বেশ। খবর দেওয়া যাবে। তবে তুমি বড্ড বেশি এগিয়ে ভাবছো। ঐ স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধারের জন্যে মাননীয় শাসক ইবু গ্যাব্রিয়েল কম চেষ্টা করেন নি।
–দেখা যাক। আমরা যে বেশি বুদ্ধিমান সেই প্রমাণ করতে পারি কি না। ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
ফ্রান্সিসরা রাতের খাওয়া ঐ ডেক এ মশালের আলোয় বসে খেয়ে নিল।
–চলো সব। দেরি করবো না। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়িয়ে বলল।
কাছি দড়ি জোগাড় করে নৌকোয় উঠতে উঠতে একটু দেরিই হল। ফ্রান্সিসরা দেখল ইবু গ্যাব্রিয়েল জাহাজের দিক থেকে বেশ একটা শক্তপোক্ত নৌকোয় চড়ে চারজন বলশালী সশস্ত্র যোদ্ধাকে নিয়ে রব্বানি আসছে। রব্বানিদের নৌকো ওদের নৌকোর পিছনে পিছনে এসে দাঁড়াল।
–নৌকো ছাড়া। ফ্রান্সিসের হুকুম শোনা গেল সব নৌকো পরপর যাত্রা শুরু করল। অস্পষ্ট স্রোতের মধ্যে দিয়ে নৌকোগুলি চলল নদীর ওপর দিয়ে ভেসে।
–জোয়ারের টান এসেছে। শাঙ্কো দাঁড় বাইতে বাইতে গলা চড়িয়ে বলল।
–তবু-দাঁড় বাওয়া বন্ধ করল না। ভোর ইরেকাবা গ্রামে পৌঁছতেই হবে। ফ্রান্সিসও গলা চড়িয়ে বলল। কাছি দড়ি বোঝাই নৌকোয় শুধু সিনাত্রা একা দাঁড় বাইতে লাগল।
সারা নদীপথে ফ্রান্সিসরা কেউ প্রায় কোন কথা বলল না। হ্যারি ভেবে চলল ফ্রান্সিস কি সত্যিই স্বর্ণভাণ্ডার হদিশ বের করতে পারবে? ফ্রান্সিস নদীর জলধারার দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে রইল। হ্যারি একবার ভাবল ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু চিন্তান্বিত ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো কথা বলল না।
এক সময় ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল। যদি নৌকোর মধ্যে ঘুমুতে চাও ঘুমিয়ে নাও। কালকে অনেক কাজ করতে হবে। হ্যারি আর দুই বন্ধু নৌকার মধ্যে গুটিসুটি মেরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। নৌকোগুলো বেশ দ্রুতই চলল। রব্বানির নৌকোটা ফ্রান্সিসদের শেষ নৌকোটার সঙ্গে বাঁধা ছিল। ওদের তো আর কোন তাড়া নেই। চিন্তাও নেই। শুধু নিরস্ত্র ফ্রান্সিসদের ওপর নজর রাখা। কেউ পালাতে গেলে তরোয়াল চালিয়ে হত্যা করা।
তখন ভোর হয় হয়। চারটে নৌকোই ইরেকাবা গ্রামের নদীতীরে বাঁধা হল। নামল সবাই। গ্রামের লোকেরা আর সবাই ঘুম ভেঙ্গে উঠেছে। সবার আগে হ্যারি সেই বৃদ্ধের বাড়ীতে এল। দরজায় ধাক্কা দিতে বৃদ্ধ বেরিয়ে এল।
–শুনুন আমরা আমাদের জাহাজ থেকে দড়ি কাছি এসব দরকারি জিনিস আনতে গিয়েছিলাম এই মাত্র এসেছি আমাদের সময় কম। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের জন্যে যাহোক কিছু খাবার তৈরি করতে বলুন। সঙ্গে আমাদের আরো। কয়েকজন এসেছে। সকলের জন্যে অন্তত দুটি করে রুটি আর মাছের ঝোল ব্যবস্থা। করুন। শাঙ্কো তখনই এসে হ্যারির পাশে দাঁড়াল। শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে হ্যারি বলল শাঙ্কো তোমার পট্টি থেকে চারটে সোনার চাকতি বের করে দিও।
–এই দামটা রাখুন আরও দরকার পড়লে দেব। কিন্তু রান্নাটা তাড়াতাড়ি হতে হবে। আমাদের দুই বন্ধু আশপাশের সাহায্য করবে। বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বলল–না না। আপনারা আমাদের অতিথি। আপনাদের রান্নার কাজ করতে দিলে গ্রামের অমঙ্গ ল হবে। আপনারা নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করুন। গ্রামের মহিলাদের মধ্যে ভালো রাঁধুনি এসে আপনাদের খাবার তৈরি করে দিচ্ছে।
হ্যারি ফিরে এসে ফ্রান্সিসকে সব বলল। তারপর বলল–কাল সারা রাত কারো তেমন ঘুম হয়নি। এই অবস্থায়–
উপায় নেই হ্যারি। সব কাজ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সারতে হবে। ঐ নরপশুর উপর আমার বিন্দু মাত্র বিশ্বাস নেই। যত তাড়াতাড়ি স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধার করে ওর জাহাজে পাঠিয়ে মুক্তি নিতে হবে। বেশি দেরি হলে ইবু গ্যাব্রিয়েল বিগড়ে যেতে পারে। ঐ লোকটা কাউকে বিশ্বাস করে না। নিজেকেও না।
–বেশ। তাহলে খাওয়া সেরেই যাত্রা শুরু করবো। হ্যারি মাথা নাড়িয়ে বলল।
বন্ধুরা সিনাত্রার নৌকোয় কাছি দড়ি নিয়ে বৃদ্ধের বাড়ির উঠোনে এসে এখানে ওখানে শুয়ে পড়ল। রব্বানি সঙ্গী সহ একপাশে একটা গাছের ছায়ায় বসল। রব্বানি। তীক্ষ্ণ নজর রাখল ভাইকিংদের দিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃদ্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল–রান্না হয়ে গেছে। আপনারা খেতে বসুন। সবাই একপাশে জড়ো করা শুকনো পাতা নিয়ে উঠোনে বসে গেল। হ্যারি রব্বানির কাছে এসে বলল–আপনারাও খেতে চলুন।
–এই লোনা উঠোনে? রব্বানি বেশ অবাক হয়ে বলল।
–কী করা যাবে। এদের ঘরের জায়গা খুবই কম। আসুন। হ্যারি বলল।
সকলেরই খাওয়া শেষ হল। ফ্রান্সিসের কণ্ঠ উচ্চস্বরে শোনা গেল।
–বিশ্রাম টিশ্রাম হবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঐ ঘূর্ণির কাছে যেতে হবে। চলো সব।
ভাইকিংরা একে একে নৌকাতে উঠল। রব্বানি তখনও ভেবে পাচ্ছে না–এরা কাছি দড়ি নিয়ে কোথায় যাচ্ছে? মরুক গে। দেখাই যাক না ওদের কাজ তো ভাইকিংদের উপর কড়া নজর রাখা যাতে কেউ পালাতে না পারে। রব্বানিও ওদের নৌকোয় উঠল। নৌকোয় বাঁধা দড়ি। কাজেই রব্বানিদের নৌকো চালাতে হচ্ছিল না। ফ্রান্সিস ভালো করেই বুঝল রব্বানিরা বিশ্রামের সুযোগ নিচ্ছে। কিন্তু ফ্রান্সিস এই চিন্তাটাকে আমল দিল না। একসময় রব্বানি গলা চড়িয়ে বলল-কেউ চালাকি করতে যাবে না। করতে গেলে খতম হয়ে যাবে। ভাইকিংরা চুপ করে রইল।
যে ঘাটে নেমে ওরা তীর ভূমির পাথর ছড়ানো পাথুরে জমি ঝোঁপ জঙ্গল গাছপালার মধ্যেই দিয়ে আগে গিয়েছিল নৌকো থেকে নেমে সবাই চলল। রব্বানিরা সব পিছনে পিছনে চলল।
