–আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে। চুকো পেছনে ফিরে হোটেলের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। ফ্রান্সিস ছুটে গিয়ে ওকে ধরলো। বললো–চলল আমাদের জাহাজে। তোমাকে আজ পেট পুরে খাওয়াবো।
চুকো ফিরে দাঁড়াল বেশ চলো।
ফ্রান্সিস আর ওকে কোন প্রশ্ন করলো না। একে পেট খিদেয় জ্বলছে, তার ওপর ঐ লোকগুলোর মার খেয়েছে। ও যে এখনো মাটিতে শুয়ে পড়েনি, এটাই আশ্চর্য। ও চুকোকে জাহাজে নিয়ে নিজের কেবিন ঘরে নিয়ে এলো। ভাইকিংরা যারা চুকোকে দেখলো, তারা বেশ অবাক হ’ল। ফ্রান্সিস আবার হাড়-হাভাতেটাকে কোত্থেকে ধরে নিয়ে এল? চুকোকে বসিয়ে ফ্রান্সিস ছুটলো হ্যারিকে ডাকতে। হন্তদন্ত হয়ে ওকে কেবিনঘরে ঢুকতে দেখে হ্যারি বেশ অবাক হ’ল। বললো–কি হয়েছে?
–সে পরে বলবো, তুমি এখন শীগগির আমার ঘরে এসো। হ্যারি উঠে দাঁড়ালো। নিজের কেবিনঘরের দিকে যেতে-যেতে ফ্রান্সিস বললো চুকো নামে একটা লোককে আমার ঘরে বসিয়ে রেখেছি। তুমি একথা সেকথা বলে নানা গল্প ফেঁদে ওকে আটকে রাখবে। সাবধান যেন ও পালাতে না পারে।
নিজের কেবিনঘরে ঢুকে চুকোকে দেখিয়ে ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি, এর নাম চুকো। জাহাজে-জাহাজে বহু জায়গায় ঘুরেছে। এবার চুকোর দিকে তাকিয়ে বলল–চুকো, এ হ’ল হ্যারি, আমার প্রাণের বন্ধু। দু’জনে গল্প-টল্প কর।
–আমার খিদে পেয়েছে। চুকো ভাঙাগলায় বলল।
–আমি এক্ষুণি খাবার নিয়ে আসছি। ফ্রান্সিস দ্রুত বেরিয়ে গেল। রসুইঘরে ঢুকে মাংস, রুটি যা হাতের কাছে পেলো থালায় তুলে নিল। ফিরে এসে দেখলো চুকো আর হ্যারি দু’জনেই চুপ করে বসে আছে। হ্যারি দু’হাত ছড়িয়ে হতাশার ভঙ্গী করলো। তার মানে চুকো এতক্ষণ একটি কথাও বলে নি। ফ্রান্সিস বুঝলো–সত্যিই ওর খিদে পেয়েছে। খাবারের থালা টেবিলের ওপর রেখে বললো–চুকো–খেয়ে নাও। চুকো যেন খাবারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। মিনিট দশ-পনেরো একনাগাড়ে খেয়ে গেল। একটা কথাও বললো না। খেতে-খেতে জল তেষ্টা পেয়েছে। কিন্তু সেটা বলতে গিয়ে মুখ দিয়ে শব্দ বেরুলো না। খাবারে গলা আটকে গেছে। হাতের ইশারায় জল দিতে বললো। ফ্রান্সিস তৈরিই ছিলো। তাড়াতাড়ি গ্লাসে জল নিয়ে এল। এক চুমুকে সবটা জল খেয়ে নিয়ে চুকো ঢেকুর তুলল। তারপর আস্তে-আস্তে খেতে লাগলো। ফ্রান্সিস একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল–চুকো–এই জাহাজে থাকবে?
–হুঁ। শব্দ করে চুকো ঘাড় নাড়ল। তারপর বললো–কিন্তু কোন কাজ করতে পারবো না।
ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি বলে উঠলো–তোমাকে কিছুই করতে হবে না।
–তাহলেই থাকা যাবে।
ফ্রান্সিস আর কোন কথা বললো না। চুপ করে চুকোর খাওয়া দেখতে লাগলো। একটুক্ষণের মধ্যেই মাংস রুটি শেষ। চুকো ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বললো–আমার এখনো কিন্তু পেট ভরে নি।
–নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই–ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে ইসারা করে ছুটলো রসুইঘরের দিকে। আর একদফা মাংস-রুটি নিয়ে এল। চুকো আবার নিঃশব্দে খেতে লাগলো। এবার আরো আস্তে-আস্তে, খেতে লাগল। খাওয়া শেষ করে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে হাসলো। ফ্রান্সিসও কৃতার্থের হাসি হাসলো।
হাতমুখ ধুয়ে এসে চুকো বিছানায় চোখ বুজে আধশোয়া হ’ল। ফ্রান্সিস একটু সময় নিল। কি ভাবে কথাটা পাড়বে ভেবে নিলো। তারপর বলল–চুকো–তুমি তো অনেক জায়গায় ঘুরেছো।
চুকো চোখ বন্ধ করেই তর্জনীটা ঘোরাল। তার মানে সমস্ত পৃথিবী।
–তা হলে তো মরিটাস দ্বীপেও গেছো তুমি।
–দু’বার। চোখ বন্ধ করেই চুকো বলতে লাগল একবার দ্বীপে নেমে ছিলাম, অন্যবার আর নামিনি। জাহাজেই ছিলাম।
–চুকো–আমাদের ঐ দ্বীপে নিয়ে যেতে হবে।
–সে অনেক ঝঞ্জাট, দ্বীপটার চারদিকে আধডোবা প্রবালের স্তর। কোমর অবধি জল ঠেলে যেতে হয়। কোথাও গলা অবধি জল।
–জাহাজ থেকে নেমে হেঁটেই যাবো। ফ্রান্সিস বললো। চুকো হাসলো–আগুনের প্রবালে পা রাখলে পা জ্বালা করতে থাকবে, তাছাড়া এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা, অসাবধান হলে পা কেটে দোফালা হয়ে যাবে।
–তবে ওখানকার লোকেরা যাতায়াত করে কি করে?
–ভাজিম্বাদের নৌকো দেখেছো, গাছের গুঁড়ি কুঁড়ে কুঁড়ে তৈরি করে।
–হ্যাঁ দেখেছি।
–ঐ ডেঙো নৌকোয় চড়ে ঐ জায়গাটা পার হতে হয়।
–কতটা জায়গায় এই প্রবালের স্তর?
–কোথাও এক মাইল, কোথাও দু’মাইল। তারপর দ্বীপের মাটি।
ফ্রান্সিস একটুক্ষণ ভাবলো। তারপর বলল–ওখানে আয়না কিনতে পাওয়া যায়?
–আয়না তৈরিই তো মরিটাস দ্বীপের মানুষদের একমাত্র জীবিকা। ওখানকার বালি খুব মিহি। সোড়া বা পটাশ পাহাড় এলাকায় প্রচুর। তাই দিয়ে খুব ভালো কাঁচ তৈরি হয়। লাল ভার্মিলিয়ন দিয়ে পারদ তৈরি করে তাই দিয়ে নানারকম আয়না বানায় ওরা। দূর-দূর দেশের লোকেরা ওখানে আয়না কিনতেই জাহাজ ভেড়ায়।
ফ্রান্সিস চুকোকে আর কোন কথা জিজ্ঞেস করলো না! জিজ্ঞেস করলেও চুকো আর কথা বলতো না। কারণ ও ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে।
জাহাজ এবার চললো দক্ষিণমুখো। ফ্রান্সিস ভেবে দেখলো চাঁদের দ্বীপ হয়েই কি ওদের যেতে হবে। চাঁদের দ্বীপ থেকে ভাজিম্বাদের গুঁড়ি কাটা নৌকা নিতে হবে,
যে কটা পাওয়া যায়। কথাটা ও হ্যারিকে বললো, ঐ নৌকো জোগাড় না করে যাওয়া অর্থহীন। প্রবালের স্তর না পেরোতে পারলে ঐ দ্বীপেও যাওয়া যাবে না।
–বুঝলে হ্যারি–ফ্রান্সিস বলল–মাহাবো সঠিক জানতো না, ওর বাবা সেই রাজপুরোহিত কিভাবে আয়না আনতো। আমার মনে হয়, ঐ রাজপুরোহিত ভাজিম্বাদের ডোঙা নৌকা চড়েই মরিটাস দ্বীপে যেত। বসির আয়নাওলাকে দিয়ে আয়না তৈরি করিয়ে ঐ ডোঙায় চড়েই ফিরে আসত। এটা ঐ রাজপুরোহিত খুব গোপনে করত।
