–তাহলে অন্য সব রাজা-শাসকরা যা করে তিনিও তাই করেছেন। তাদের ছলেবলে কৌশলে হত্যা করেছেন। হ্যারি বলল।
এতো তোমার অনুমান। হ্যারি বলল।
–দেখি আমার অনুমান সত্যি কিনা। এবার চলো, ঘূর্ণিটার যত কাছে সম্ভব যাব। ফ্রান্সিস বলল।
বড় বড় গাছ-ঝোঁপঝাড় তীরের কাছ পর্যন্ত নেমে গেছে। তারপর নদীর জল বয়ে চলেছে। ঘূর্ণি বরাবর শেষ দুটো গাছের একটা কাণ্ড ধরে ফ্রান্সিস ঝুঁকে পড়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঘূর্ণির্টার দিকে তাকিয়ে রইল। পাশে দাঁড়ানো শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস, এই ঘূর্ণির যা পাক দেখছি নৌকো তো নৌকো, জাহাজ ও ডুবে যেতে পারে।
–হ্যাঁ, সমুদ্রেও কোথাও কোথাও ডুবো পাহাড়ের ধাক্কায় এরকম প্রচণ্ড ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়। জাহাজও পাক খেতে খেতে ডুবে যায়। এই ঘূর্ণিটা তেমন বড় কিছু না। তবে জেলে নৌকো ডুবে যাবে। তাই জেলেরা এদিকে নৌকোয় চড়ে মাছ ধরতে আসে না।
–আলফানসো বলেছিল ইবু সালোমনের পালঙ্কের নীচে নাকি একটা লম্বাটে সিন্দুকে স্বর্ণমুদ্রার ভাণ্ডার সযত্নে রাখা ছিল। তাহলে ইবু সালোমান তাঁর দেহরক্ষীদের দিয়ে এই ঘূর্ণির মধ্যেই ফেলে দিয়েছিলেন সেই স্বর্ণভাণ্ডার? হ্যারি ভাবতে ভাবতে বলল।
–মনে হয় সেটাই হয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু তাহলে তো এই সিন্দুক উদ্ধারই করা যাবে না। হ্যারি হতাশ ভঙ্গিতে বলল।
–এইটাই সবচেয়ে জটিল ধাঁধা। তিনি কি সব জেনেও ঐ সিন্দুকটা এখানে ফেলে দিয়ে গেছেন? ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে তো ওটা চিরকালের জন্যে মানুষের দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। হ্যারি বলল।
–না। সিন্দুকটা এখানেই ফেলা হয়েছিল। কীভাবে ফেলা হয়েছিল এটা জানতে পারলেই বোঝা যাবে তিনি কি সিন্দুকটা চিরদিনের জন্য লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে চেয়েছিলেন? তারপর একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল-হ্যারি, সেই ছেলেবেলায় তুমি তো জানো কতদিন সমুদ্রের সামনে বসে থেকেছি আমি। কত জাহাজ কত দূর দূর দেশ থেকে আসত। নাবিকদের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কাহিনি গভীর আগ্রহ নিয়ে শুনতে শুনতেই বড় হয়েছি আমি। এক বৃদ্ধ নারিক আমায় বলেছিল–এক সামুদ্রিক ঘূর্ণির কথা। প্রচণ্ড ঘূর্ণিতে পড়ে পাক খেতে খেতে সে অত্যন্ত দ্রুতবেগে তলিয়ে গিয়েছিল। আশ্চার্য! গভীরে জল ছিল অনেক শান্ত। ঘূর্ণির পাক কতদূর পৌঁছোয়নি। এত দ্রুত তলিয়ে গিয়েছিল যে তখনও তর দম ফুরোয়নি। সে শান্ত জলে দুপায়ের তলায় পাথর বালিতে ধাক্কা দিয়ে প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় শান্ত এলাকা। দিয়ে ওপরে উঠে এসেছিল। বেঁচে গিয়েছিল। ফ্রান্সিস বলল।
-হ্যাঁ। কাজেই এই ঘূর্ণির প্রবল মোচড় ওপরেই। একেবারে তলায় জল কিন্তু শান্ত। আসলে অগভীর এই লোভাত নদী। তা নইলে সহজেই দু-তীর বন্যায় ভেসে যেত না। মনে হয় ইবু সলোমন সেই সিন্দুক তুলে আনার জন্যে একটা ব্যবস্থা রেখেছিলেন।
-কেন? হ্যারি বলে উঠল।
–হয় তো তিনি তখনও পুত্রের ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস হারাননি। কত দূরাচারী নিমর্ম নরঘাতকও তো পরে সাধুপুরুষ হয়েছেন। তাই তার শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস ছিল হয়তো পুত্র ইবু গ্যাব্রিওলের মানসিক পরিবর্তন হবে। সে শুধরে যাবে। তখন এই স্বর্ণভাণ্ডার তুলে এনে পুত্রকে দিয়ে যাবেন।
হ্যারি চুপ করে ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর বলল–হ্যাঁ ফ্রান্সিস, তোমার অনুমান ঠিক। মানুষের এরকম পরিবর্তনের অনেক কাহিনি আছে।
-তাই-সেই শয়নকক্ষের বাইরে পুত্রের মৃদু পদশব্দ শুনেই বুঝেছিলেন–নিঃশব্দে মৃত্যু হবে তাঁর পুত্র তাকে হত্যা করতে আসছে। তাই তিনি তার সবচেয়ে প্রিয় ও সৎ আলফানসোকে গুপ্ত স্বর্ণভাণ্ডারের হদিস তার শেষ কবিতায় জানিয়ে দিয়ে গেছেন। কীভাবে সেই স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধার করতে হবে, তারপর কীভাবে হতভাগ্য সর্বহারাদের মধ্যে তা বিলিয়ে দিতে হবে তার ইঙ্গিতও দিয়ে গেছেন।
কথাটা শুনে হ্যারি চোখ বুজে ভাবল। তারপর তাকিয়ে বলল-সাবাস ফ্রান্সিস! তুমি কবি না হয়েও শেষ কবিতাটার অর্থ সঠিক উদ্ধার করতে পেরেছ। তাহলে উদ্ধারের একটা উপায় নিশ্চয়ই আছে।
–অবশ্যই আছে। এবার এই ঘূর্ণির দু’পাশের গাছের সারি, ঝোঁপজঙ্গল সব তন্ন তন্ন করে খুঁজতে হবে। দেখা যাক কোনও সূত্র পাওয়া যায় কিনা। কারণ, নৌকোয় চড়ে গিয়ে সিন্দুক ঐ ঘূর্ণিতে ফেলে দেওয়া অসম্ভব। কিন্তু ঐ ঘূর্ণির মধ্যে সিন্দুক ফেলতে গেলে তো যেতেই হবে। কীভাবে দুঃসাহসী দেহরক্ষীরা ওখানে গিয়েছিল? উড়ে উড়ে তো যায়নি। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে কীভাবে গিয়েছিল? হ্যারি বলল।
–সেই সূত্রটাই পেতে হবে। আজ তো বিকেল হয়ে এসেছে। চলো, ঐ জেলেদের গ্রামে ফিরে যাই। আজকের রাতটা ঐ গ্রামে কাটিয়ে কাল তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে এখানে চলে আসব। মোটেই দেরি করা চলবে না। ইবু গ্যাব্রিওল কিন্তু ভীষণ ধুরন্ধর। তাছাড়া এসব লোকেরা অত্যন্ত সন্দেহবাতিক হয়। যে নিজের পিতাকে নিঃশব্দে হত্যা করতে পারে, সে সব পারে। তার শাসনের বিরুদ্ধে কেউ কোথাও তলে তলে লোক ক্ষ্যাপাচ্ছে কিনা তা জানতেও ইতিমধ্যে সারা রাজ্যে গুপ্তচর ছড়িয়ে দিয়েছে। গুপ্তচরদের পোশাকে তো আর তাদের আসল পরিচয় লেখা থাকে না। সে ভালো করেই জানে ইবু সালোমন মাঝে মাঝেই এই লোভাত নদী এলাকায় প্রকৃতির কোলে কিছুদিন কাটিয়ে যেতেন। সুতরাং এমনটা হতেই পারে যে স্বর্ণমুদ্রার ভাণ্ডার লুকিয়ে রাখতে তিনি এই নদী এলাকাটাই বেছে নিয়েছিলেন। কাজেই লোভাত নদীর তীর বরাবর সব জায়গা ওপরই নজর রাখতে ইতিমধ্যেই গুপ্তচর পাঠিয়েছে। ইরেকাস গ্রামে আমরা এসে ডেরা বেঁধেছি এ খবর খুব সহজেই পাবে ওরা। কারণ, আমরা বিদেশি। এখানকার মানুষ নই। আমাদের শনাক্ত করা সহজ।
