কেউ কোন কথা বলছিল না। ফ্রান্সিস অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবল। একটাই সমস্যা। আবু গ্যাব্রিয়েল নিজে ঐ জাহাজে আছে কিনা। শাঙ্কো বলতে পারেনি।
কারণ ও তরোয়াল হাতে কয়েকজন মূর যোদ্ধাকেই দেখেছে শুধু। ইবু গ্যাব্রিয়েল থাকলে যে তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিতে পারবো। দলপতি সেটা পারলেও কোন সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাবে। ওরা ইবু গ্যাব্রিয়েলকে যমের মতো ভয় করে। এটাই স্বাভাবিক।
সন্ধ্যের কাছাকাছি সময়ে ফ্রান্সিসদের নৌকোদুটো নদীর মূখের কাছাকাছি এল। শেষ বিকেলের ম্লান আলোয় দেখা গেল দুটো জাহাজই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস আশান্বিত হল নিশ্চয়ই ইবু গ্যাব্রিয়েল এসেছে সরেজমিনে সব দেখতে।
জাহাজ দুটোর কাছাকাছি আসতে ফ্রান্সিসরা দেখল খোলা তরোয়াল হাতে বেশ কয়েকজন যোদ্ধা জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ওদের দেখছে। সিনাত্রা হ্যারির কাছে এসে বলল–ওরা তো আমাদের মেরে ফেলবে।
–এখনই ঠিক বলতে পারছি না। তবে ফ্রান্সিস খুব ভেবেচিন্তে পা ফেলে। কাজেই প্রাণের ভয় নেই। হ্যারি বলল।
নৌকো দুটো জাহাজের গায়ে এসে লাগল। ফ্রান্সিস নৌকোয় উঠে দাঁড়িয়ে দুহাত তুলে গলা তুলে বলল–ভাই, আমরা নিরস্ত্র। আমরা লড়াই করতে আসিনি একথা আগেই বলেছি। আমরা বন্ধুদের খোঁজ নিতে এসেছি। তখন যোদ্ধাদের মধ্যে একজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে আস্তে আস্তে, পা ফেলে এগিয়ে এল। বেশ গর্বোদ্ধত ভঙ্গি অন্য যোদ্ধাদের মতো পোশাক হলেও মাথায় একটা কালো কাপড়ের পাগড়ির মতো। তরোয়ালের বাঁটে সোনারূপোর কাজ করা। বেশ বলশালী চেহারা। গলায় বুটিমতো সোনার হার ঝুলছে। ফ্রান্সিসদের বুঝতে অসুবিধে হল না এই লোকটিই দলপতি। কাছে আসতে বলল। গায়ের আটোসাটো কালো পোশাকটা দামি কাপড়ের। হয় তো এই যোদ্ধার হাতেই ইবু সালোমানের মৃত্যু হয়েছে। মনে একটা বিতৃষ্ণার ভাব এলেও নিজেকে সংযত করল।
তোমার বন্ধুরা আমাদের জাহাজে বন্দী হয়ে আছে। দলপতি বলল।
কেন?
–তোমরা ইবু সালোমনের কুফির ভাণ্ডার উদ্ধার করে এই জাহজেই আসবে। যাতে তোমরা আমাদের স্বর্ণমুদ্রার সিন্দুক নিয়ে পালাতেনা পার আগাম সেই ব্যবস্থা করে রাখতে। বেশ গম্ভীর গলায় দলপতি বলল।
তাকিয়ে দেখুন আমাদের দুটো নৌকোয় কয়েকটা দাঁড় আর কিছু পোশাক পড়ে আছে।
–ও তাহলে তোমরা সেই সোনার ভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারো নি? দলপতি যেন একটু হতাশ হল।
–তার আগে একটা কথা জানতে চাই বর্তমান শাসক ইবু গ্যাব্রিয়েল কি এই জাহাজে আছেন?
–হ্যাঁ উনি দুপুরের সব ব্যবস্থা দেখতে এসেছেন।
তার সঙ্গে কিছু কথা আছে। ফ্রান্সিস বলল।
আমাকে বলতে পারো। আমি রব্বানি। সেনাপতি।
–না। আমি তার সঙ্গেই কথা বলতে চাই। বোঝা গেল সেনাপতি রব্বানি বেশ মন ক্ষুণ্ণ হল। তবে আর কোন কথা না বলে বলল-দাঁড়াও। ইবু গ্যাব্রিয়েলকে সংবাদ পাঠাচ্ছি। একজন যোদ্ধাকে এসে ইঙ্গিত করল যোদ্ধাটি দ্রুত চলে গেল।
একটু পরে ইবু গ্যাব্রিয়েল সিঁড়িঘর দিয়ে ডেক-এ উঠে এল। জেনারেল পোষাক পরনে। মাথায় পাগড়ির সামনে একটা বড় মুক্তো বসানো। বলল–
–তোমরা তো ভাইকিং? বেশ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল।
–হ্যাঁ ফ্রান্সিস মাথা ওঠানামা করল।
–তোমাদের দলনেতা কে? ইবু গ্যাব্রিয়েল জিজ্ঞেস করল।
–আমি। ফ্রান্সিস বলল–আমার নাম ফ্রান্সিস।
–হুঁ। আমি সব খবর রাখি। আলফানসোকে তোমরা আশ্রয় দিয়েছে। লোকটা আমার হাত ফসকে পালিয়েছিল। যাকগে–আমাদের পৈতৃক সম্পদ-সিন্দুক ভর্তি কুফি তোমরা উদ্ধার করতে পেরেছো! বেশ সাগ্রহে ইবু গ্যাব্রিয়েল বলল।
না। তবে অনুমান করছি। সেই অনুমান কতটা সত্যি তা এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। ফ্রান্সিস বলল।
-বলো কি? ইবু গ্যাব্রিয়েল প্রায় লাফিয়ে উঠল। এইবার ভুরু কুঁচকে ফ্রান্সিসের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ পিট পিট করতে করতে বলতে লাগল-এই নিখোঁজ সোনার মুদ্রাভর্তি সিন্দুক্টা একমাত্র আমিই দেখেছিলাম। আর আলফানসো বুড়োটা হয়তো দেখেছে। তুমি বুড়োটার সুযোগ বুঝে পালিয়েছে। ইবু গ্যাব্রিয়েলের চোখ পিটপিটানি দেখে ফ্রান্সিস বুঝল নোকটা শুধু নরপশুই নয় ধুর্ত। সাবধানে কথা বলতে হবে।
কিন্তু অনুমানটা করলেন কি করে? ইবু গ্যাব্রিয়েল জানতে চাইল।
ইবু সালোমান একজন সত্যিকারের কবি ছিলেন তবে একইসঙ্গে বুদ্ধিমানও ছিলেন। নইলে আরবীর বণিকদের সঙ্গে ব্যবসা করে অত ধনসম্পদ বাঁচাতে পারতেন না।
–ও সব শুনে লাভ কী। আসল কথা বল। ইবু গ্যাব্রিয়েল তাড়া লাগাল।
–তাঁর শেষ কবিতা থেকে। ফ্রান্সিস বলল।
–ও। ওটা তো পাগলের প্রলাপ। ইবু গ্যাব্রিয়েল দেঁতো হাসি বলল।
–না। ওটা গিজেল না বেশ ভেবেচিন্তে লেখা। কবিতা।
–কিন্তু আমি ঐ কবিতা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলেছি।
–কবিতাটা আলফানসোর মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। ফ্রান্সিস বলল।
–ও। বৃদ্ধটা তো আভাসেও একথা বলেনি।
–কারণ উনি একটা মর্মন্তুদ ঘটনা আন্দাজ করে ঐ কবিতাটা দু এক পংক্তি মনে করতেই তাঁর চোখে জল আসতো অর্থটা আর ভাবতে পারেন নি। আমরা সেই অর্থটা বুঝতে পেরেছি। তার সাহায্যেই এগিয়েছি। তবে এখনও নিশ্চিন্তই কবিতার মধ্যে দিয়ে ইবু সালোমান যা বলতে চেয়ে ছিলেন তার সত্যতা এখনও যাচাই করতে পারিনি। ফ্রান্সিস বলল।
