–তুমি ঠিকই বলেছ, ফ্রান্সিস। হ্যারি মাথা ওঠানামা করে বলল।
ফ্রান্সিস একটু গলা চড়িয়ে বলল–শাঙ্কো, বিনোলা, তাড়াতাড়ি ফিরে চলো। নদীর তীর কিন্তু চলার পক্ষে ভালো রাস্তা নয়। বেশ সময় লাগবে ফিরে যেতে। সন্ধের মধ্যেই ইরেকাস গ্রামে পৌঁছাতে হবে।
সবাই ফিরে চলল। এবড়োখেবড়ো পাথুরে পথ ভেঙে ঝোঁপজঙ্গল পেরিয়ে ওরা যখন ঐ গ্রামে ফিরে এল তখন সন্ধে নেমেছে। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে সঙ্গে নিয়ে সেই বৃদ্ধের বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াল। দেখল বৃদ্ধটি চুপ করে উঠোনের একপাশে একটা গাছের কাটা গুঁড়িতে বসে আছে। ফ্রান্সিস কাছে এসে বলল কিছু মনে করবেন না, একটা কথা বলছি। বৃদ্ধ কিছু বুঝতে না পেরে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
-দেখুন, আমরা এখানে এসেছি ঐ ঘূর্ণিটা দেখতে। তবে সন্ধে হয়ে এল, ভালো করে দেখাই হল না। কালকে একটু সকাল সকাল গিয়ে ভালো করে দেখব। মুশকিল হল সেই সমুদ্রমুখে আমাদের জাহাজ নোঙর করা আছে। জাহাজে ফিরে আবার কাল সকালেই আসা অসম্ভব। কাজই আমাদের আজকের রাতটা এখানে থাকতে হবে। আমাদের এই ক’জনকে খেতে দিতে। আপনাদের তো খরচ হবে। তাই অনুরোধ করছি–ধারে-কাছে গম, চিনি এসবের দোকান টোকান আছে?
–আছে একটু দূরে। সেখান থেকেই এসব কিনি আমরা। বৃদ্ধ বলল।
–তাহলে আমরা আপনাকে দুটো স্বর্ণমুদ্রা দিচ্ছি। আপনারা কিনে আনুন। এই দামটা আপনাকে নিতেই হবে। ফ্রান্সিস অনুনয়ের ভঙ্গিতে বলল।
–আপনি সত্যিই বিবেচক। এতজনকে খাওয়ানো
বৃদ্ধকে থামিয়ে দিয়ে ফ্রান্সিস বলল–সেটা বুঝি বলেই এই মূল্য ধরে দিচ্ছি। আপত্তি করবেন না।
–ঠিক আছে। দিন। বৃদ্ধ বলল।
–শাঙ্কো, দুটো স্বর্ণমুদ্রা দাও।
-শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি থেকে তিনটি স্বর্ণমুদ্রা বের করে দিল। বৃদ্ধ ফোকলা দাঁতে হেসে বলল-দুটো হলেই হবে।
–তিনটেই রাখুন। শাঙ্কো হেসে বলল।
বৃদ্ধ আর আপত্তি করল না। মুদ্রা তিনটি নিয়ে নিচু দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।
ক্লান্ত ফ্রান্সিসরা উঠোনের এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে বসল। শাঙ্কো ঘরের দরজার, কাছে গেল। ডাকাডাকি শুরু করল। এক বৃদ্ধা বেরিয়ে এল ঘর থেকে। শাঙ্কো তেষ্টার কথা বলে একটা মাটির বড় পাত্রে খাবার জল নিয়ে এল। বলল–মেপে খাও সবাই। রাতে খাওয়ার পর জলে যেন কম না পড়ে। সবাই মুখের কাছে পাত্রটা ধরে অল্প অল্প জল খেল। বেশি খেতে ভরসা পেল না। এবার ওরা শুয়ে বসে। বিশ্রাম করতে লাগল।
একটু রাতে ঐ উঠোনেই দুপুরের মতোই খেতে দেওয়া হল। বৃদ্ধের ছেলে মাঝখানে একটা জ্বলন্ত মশাল একটা গর্তে ঢুকিয়ে রাখল। সেই লম্বাটে শুকনো পাতা। পাঁচটা করে রুটি দেওয়া হল প্রত্যেকের পাতে। ভাজা, ঝোল মতো মিলিয়ে প্রত্যেককে চারটে করে মাছ দেওয়া হল। সঙ্গে আনাজের ঝোল। সবাই ক্ষুধার্ত। অল্পক্ষণের মধ্যেই পাত ফাঁকা। ফ্রান্সিস মাছভাজা চিবুতে চিবুতে একটু জোরে বলল–আর চেও না। পেট ভরে খেতে গেলে হয়তো এদের খাবারে টান পড়ে যাবে।
খাওয়ার পর উঠোনেই সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শুয়ে পড়ল। নদীর দিক থেকে বেশ ঠান্ডা হাওয়া বইতে লাগল। ক্লান্ত ভাইকিংরা প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু ফ্রান্সিসের চোখে ঘুম নেই। ও তাকিয়ে রইল নদীর ওপারের গাছগাছালি আর উঁচু পাহাড়টার দিকে। জ্যোৎস্না-ধোওয়া রাত। চাঁদ পাহাড়ের মাথায়। নিস্তব্ধ রাত। নদীর জলে গাছগাছালি আর পাহাড়ের উপর উজ্জ্বল জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ল। বড় সুন্দর দৃশ্য। সেই সঙ্গে নদীর ঢেউয়ের মৃদু শব্দ। ফ্রান্সিস মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেই অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিকে চেয়ে রইল। এবার সহজেই বুঝল কেন ইবু সালোমন মাঝে মাঝেই এই লোভাত নদী দেখতে আসতেন। একসময় ঘুমিয়ে পড়ল ফ্রান্সিস।
সকালে বাসি রুটি আর ঝোল খেয়ে আবার যাত্রা শুরু হল। গতকালের মতো একই জায়গায় নৌকোগুলো তীরে পুঁতে রাখা খুঁটিতে দড়ি দিয়ে বেঁধে হাঁটতে লাগল সবাই। আজকে সূর্যের তেজটা কম। মাঝে মাঝে কালচে মেঘে সূর্য ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল। তবে রাস্তা বলে তো কিছু নেই। তাই একটু মন্থর গতিতে হাঁটতে হচ্ছিল। ঘূর্ণির কাছাকাছি পৌঁছে ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–বিশ্রাম নেওয়া চলবে না। ঘূর্ণি বরাবর তীরের দিকে ঝুঁকেপড়া গাছগুলোর কান্ড খুব খুঁটিয়ে দেখতে থাকো। গাছের কাণ্ডের কোথাও কুড়ুলের কোপের দাগ বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক চিহ্ন মানে মানুষের হাতে তৈরি কোনও কিছু নজরে পড়লেই আমাকে ডাকবে। ছড়িয়ে পড়ল সবাই। ঝুঁকে পড়া ডাল সরিয়ে বা উঁচু ঝোঁপগাছের ডালপালা সরিয়ে তন্ন তন্ন করে খোঁজা শুরু করল।
ঝোঁপঝাড় ভাঙার শব্দ শোনা যেতে লাগল। খোঁজাখুঁজি চলছে। হঠাৎ শাঙ্কোর চড়া গলা শোনা গেল–ফ্রান্সিস, এদিকে এসো তো। ফ্রান্সিস খোঁজা বন্ধ রেখে ঝোঁপঝাড় ঠেলে শাঙ্কোর কাছে ছুটে এল। শাঙ্কো বিরাট উঁচু গাছের নীচে ঝোঁপঝাড় ভাঙছে তখন। ফ্রান্সিসকে গাছটার প্রায় পনেরো হাত ওপরে কাণ্ডটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল–ঐ দেখো।
ফ্রান্সিস মুখ উঁচু করে দেখলে ওখানুটার কাছাকাছি সব ডালগুলো কাটা। তার মানে কেউ ওখান পর্যন্ত উঠেছিল গাছ বেয়ে। ওখানে একটা মোটা কাছির অংশ পেঁচিয়ে শক্ত করে বাঁধা। আশ্চর্য! কাছিটা কাটা। হাত দুয়েক কাটা কাছি ঝুলছে। ফ্রান্সিস জোর গলায় ডাকল–হ্যারি, দেখে যাও।
