মাথার ওপর সূর্যের তেজ তেমন নেই। মাঝে মাঝে হালকা মেঘে সূর্য ঢাকাও পড়ছিল। তাই দুপুর হয়ে এলেও দাঁড় টানতে খুব একটা কষ্ট হচ্ছিল না। একটা ছোটো বাঁক আসতেই দেখা গেল জনবসতি শুরু হয়েছে ডানদিকে। কাঠ-পাথরের বাড়ি। গাছের ডাল ফালা করে জানালা-দরজা তৈরি করা হয়েছে। নদীর পাড়ে বেশ কিছু দেশীয় মাছধরা নৌকো। তীরে খুঁটিতে জাল শুকোচ্ছে। বোঝা গেল জেলেপাড়া। এদের মাছ ধরাই প্রধান পেশা। তবে খাটো ছোট ফসলি জমিও দেখা যায়। শাঙ্কোই প্রথম একটু অধীর হয়ে হ্যারির দিকে তাকাল। বলল হ্যারি, আমরা কোথায় যাচ্ছি, কখন থামব কিছুই তো বুঝতে পারছি না।
অধৈর্য হয়ো না। বলবার সময় এলে ফ্রান্সিস নিজেই সব বলবে। হ্যারি শান্তস্বরে বলল।
–আমরা কি কোনও গুপ্তধন উদ্ধার করতে যাচ্ছি? বিনোলা বলল।
–অবশ্যই। নইলে কি হাওয়া খেতে এসেছি? সমুদ্রে কি হাওয়া কিছু কম? হ্যারি বলল।
তখনই ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–এভাবে হবে না। হ্যারি, নৌকো ভেড়াতে বলো।
দুটো নৌকো তীরে ভেড়ানো হল। দেখা গেল তীরে বেশ কয়েকটা দেশীয় জেলে নৌকো বাঁধা। তীরের এখানে ওখানে ছড়িয়ে কয়েকটা পাথরখণ্ড। তার উপর বসে কয়েকজন জেলে জাল বুনছে। পরনে গ্রামের জেলেদের সাধারণ পোশাক। মোটামুটি পরিচ্ছন্ন পোশাক। সবচেয়ে সামনে একটা পাথরের কাছে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে ছিল। কোমরে হাত দিয়ে জেলেরা কেউ কেউ ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে দেখছিল। ফ্রান্সিসদের নৌকোও দেখছিল। অন্যরকম নৌকো। বোঝাই যাচ্ছে এরা বিদেশি।
নৌকো থেকে ফ্রান্সিস সেই বৃদ্ধের কাছে এল। সঙ্গে হ্যারিও এল। ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল–এই গ্রামটার নাম কি?
ইরেকাস। বৃদ্ধ ফোকলা মুখে হেসে বলল–আপনারা কারা?
আমরা বিদেশি। আমাদের জাহাজ এই লোভাত নদীর মুখেই নোঙর করা আছে। এই নদীতে জাহাজ তো ঢোকে না। তাই নৌকোতে চড়ে এসেছি। সমুদ্রে ঘূর্ণিটুর্নি দেখেছি। শুনলাম এই লোভাত নদীতেও নাকি একটা বেশ বড় ঘূর্ণি আছে।
-হ্যাঁ হ্যাঁ।
–সেটা কোথায়?
আঙুল বেশ দূরের একটা ছোট পাহাড় দেখিয়ে বৃদ্ধ বলল–ঐ খানে। বেশ দূরে। ওখানে নদীটা বাঁক খেয়েছে। ওখানেই আছে ঘূর্ণিটা বর্ষাকালে তো সে ভয়ংকর চেহারা নেয়। এখনও কম নয়। কত নৌকো যে ঐ ঘূর্ণির কাছাকাছি যেতেই, ডুবে গেছে তার হিসেব নেই। আমরা ভুলেও ওদিকে মাছ ধরতে যাই না।
তাহলে তো এখন ওটার কাছে যাওয়াই যাবে না। হ্যারি বলল।
–বলেন কী! ঘূর্ণির প্রচণ্ড টানে নৌকাসুদ্ধ তলিয়ে যাবেন। একজন জেলে বলে উঠল।
–তাহলে কী করবে? হ্যারি ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল।
–নৌকো দুটো এখানেই থাক। আমরা নদীতীর দিয়ে হেঁটে ঐ ঘূর্ণির কাছে যাব। চলো এসো সবাই।
সবাই নৌকো থেকে নেমে এল।
শাঙ্কোরা যখন নৌকো দুটোকে খুঁটির সঙ্গে বাঁধছে তখন সিনাত্রা বলল–ফ্রান্সিস, সেই সকালে খেয়েছি। তারপর এই দুপুরে হতে চলল। ফ্রান্সিস হেসে ডান হাতের চেটো দেখিয়ে বলল–র্গিজার পাদরিদেরও খেতে হয়। ব্যবস্থা হচ্ছে। ফ্রান্সিস জেলেদের কাছে গেল। একজন বয়স্ক জেলেকে বলল–আপনি তো আমার পিতৃতুল্য। আপনি গররাজি হলেও আমি মোটেই দুঃখিত হব না। বয়স্ক জেলে হাঁ করে ফ্রান্সিসদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। হেসে ফ্রান্সিস বলল–লোভাত নদীর সেই মুখ থেকে নৌকো চালিয়ে আসছি। কিছু পেটে পড়েনি। যদি আমাদের জন্যে সামান্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করেন তাহলে আমরা নতুন উদ্যমে কাজে নামতে পারি।
–সেকি কথা? আপনারা তো আমাদের অতিথি! দেখছি কী করা যায়।
বৃদ্ধ জাল বুনছিল। জাল বোনা বন্ধ রেখে চলে গেল ঘরগুলোর দিকে। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বলল–আপনাদের খেতে দেবার মতো খাবার হয়ে গেছে।
একটা মোটামুটি বড় বাড়ির উঠোনে একধরনের লম্বাটে শুকনো পাতায় ওদের খাবার দেওয়া হল। ফ্রান্সিসরা বসে পড়ে খেতে লাগল। মাছের ঝোল মতো আর রুটি দুটো করে। খাওয়া শেষ করে ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল
এখন বিশ্রাম-টিশ্রাম চলবে না। আমার সঙ্গে চলো।
নদীতীরের বালিমাটি অনেক দূর টানা চলে গেছে। সেই ভেজা ভেজা বালিমাটির এলাকা ধরে ফ্রান্সিস হাঁটতে শুরু করল দূরে নদীর বাঁকের দিকে। আগে-পাছে হেঁটে চলল সবাই। কিছুদূর যেতেই বালিমাটি এলাকা শেষ। পাথুরে মাটি শুরু হল। মাঝে মাঝে ছোটো বড়ো পাথুরে চাই। সেখানে উঠে চলা শুরু হল। চলার গতি অনেক কমে গেল। এবড়ো খেবড়ো পাথুরে মাটি ছোটো ছোটো চাইয়ে উঠে পাশ কাটিয়ে গাছগাছালির গুঁড়ি এড়িয়ে বাঁকের কাছ আসাতে দেখা গেল নদীটা এখানে অনেকটা বাঁক নিয়েছে। দুপাশের পাথুরে মাটির ঢাল নেমে এসেছে। দুপাশের দূরত্ব এখানে অনেক কম। দুপাশের ঢালে ধাক্কা খেয়ে তীব্র স্রোতের জলে একটা বড় আকারের ঘূর্ণি তৈরি হয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস, তুমি কি এই ঘূর্ণির কথাই ভাবছিলে?
-হ্যাঁ। লক্ষ করেছো নদীর দুই তীরের দূরত্ব এখানে অনেক কম। এপারে উঁচু উঁচু গাছ আর ঝোঁপঝাড় টানা চলে গেছে। ওপারে অবশ্য মাত্র একটা চেস্টনাট গাছ দেখছি।
–তাহলে কি ইবু সালোমন এখানেই এসেছিলেন। হ্যারি বলল।
–অবশ্যই। ভুলে যেও না তিনি সঙ্গে ছসাতজন বলশালী দুঃসাহী দেহরক্ষী এনেছিলেন।
–কিন্তু তারা তো কেউ ফিরে আসেনি?
–এখানেই প্রশ্ন। উত্তর সহজ–সেই দুঃসাহসী দেহরক্ষীদের সাহায্যে তিনি এখানেই কোথাও আরবী স্বর্ণমুদ্রার ভাণ্ডার লুকিয়ে রেখেছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।
