–শাঙ্কো-বিনোলা কোথায়? ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল। শাঙ্কো হাতের চেটোতুলে। ইঙ্গিত করল–পরে বলবে। ফ্রান্সিস আর কোন কথা জিজ্ঞেস করল না। তখনই বন্ধুটি শাঙ্কোর জন্য শুকনো পোশাক নিয়ে এল। সবাই মিলে শাঙ্কোকেদাঁড় করাল। তারপর ভিজে পোশাক খুলে শুকনো পোশাক আস্তে আস্তে পরিয়ে দিল। শুকনো পোশাক পরে শাঙ্কোর শরীর যেন সাড় এল।
হেঁটে যেতে পারবে? হ্যারি জানতে চাইল। শাঙ্কো মাথা কাত করল। দুতিন জন শাঙ্কোকে ধরে ধরে বাড়ির উঠোনে নিয়ে এল। যে মোটা কাপড় পেতে ওরা কয়েক জন রাতে শুয়ে ছিল সেখানে শাঙ্কোকে আস্তে করে শুইয়ে দিল।
–সিনাত্রা দেখে তো কারো বাড়িতে দুধ পাও কি না ফ্রান্সিস বলল, সিনাত্রা চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বড় গ্লাসে করে দুধ নিয়ে এলো। গ্লাসটা হাতে নিয়ে ফ্রান্সিস বুঝল বেশ গরম দুধ। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর মাথা তুলে ধরল। হ্যারি আস্তে আস্তে শাঙ্কোকে দুধ টুকু খাইয়ে দিল।
ছাগলের দুধ। সিনাত্রা বলল।
–গরম হলেই হল। ফ্রান্সিস বলল। অল্পক্ষণের মধ্যেই এত ক্ষণ ভিজে পোশাকে– থাকা শাঙ্কো শরীরের উষ্ণতা অনুভব করল। ও আস্তে আস্তে উঠে বসল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি ওর পাশে বসল।
–এখন ভালো লাগছে তো? হ্যারি বলল।
শাঙ্কো মাথা কাত করে দুর্বল স্বরে বলল। হ্যাঁ।
শাঙ্কো আমার মনের আশঙ্কা যাচ্ছে না জাহাজের সবাই ভালো আছে তো? ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল।
মনে হয় ভালো আছে। তবে সবাই বন্দী হয়ে আছে জাহাজে। রাজকুমারী শরীর খারাপ হয়ে গেছে। তবে অসুস্থ নয়। তারপর শাঙ্কো থেমে থেমে আস্তে আস্তে সব ঘটনা খুলে বলল। ফ্রান্সিস হ্যারি দুজনেই চুপ চাপ রইল। ততক্ষণে বন্ধুরাও এসে ওদের ঘিরে দাঁড়িয়েছে। সব শুনে ফ্রান্সিস বলল–এখন সবই পরিষ্কার বুঝতে পারছি ইবু গ্যাব্রিওল জাহাজ ভর্তি যোদ্ধা নিয়ে আমাদের হন্য হয়ে খুঁজে বেরিয়েছে। উদ্দেশ্য ইবু সালোমনের স্বর্ণভাণ্ডারের উদ্ধারের জন্যে আমরা চেষ্টা করছি কিনা। ও ভালো করেই জানে ঐ স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধার করার বুদ্ধি ওর নেই। ওর বন্ধুদেরও নেই। খুব ধুরন্ধর তো ঠিক আন্দাজ করেছে আলফানসো আমাদের জাহাজেই আশ্রয় নিয়েছে আর আমরা স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধার করতে নেমেছি। আমরা সেই স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারলে নিশ্চয়ই সেটা নিয়ে জাহাজে ফিরবো। তাই ও বুদ্ধি খাটিয়ে জাহাজ দখল করে বন্ধুদের বন্দী করছে। অপেক্ষা করছে কখন আমরা আসব তার জন্যই।
–তাহলে এখন কী করবে? হ্যারি জানতে চাইল।
বন্ধুদের আগে মুক্ত করবো। ফ্রান্সিস ভাবতে ভাবতে বলল।
–তাহলে তো আমাদের জাহাজে ফিরে যেতে হবে। আর একেবারে নিরস্ত্র অবস্থায়। ঐ দুর্ধর্ষ মুর যোদ্ধাদের সঙ্গে তো লড়াইয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। হ্যারি বলল।
-হ্যারি কব্জির জোরের চেয়ে বুদ্ধির জোর বেশি। আজকের দিনটা থাক। শাঙ্কোর যা অবস্থা। একদিন বিশ্রাম পেলে শাঙ্কো অনেকটা সুস্থ হবে। ওকে এই অবস্থায় সাথে নেওয়া যাবে না। আবার ওকে এখানে একা রেখেও যাওয়া যাবে না। একটা দিন তো হাতে আছে। ঠিক একটা ছক কষতে পারবো।
–কিন্তু ইবু গ্যাব্রিয়েল শুধু ধুরন্দর নয় ভীষণ হিংস্র প্রকৃতির। নিজের অমন, নিরীহ পিতাকে যেভাবে নিঃশব্দে হত্যা করেছে। ফ্রান্সিস হাত তুলে হ্যারিকে থামিয়ে দিয়ে বলল–অনেক দোর্দণ্ডপ্রতাপ মানুষেরই কোন না কোন দুর্বলতা থাকে। ইবু গ্যাব্রিয়েল সম্পদ পিশাচ। এটাই ওর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সেই ফাঁদেই ওকে ফেলতে হবে।
–তাহলে তো সেই স্বর্ণসম্পদ উদ্ধার করতে পারলে
হ্যাঁ। ওকেই দিয়ে দেব। হাজার হোক ও তো ইবু সালোমানের পুত্র। পিতার সম্পদের অধিকারী তো ইবু গ্যাব্রিয়েলই। প্রচুর ধনসম্পদ সংগ্রহ করবো ধনী হবো সেই উদ্দেশ্য নিয়ে তো আমরা গুপ্তধনভাণ্ডার উদ্ধার করি না। ফ্রান্সিস বলল।
–তা ঠিক। কিন্তু ওর মতো নরপশুকে কি বিশ্বাস করা যায়?
–ভাবতে হবে। একটা পুরো দিন তো পাচ্ছি। দেখি সবদিক ভেবে। কথাটা বলে ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি তুমি এই বৃদ্ধকে বল–তাড়াতাড়ি যা হোক বেঁধে দিতে। শাঙ্কোকে সুস্থ করাই এখন আমার প্রাথমিক কাজ। শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল শাঙ্কো–এখন শুয়ে বিশ্রাম কর রান্না হলেই পেট পুরে খাবে। সারা দুপুর শুয়ে ঘুমিয়ে বিশ্রাম করবে। রাতেও বিশ্রাম ঘুম হলে কাল সকালেই তুমি সুস্থ বোধ করবে। আর কথা নয়। এবার বিশ্রাম কর। ফ্রান্সিস উঠে এল। শাঙ্কোর জন্য রান্না হল কি না সেই খোঁজে চলল। বন্ধুরা কয়েকজন এসে শাঙ্কোর কাছে বসল। শাঙ্কো মৃদুস্বরে ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে লাগল। কিন্তু মাঝে মাঝেই উন্মানা হয়ে যেতে লাগল। রাজকুমারী ও বন্ধুরা বন্দী হয়ে আছে। এই কথা ভেবে। ফ্রান্সিস কী ভাবে ওদের মুক্ত করবে সেই চিন্তাই করছে।
অল্পক্ষণের মধ্যেই শাঙ্কোকে বাসি পাঁচ-ছটা রুটি গরম করে সঙ্গে বেশ কয়েকটা মাছের ঝোল দেওয়া হল। শাঙ্কো খেতে লাগল।
রাতে খাওয়ার সময় হ্যারি বলল–তাহলে কখন যাব আমরা?
–দুপুরে তাড়াতাড়ি খেয়েই বেরিয়ে পড়বো ফ্রান্সিস বলল।
দুপুরের খাওয়া ফ্রান্সিসরা তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল। শুধু রুটি আর মাছের ঝোল। অন্য কোন পদ নয়।
পেট পুরে খাও। রুটি খাওয়া নাও জুটতে পারে। ফ্রান্সিস যেমন বরাবর বলে তাই গলা বাড়িয়ে বলল। পরদিন বিশ্রাম করে ঘুমিয়ে শাঙ্কো আবার গায়ে জোর পেল। তারপর তৈরি হয়ে নদীর ধারে চলে এল। দুটো নৌকোয় উঠল সবাই। নদীর জলের ভাটার টানে নৌকো ছেড়ে দিল।
