ওদের জোর গলায় ডাকাডাকি শুনে হ্যারি ছুটে এল। খোঁজাখুঁজি রেখে বিনোলাও ছুটে এল। হ্যারি কাছে এলে কাটা কাছিটা দেখিয়ে ফ্রান্সিস বলল–দেখো, আমার অনুমান সত্যি কিনা।
হ্যারি প্রথমে ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। সে চুপ করে ভাবছে তখন ফ্রান্সিস বলল–বুঝিয়ে দিচ্ছি। লক্ষ করো, এখানে ওপারের পাহাড়ি ঢাল অনেকটা নদীর বুকে নেমে এসেছে। তাতে নদীর দুই তীরের দূরত্ব অনেক কমে গেছে। ওপারের ঢালের পরেই মাত্র একটা বিরাট চেস্টানাট গাছ দাঁড়িয়ে আছে।
হ্যারি ওপারের চেস্টনাট গাছের সঙ্গে এপারের এই উঁচু গাছটার দূরত্ব আন্দাজ করে বললহা, দুটো গাছের দূরত্ব অনেক কম।
-ওপারে না গিয়েও আমি বলে দিচ্ছি–ওপারের চেস্টনাট গাছটার দশ পনেরো হাত ওপরের কাণ্ডে ঠিক এমনি একটা মোটা কাছি বাঁধা আছে। সেটাও এ কেটে ফেলা হয়েছে।
তার অর্থ দাঁড়াল-ইবু সালোমনের নির্দেশে তার দুঃসাহসী যোদ্ধারা দু’পারের দুটো গাছে ঐ উচ্চতায় একটা মোটা কাছি শক্ত করে বেঁধেছিল। এবার কল্পনা করো ঐ কাছিটা ঠিক ঘূর্ণির ওপর দিয়ে গেছে কিনা। হ্যারি ঘূর্ণিটার দিকে তাকাল। হিসেবে করল। হ্যাঁ, সত্যিই তাই। কাছিটা টানা হলে ঠিক ঘূর্ণিটার ওপর দিয়েই যাবে। ও বলে উঠল–সাবাস ফ্রান্সিস। এবার সব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। একজন বা দুজন দেহরক্ষী
–দুজন। অত ভারী সিন্দুকটা একজনের পক্ষে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। টানা কাছিটায় একটা মোটা দড়ির ফাঁস পরানো হয়েছিল। সেই ফাঁসে সোনার মুদ্রাভর্তি সিন্দুকের দু’পাশের কড়া দুটোয় দড়ি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তারপর ঝুলিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঐ ঘূর্ণিটার ঠিক ওপরে। দড়ির নানারকম গিঠ বাঁধা ফাস দড়িতে ঝুলিয়ে মালপত্র এ জাহাজ থেকে ঐ জাহাজে নিয়ে যাওয়া এসব রীতিতে আমরা অভ্যস্ত। দেহরক্ষীরা সেটাই করেছিল।
–তারপর ওপর থেকে দড়ি কেটে সিন্দুকটা ঐ ঘূর্ণির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এই তো? হ্যারি বলল।
–ঠিক তাই। এ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনাটা ভেবে নিয়েছি।
–তাহলে তো যে কথাটা আমি আগে বলেছিলাম সেটাই বলি ইবু সালোমন কি ঐ সম্পত্তি চিরদিনের জন্য মানুষের নাগালের বাইরেই রেখে দিতে চেয়েছিলেন? হ্যারি বলল।
–এই জায়গায়টাতেই আসল রহস্য। ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
তোমার কী মনে হয়? হ্যারি জানতে চাইল।
–না। উনি প্রয়োজনের সময় এই গোপনে ফেলে দেওয়া সিন্দুকটা উদ্ধারের উপায় রেখেছিলেন। ফ্রান্সিস বলল। কবিতাটা আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। শেষের দিকের পংক্তি তাদের সেই প্রশান্তির সম্পদ বিলিয়ে দাও। তাহলে তো সহজেই বোঝা যাচ্ছে সেই সম্পদ উদারতা ভালোবাসা বা ওরকম কিছু না–এমন কিছু যা অকাতরে বিলিয়ে দেওয়া যায় অর্থাৎ স্বর্ণ সম্পদ–তাই কিনা? ফ্রান্সিস হেসে বলল।
ফ্রান্সিসের কাঁধে হাত রেখে হ্যারি বলে উঠল–আবার বলছি সাবাস ফ্রান্সিস।
–এখনও কিন্তু সেই সিন্দুক উদ্ধার করতে পারিনি। কথাটা বলে ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব, একটা সূত্র পেয়েছি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটি এখনও খুঁজে পাইনি। আজ আর খোঁজাখুজি নয়। এখন আমরা ঐ ইরেকাস গ্রামে ফিরে যাব। চলো সব।
আবার ইরেকাস গ্রামের দিকে চলা শুরু হল। সেই পাথর-পাথুরে মাটি গাছ ঝোঁপের মধ্যে দিয়ে। দুপুর পেরিয়ে গেল। ফ্রান্সিস একটু চিন্তিত স্বরে বলল–হ্যারি, দুপুরে খাওয়ার কথা কিছু তো বলে যাইনি। হ্যারি হেসে বলল–তুমি যখন নিজের ভাবনা-চিন্তা নিয়ে চুপ করে থাক তখন অন্য দিকগুলো তো আমাকেই ভাবতে হয়। চিন্তা নেই-শাঙ্কোর কাছ থেকে আরো দুটো স্বর্ণমুদ্রা বৃদ্ধকে দিয়ে বলে রেখেছি–আরো দু’একদিন আমরা এখানে থাকব। আপনি আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা রাখবেন। এই জন্যেই হ্যারি, তোমাকে ছাড়া আমার এক মুহূর্তও চলে না। এমনকি–মারিয়াও মাঝে মাঝে আমার মন বোঝে না। স্বাভাবিক রাজকুমারী তো সেদিনের।
–তা ঠিক, হ্যারি, ফ্রান্সিসের কথার উত্তর দিল।
রান্না হয়ে গিয়েছিল। পরিশ্রান্ত ক্ষুধার্ত ভাইকিংরা আর দেরি করল না। নিজেরাই উঠোনের একপাশে জত্ব করে রাখা লম্বাটে শুকনো পাতা নিয়ে এসে খেতে বসে .. গেল। খেতে খেতে পাশে বসা শাঙ্কোকে ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো একটা খুব দরকারি কাজ তোমাকে করতে হবে। একা। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকাল। তুমি কাল দুপুরে খেয়ে একটা নৌকো নিয়ে বেরিয়ে যাবে। জাহাজে উঠে যত লম্বা পাও একটা শক্ত কাছি আর মোটামুটি হাতকুড়ি শক্ত দড়ি নিয়ে আসবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
–এটা এমন কিছু কাজ নয়। সমস্যা হল-এখন ভাটার টান চলছে। নৌকো গুলো নিয়ে যেতে কোনও অসুবিধে নেই। কিন্তু ফেরার সময় জোয়ারের টান না পেলে উজান বেয়ে আসতে বেশ কষ্ট হবে।
–তাহলে একটা নৌকোতে না হয় বিনোলা যাবে। তোমাকে সাহায্য করতে পারবে। ফ্রান্সিস বলল।
ঠিক আছে। কাছিটা পাকিয়ে রাখতে একটা নৌকোর জায়গায় না হয় দুটো নৌকোয় ছড়িয়ে রাখব। আর একটা নৌকো নিয়ে আসব।
–যেমন সুবিধে বুঝবে। তবে ঐ নৌকোটায় আমার নামের আদ্যক্ষর এফ আমি খোদাই করে রেখেছি। ওটা চেপেই ডুবো পাহাড়ের প্রচণ্ড ধাক্কা সামলে সোনার ঘন্টার দ্বীপে গিয়েছিলাম। আমি মারা গেলে ঐ নৌকোটা রাজার যাদুঘরে সোনার, .. ঘন্টাটার পাশে রেখে দিও।
