ওদের জাহাজের কাছে এসে দেখল জাহাজের সব আলো নেভানো এমনকি সিঁড়ির ঘরের আলোও। শাঙ্কোর কেমন খটকা লাগলো। ওরা সাধারণত রাতে সিঁড়িঘরের আলোটা জ্বেলে রাখে যাতে জাহাজে রাতের অন্ধকারে জলদস্যুরা জাহাজে উঠলে দেখা যায়। কয়েকজন বন্ধু জাহাজের উপর ঘুমোয়। ওদের তো ডাকতে হয়। শাঙ্কোরা আসবে এটা তো ওরা জানে না। জাহাজের গায়ের কাছে এসে শাঙ্কো হাতের চেটো গোল করে চেঁচিয়ে ডাকল–ভাইসব একটু সজাগ থাকো। এভাবে মড়ার মতো ঘুমিও না। কিন্তু কারও কোন সাড়া পেল না। অবাক কাণ্ড! কেউ কি তাহলে উপরে শোয়নি। যাক গে জাহাজে উঠে দেখা যাবে। নৌকো দুটো জাহাজের গায়ে লাগল। দড়ির মইটা নামানো নেই। অবশ্য বন্ধুদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। ওরা যে এত তাড়াতাড়ি মাত্র দুজন আসবে এটা তো ওদের জানা নেই। হালের কাছে গোটানো দড়ি ধরে ধরে শাঙ্কো জাহাজের অন্য পাশে চলে এলো। তখনই অস্পষ্ট ছায়ার মতো দেখল নদীর মুখের ওপাশে একটা জাহাজ দেখল। চলন্ত জাহাজ নয়। নোঙ্গর করা জাহাজ। শাঙ্কো দড়ি ধরে উঠতে উঠতে ভাবল–এই জাহাজেটা বোধ হয় ওদের পর এখানে এসেছে। কিন্তু জাহাজে চড়ে এখানে কারা এল? যাক গে দুজনে পরপর অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় জাহাজের উপর উঠে এল। সামনে তাকিয়েই? শাঙ্কো দেখল-রাজকুমারী চুপ করে সিঁড়িঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শাঙ্কো রাজকুমারীর দিকে যেতে যেতে বলল–রাত জাগবেন না। যান ঘুমিয়ে পড়ুন। ফ্রান্সিসরা সবাই সুস্থ। ভালো আছে। রাজকুমারীর কাছে এসে শাঙ্কো সেই স্বল্প আলোয় দেখল-রাজকুমারী কেমন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখমুখ শুকনো। মাথার চুল এলোমেলো। কেমন রোগার্তা রাজকুমারী–আপনার শরীর ভালো আছে তো? আপনি অসুস্থ শুনলে ফ্রান্সিস কিন্তু কথটা শাঙ্কো শেষ করতে পারল না। দেখল সিঁড়ি দিয়ে দুতিনজন মূর যোদ্ধা খোলা তরোয়াল হাতে দ্রুত উঠে এল। বিদ্যুৎ চমকের মতো ওর মনে পড়ল একটা জাহাজ ও আগে দেখে এসেছে। তাহলে মুর যোদ্ধারা ওদের জাহাজ দখল করেছে। রাজকুমারীসহ সবাই তাহলে বন্দী। শাঙ্কো ত্বড়িৎ গতিতে রেলিঙ্গের দিকে ছুটতে ছুটতে চেঁচিয়ে বললো–বিনোলা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ো। পালাও। কথাটা বলতে বলতেই শাঙ্কো লাফ দিয়ে রেলিঙ টপকে সমুদ্রের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপরেই একটু ডুবে ওদের একটা নৌকার কাছে ভেসে উঠল। ভেজা শরীর নিয়ে এক ঝটকায় একটা নৌকায় উঠে পড়েই এক হাঁচকা টানে দড়িটা ছিঁড়ে নৌকাটা নিয়েই দাঁড় তুলে বাইতে লাগল। জোরে দাঁড় বেয়ে অনেকটা দূরে চলে এল। মাথা তুলে এক নজর দেখল–রেলিঙ ধরে মূর যোদ্ধারা তাকিয়ে আছে। শাঙ্কো জোরে শ্বাস ফেলল। একটু হাঁপাতে হাঁপাতে প্রাণপণ দাঁড় বাইতে লাগল। জোয়ার তখন শুরু হয়ে গেছে। বেশ কষ্ট করেই নৌকাবাইতে লাগল। জোয়ারের টান বাড়ল। নৌকো দ্রুত চলল।
ততক্ষণে মুর যোদ্ধারা বিনোলাকে ধরে সিঁড়িঘরের দিকে নিয়ে চলেছে। রাজকুমারী দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল। তারপর আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। এই বন্দী জীবনে একটাই সান্ত্বনা ফ্রান্সিসরা সকলেই সুস্থ আছে, ভালো আছে। অবশ্য কবে সবাই ফিরবে সেটা আর আতর্কিতে আক্রান্ত শাঙ্কো বলতে পারে নি।
শাঙ্কো দাঁড় বাওয়া একেবারে বন্ধ করতে সাহস পেল না। প্রাণপণে দাঁড় বাইতে লাগল। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল খুব অস্পষ্ট ওদের জাহাজটা তখন বেশ দূরে। চাঁদের আবছা আলো চারদিকে। আস্তে আস্তে জোয়ারের টান আরও বাড়ল। সেই টানে নৌকো বেশ তাড়াতাড়িই ভেসে চলল। এতক্ষণে শাঙ্কো বুঝতে পারল ও কতটা ক্লান্ত। একটু আস্তে আস্তে দাঁড় বাইতে লাগল। নদীর জলে চাঁদের নিস্তেজ আলো পড়েছে। নদীর দুপাশে এবার কালো কালো গাছগাছালি শুরু হল। আস্তে আস্তে চারদিক একবারে অন্ধকার হয়ে গেল। শাঙ্কো আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল কালচে মেঘ জমেছে আকাশে। হঠাৎই জলে ছড় ছড় শব্দ তুলে বৃষ্টি নামল। কেমন ধূসর হয়ে গেল আকাশটা। ঝাপসা হয়ে গেল চারদিক। এক তো সমুদ্রের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে গায়ের পোশাক ভিজে গিয়েছিল এখন বৃষ্টির জলে পোশাক সপসপে হয়ে গেল। মেঘ উড়ে গিয়ে বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশ সাদাটে হয়ে গেল। বোঝা গেল ভোর হতে দেরি নেই।
তখন সবে সূর্য উঠেছে। চারিদিক ভোরের রোদ ছড়িয়ে পড়ল। দূরে ইরেকাস গ্রামের ঘাট দেখা গেল। শাঙ্কো আস্তে আস্তে ঘাটে নৌকো দুটো ভেড়াল। নৌকো চালিয়ে এত দূরে যাওয়া আসা। শাঙ্কো ক্লান্তিতে অবসাদে তখন প্রায় নড়তেই পারছে না। ঘাটে বন্ধুরা কেউ দাঁড়িয়ে নেই। শাঙ্কো শরীরের সমস্ত জোর এক করে প্রাণপণে ডাকল–ফ্রান্সিস। কিন্তু সেই ডাক খুবই মৃদু শোনাল। শাঙ্কো বুঝল তীরে উঠে না ডাকলে কেউ শুনতে পাবে না। ও ওঠার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না গা ছেড়ে দিয়ে নৌকায় জমা বৃষ্টির জলের মধ্যে চোখ বুজে পড়ে রইল। নৌকটা ভাসতে ভাসতে তীরের কাছে এসেছে তখন। ফ্রান্সিস দুহাতের মধ্যে মাথা গুঁজে বসেছিল। শাঙ্কোরা ফিরবে বলে। কাজেই সারারাত প্রায় জেগেই কেটেছে। শাঙ্কোর ডাক খুব অস্পষ্ট ওর সতর্ক কানে পৌঁছলে ও এক লাফে উঠে দাঁড়িয়েই তীরভূমির দিকে ছুটলো। ফ্রান্সিসকে ছুটতে দেখে হ্যারিও পেছনে পেছনে ছুটল।
তীরের কাছে নৌকো ভাসছে। তখন ফ্রান্সিস জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে নৌকার কাছে এসে ফ্রান্সিস দেখল নৌকোর মধ্যে শাঙ্কো একা অসাড় পড়ে আছে। হাতে দাঁড়টা ধরা আছে। ও তাড়াতাড়ি ছুটে এসে শাঙ্কোকে টেনে তুলল। তখনই হ্যারি আর দুই বন্ধুও এসে হাত লাগাল। ওরা শাঙ্কোর অসাড় দেহটা তুলে এনে পাথুরে শুকনো মাটির উপরে শুইয়ে দিল। এতক্ষণ শাঙ্কো চোখ বুজে ছিল। এবার চোখ মেলে ফ্রান্সিসদের দেখল। ফ্রান্সিস পাশের বন্ধুটিকে বলল–শিগগির শাঙ্কোর জন্যে শুকনো কাপড় নিয়ে এস। বন্ধুটি ছুটে গেল। হ্যারি শাঙ্কোর মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে বলল শাঙ্কো তুমি সুস্থ আছো তো? শাঙ্কো ম্লান হেসে মাথা কাত করল।
