–ফ্রান্সিস, মৃত্যুচিন্তা মনকে দুর্বল করে দেয়। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল।
–হ্যারি, ফ্রান্সিস হেসে বলল–আমার ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা। বেঁচে থাকতে আমাকে উজ্জীবিত করে। মৃত্যু তো অমোঘ সত্য। আমি কক্ষনো ভুলি না–যে কোনো মুহূর্তে আমার মৃত্যু হতে পারে। কাপুরুষের কলঙ্কিত মৃত্যু নয়:-বীরের মৃত্যু।
–এজন্যেই সত্যি বলছি, মাঝে মাঝে আমার বড় ভয় করে। হ্যারি আবার মৃদুস্বরে বলল। তারপর বলল–এই যে তুমি দু’ধারের গাছে কাছি বেঁধে দুরন্ত ঘূর্ণির ঠিক ওপরে কাছি বেয়ে বেয়ে যাবে বলে স্থির করেছ–জান এটা কতবড় মারাত্মক ঝুঁকি!
–সে তো হাত ফসকে ঘূর্ণিতে পড়ে গেলে। শোনো একটা সূত্র পাওয়া বাকি। সেটা পেলে নির্বিঘ্নে ঐ সিন্দুক ঘূর্ণির মধ্যে থেকে তুলে আনতে পারব। ফ্রান্সিস বলল।
–পারবে? নির্বিঘ্নে? জীবনের ঝুঁকি না নিয়ে?
–আলবাৎ পাড়ব। কিন্তু হ্যারি, আমার মন বলছে অত সহজে সিন্দুকটা উদ্ধার করা যাবে না। ফ্রান্সিস বলল।
রাতে উঠোনেই খাওয়ার-দাওয়া চলছে। দুপুরের মতো বৃদ্ধ এদিক ওদিক ঘুরে তদারকি করছে। হ্যারি হেসে বলল– আপনি ঘরে যান। বিশ্রাম করুন। বৃদ্ধ আর : কোনও কথা না বলে চলে গেল।
রাতে আগের মতোই উঠোনে এখান-সেখানে শুয়ে পড়ল সবাই। নদীর দিকে থেকে সারাদিনের গরমের পর ঠান্ডা বাতাস ছুটে আসছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল প্রায় সবাই। শুধু ফ্রান্সিস মাথার পেছনে দুহাতের চেটো রেখে চোখ বুজে শুয়ে আছে। হাতে সময় নেই। শাঙ্কোদের ফিরতে দেরি হয়ে গেলে সমস্যা বাড়বে। সবাইকে নিয়ে ঐ বাঁকে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। সন্ধের অন্ধকারের আগে কতক্ষণ আর সময় পাওয়া যাবে। ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ খুলল। আকাশে জ্যোৎস্নার ঢল নেমেছে যেন। আগণন তারা জ্বলছে। হালকা সাদা মেঘ উড়ছে। আঃ পৃথিবী কী সুন্দর! এই চোখে দেখা আকাশই তো শেষ সীমা নয়। সহপাঠী হ্যারির সঙ্গে এক পাকা দাড়ি-গোঁফওয়ালা বৃদ্ধর পাথরের ঘুপচি ঘরে ওরা জনা দশবারো ছাত্র পড়ত। বৃদ্ধের নাম মনে নেই। মাঝে মাঝে অদ্ভুত কথা বলত বৃদ্ধই। তোমরা যে আকাশটা দেখ সেটা ছাড়িয়ে এই যে শূন্যতা তার কোনও সীমা পরিসীমা নেই। এরকমই কী যেন। ফ্রান্সিস মনে মনে ভাবছিল–হ্যারির ঘুম ভেঙে গেল তখনই। দেখল ফ্রান্সিস আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
–ঠিক জানি। ঘুমোওনি। হ্যারি বিড়বিড় করে বলল। হ্যারি, ছেলেবেলাটা সত্যি বড় সুন্দর তাই না?
–কী এমন নতুন কথাটা বললে আঁ?
–শাঙ্কোরা যে কখন ফিরতে পারবে তাই ভাবছি। ফ্রান্সিস একই চিন্তিত স্বরে বলল।
–ভেবে কী করবে? যখন আসার আসবে। কিন্তু রাত জাগলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে। হ্যারি বলল।
–ও আমার অভ্যেস আছে তা জান। ফ্রান্সিস পাশ ফিরতে ফিরতে বলল।
পরেরদিন সকালে ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল বৃদ্ধকে গিয়ে বলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেন দুজনের মতো খাবার এক্ষুনি বেঁধে দেবার ব্যবস্থা করেন। বেশি কিছু না। শুধু রুটি মাছের ঝোলমতো। হ্যারি সেই বৃদ্ধকে দেখল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যারি কাছে গিয়ে বলল দেখুন বাধ্য হয়ে আপনাকে একটু বিরক্ত করছি। বৃদ্ধ কোমল মুখে হেসে বলল বলুন কী ব্যাপার। রান্না ভালোই হচ্ছে না?
-না, না। এত সুস্বাদু মাছ আমরা কোনদিন খাই নি। আচ্ছা এই মাছগুলোর নাম কী?
–লিতানি। এই নদীতে প্রচুর পাওয়া যায়। বর্ষার সময় তো হাজারে হাজারে মাছ। কাছাকাছি গ্রাম থেকে ব্যবসায়ী আসে। নৌকো ভর্তি করে মাছ কিনে নিয়ে যায়। সেই সব মরশুমে আমাদের আয় যথেষ্ট হয়। বলতে পারেন ঐ আয়ের ওপরেই আমরা বেঁচে আছি।
–শুনে ভাবতে লাগল। এখন যা বলছিলাম আমাদের দুই বন্ধু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গিয়ে আমাদের নোঙ্গর করা জাহাজে যাবে। খুব দরকারি কিছু জিনিস নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। কাজেই এই দুজনের জন্যে–
–বুঝেছি।
-যদি বলেন রান্নার ব্যাপার আমরা সাহায্য করতে পারি।
–সে কি! আপনারা আমাদের অতিথি। আপনাদের নিজেদের রান্না করা খেতে দিলে আমাদের গ্রামের অমঙ্গল হবে। নিশ্চিন্ত থাকুন। বাড়ির মেয়েদের বলছি– অল্পক্ষণের মধ্যেই রান্না করে দিতে।
হ্যারি শাঙ্কোকে গিয়ে তাড়া লাগাল। বলল তোমাদের দুজনের জন্যে যা হোক রেধে দেওয়া হচ্ছে। দেরি না করে খাওয়া শেষ করেই যাত্রা শুরু করবে। আর হ্যাঁ। পেট পুরে খাবে। তোমাদের বেশি খেলে আমাদের খাবার কম পড়ে যাবে কিনা এসব একেবারে ভাববে না। যাও–শুয়ে পড়ে বিশ্রাম যতটা পার করে নাও।
শাঙ্কো বিনোলাকে ডেকে নিয়ে তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া সারল। তারপর তৈরি হয়ে নদীর ধারে চলে এল। দুটো নৌকোয় উঠল দুজনে। নদীর জলের ভাটার টানে নৌকো ছেড়ে দিল। দুপুরের রোদের তেজ কম। এদিক ওদিক আকাশ ছাড়া ছাড়া মেঘ রোদের তেজ চাপা পড়ে গেছে।
নদীর মুখের কাছাকাছি এসেছে আজ শাঙ্কো আর বিনোলা। শাঙ্কো হিসেব করে বুঝল ভাটার টানে বেশ তাড়াতাড়িই এসেছে। পশ্চিমের তারাজ্বলা আকাশে বাঁকা চাঁদ। খুব উজ্জ্বল চাঁদের আলো নেই। এর অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় চারিদিক মোটামুটি দেখে বোঝা যাচ্ছে একপাশে গাছগাছালি অন্য পাশে উঁচুনিচু পাহাড়ি এলাকা।
দূর থেকে শাঙ্কো অস্পষ্ট দেখল ওদের জাহাজটা বাঁদিকের তীরে নোঙ্গর করা হয়েছে। ঢেউয়ের ধাক্কায় আস্তে আস্তে দুলছে। শাঙ্কোদের রাত তো চাঁদের আলো না থাকলে অন্ধকারেই কাটে। কাজেই অন্ধকারে ওরা বেশ আন্দাজে সব বুঝে নেয়। অন্তত জাহাজ বন্দর সহজেই বুঝতে পারে।
