি দড়ি এনেছে কেন কি করবে ওসব দিয়ে তাই জিজ্ঞেস করল–এসব কাছি দড়ি দিয়ে কী করবেন? এখন কি ঠিক বুঝবেন না দেখতে থাকুন পরে বুঝবেন। রব্বানি যোদ্ধাদের বলল ওরা ওদের মত যা করছে করুক। আমাদের শুধু কড়া নজর রাখা। কাজই যে যেখানে পারো বসে পড়। কিন্তু চোখের বাইরে কাউকে যেতে দেবে না।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোরা ততক্ষণ নৌকো থেকে কাছি দড়ি এনে সেই গাছটার নিচে জড় করে ফেলেছে। দ্রুত কাজ করছে সবাই। রব্বানি নদীর ঘুর্ণিটা এখন কাছ থেকে স্পষ্ট দেখাও গেল। লোকমুখে এতদিন শুনেছে সমুদ্রে নদীতে প্রচণ্ড ঘূর্ণিতে জাহাজে প্রচণ্ড পাক খেতে খেতে ডুবে যায়। নদীর ঘূর্ণির টানে আরোহী সুদ্ধ নৌকো ডুবে যায়। ঘূর্ণির প্রচণ্ড টান জাহাজ নৌকো মানুষ তো বটেই কোন কিছুর সাধ্য নেই সেই টান থেকে উদ্ধার পাওয়ার।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডেকে বল–আর এক মুহূর্তেও দেরি নয়। কাছির একদিকের মাথা নিয়ে গাছটায় ওঠ। কাটা দড়ির কাছে গিয়ে কাণ্ডটায় শক্ত করে ধরো। বিনালা নেই। সিনাত্রা তোমার পেছনে পেছনে উঠবে। কাটা দড়িটা এত দিনের রোদে বৃষ্টিতে নিশ্চয়ই আর তেমন শক্ত নেই। ওটা ছিঁড়তে গেলে সময় নষ্ট হবে। ওটার ওপরেই কাছিটা যত শক্ত করে পারো বাঁধবে দুজন মিলে। যাও। পারবে তো?
–কিছছু ভেব না। শাঙ্কো দড়ির মাথাটা আলগা ফঁস দিল। কাঁধে ঝুলিয়ে গাছটা বেয়ে উঠতে লাগল। এখানে ওখানে ডাল ধরে ধরে। সিনাত্রাও ওর দেখাদেখি সেইভাবে উঠতে লাগল। জাহাজে জাহাজেই তো জীবন কেটেছে এতদিন। শক্ত বাঁধনের কৌশল ওরা ভালভাবেই জানে। অল্প সময়ের মধ্যেই বাঁধা শেষ করে নেমে এল।
এবার কাছিটা নিয়ে গিয়ে কিছু দূরে নদীতীরে আমাদের নৌকোটা বাঁধা আছে সেই নৌকোয় চড়ে ও পারে চলে যাও। এখন ভাটার টান চলছে। কাজেই নৌকো স্রোতের টানে ঘূর্ণির দিকে যাবে না। ওপারে পৌঁছে দু’জন কাছিটা নিয়ে ঐ চেস্টনাট গাছের নিচে যাবে। কাছির থোকা কোমরে আগা করে বেঁধে চেস্টানাট গাছটায় উঠবে। এপারের গাছটার প্রায় সমান উচ্চতায় কাছিটা শক্ত করে বাঁধবে। তারপর নেমে আসবে। তখন নদীর ঐ ঘূর্ণিটার ওপর দিয়ে কাছিটা টান টান হয়ে থাকবে। যাও দেরি করো না। ফ্রান্সিস একটু গলা চড়িয়ে বলল।
দুজনে ঝোঁপঝাড় পার হয়ে নৌকার কাছে এল। দুজনের হাতে তখন কাছিটা ধরা। নৌকা বাঁধার দড়িগুলি খুলে দুজন নৌকা ভাসিয়ে দিল। কিছুদূর ঘূর্ণিটা দেখা গেল। কিন্তু ভাটার টানে নৌকো ওদিকে গেল না। ওপারে নৌকা পৌঁছল। শাঙ্কো কাছিটা নিয়ে বসল। সিনাত্রা ওকে পেছনে কাছি ধরতে সাহায্য করল। দুজন কাছি নিয়ে চেস্টনাট গাছটায় কাণ্ড বেয়ে বেয়ে উঠল। দেখল–ফ্রান্সিসের অনুমান সত্য। একই উপায়ে কাটা কাছি বাঁধা। দুজনে কাণ্ড পেঁচিয়ে কাটা দড়ির ওপরে খুব শক্ত করে কাছিটা বাঁধল। দু’জন নেমে এল। দেখল এপারে মাত্র একটাই চেস্টনাট গাছ। ওপারের তুলনায় এ পারটা অনেক সমতল। সবুজ ঘাসে ঢাকা। এবার নদীর দিকে তাকিয়ে দেখল ঘূর্ণিটার ওপর দিয়ে কাছিটা টানা টান বাঁধা হয়ে গেছে।
এ পারে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস বলল ইবু সালোমদের দেহরক্ষীরা এভাবেই দু’ধারের গাছদুটিতে বেঁধেছিল। কাজেই নিচে ঘূর্ণির ভয় ছিল না। আমরাও দড়ি ধরে ঝুলে ঝুলে ঘুর্ণির ওপর দিয়ে ওপারে চলে যেতে পারবো। নিরাপদে।
–তাহলে তো হাত ফসকে নিচের ঘুণীর জলে পড়তে হবে না।
–ঠিক তাই। প্রথমে ঝুলে ঝুলে আমিই যাব। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি চমকে উঠে বলল পাগল হয়েছে? ঘূর্ণির ওপর দিয়ে এভাবে যাওয়া? হাত ফসকে গেলে তো। ওকে থামিয়ে দিয়ে ফ্রান্সিস বলল–আমার অভ্যাস আছে এটা তো তুমি জানো। কাছি দড়ির রকমসকম ও বহন ক্ষমতা আমরা সহজেই বুঝতে পারি। উপায় নেই। এভাবে না গিয়ে। এ পারটা তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়ে গেছে। বাকি রয়েছে ওপারটা। শাঙ্কো সিনাত্রা ওপারে আছে। আমরাও পর পর কাছি তে ঝুল ঝুল করে ওপারে যাব। তুমি পারবে না। তুমি কাউকে নিয়ে নৌকায় চড়ে ওপারে যাও। কাজে নেমে পড়ো। কিন্তু সবাই পার হ’ল না হয়–ফ্রান্সিস বলে উঠল–হ্যারি–এখনও শেষ রহস্যের সমাধানটা বাকি। ইবু সালোমন নিশ্চয়ই কোন না কোন ব্যবস্থা রেখেছিল যাতে প্রয়োজন হলে স্বর্ণভাণ্ডার ভরা সিন্দুকটা তুলে আনা যায় সহজে। সেই সুত্রটাই খুঁজে বের করতে হবে। কথাটা শেষ করেই ফ্রান্সিস গাছটায় উঠতে শুরু করল। কাটা গাছটার কাছে উঠে ঝোলানো কাছিটা ধরে দু’তিনবার খুব জোরে হ্যাঁচকা টান দিল। বুঝল কাছিটা বেশ শক্ত করেই বাঁধা হয়েছে। এবার দুলতে-থাকা কাছিটা ধরে– ফ্রান্সিস ঝুলে পড়ল। নিপুণভাবে হাত দুটো পর পর ছেড়ে ধরে দুলতে দুলতে ওপারে দিকে চলল। ঘূর্ণির ওপরটায় আসতেই বুঝল নিচ থেকে যেন একটা হাওয়া ওপরের ও দিকে উঠে আসছে। ফ্রান্সিস কাছিটা শক্ত হাতে ধরে জায়গাটা আস্তে আস্তে সাবধানে পার হল। বেশ হাঁপানো গলায় চিৎকার করে বলল-ঘূর্ণির ঠিক ওপর দিয়ে সাবধানে পার হবে। এখানকার পাক-খাওয়া হাওয়াটা বিপজ্জনক।
