রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। মাস্তুলের ওপর নজরদার পেড্রোর হাঁক শোনা। গেল–ডানদিকে–নদীর মুখ। তখন হ্যারিও ফ্রান্সিসের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আকাশে চাঁদ তখন উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে। মাথার ওপরে আকাশ সাদাটে হয়ে এসেছে। সূর্য উঠতে দেরি নেই। অস্পষ্ট হলেও দুজনে লোভাত নদীর মুখ দেখল। জাহাজ আরো কাছে এল। সূর্য উঠল। ভোরের নরম রোদে দেখা গেল নদীর জল সমুদ্রের জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। বেশ ঘোলাটে জল। নদীটা মোটামুটি দেখে নিয়ে বুঝল জাহাজ ঢোকার মতো বড় নদী নয়। অভিজ্ঞ চোখে বুঝল খুব গভীর নয় লোভাত নদীর জল। এখন ভাটার টান চলেছে।
খাঁড়ি নয়। জলের গভীরতাও তেমন নয়। কী বলো? হ্যারি বলল।
–হুঁ। এখানেই তীরে কোথাও জাহাজ নোঙর বাঁধতে হবে। নদী ধরে এগোতে গেলে নৌকা ছাড়া গতি নেই। তাও ভাটা চলছে। নৌকো স্রোতের বিপরীতে চালাতে হবে। ফ্রান্সিস ভাবতে ভাবতে বলল।
ততক্ষণে শাঙ্কোরা কয়েকজনও এসে দাঁড়িয়েছে। শাঙ্কো বলল–কিন্তু কতদূর যেতে হবে তাও তো বুঝতে পারছি না।
-বাঃ শাঙ্কো! এটা একটা কথা হল? আমরা তো নদীতে এখনও ঢুকতেই পারিনি। তার আগেই বুঝে যাব কোথায় কতদূর যেতে হবে! ফ্রান্সিস বলল।
না না, তা কেন? একটু থতমত খেয়ে শাঙ্কো বলল।
–তাহলে ঐ ভাবনা ছাড়ো। যাও–তিনটে নৌকার ব্যবস্থা করো। দাঁড় বেশি সংখ্যায় নাও। কয়েকজন সকালের খাবার খেয়েই লোভাত নদীতে ঢুকব। ফ্রান্সিস বলল!
শাঙ্কোরা কয়েকজন তিনটে নৌকোয় নেমে এল। নৌকোর সব কিছু খুঁটিয়ে দেখল। পরীক্ষা করল কোথাও ফুটো রয়েছে কিনাকাঠ ফেটেছে কিনা। একটায় দেখা গেল মাঝামাঝি একটু জল জমেছে। জলটা ছেচে ফেলে কাঠের টুকরো জুড়ে জায়গাটা শক্ত করা হল।
— ফ্রান্সিসের কেবিন ঘরে রাঁধুনি বন্ধু খাবার দিয়ে গেল। খেতে খেতে ফ্রান্সিস বলল–আলফানসো, ইবু সালোমনের শেষ কবিতাটা তো আপনার মুখস্থ। আচ্ছা, কবিতাটার ঠিক অর্থটা কি?
–তেমন কঠিন অর্থ কিছু না। সমুদ্রে বা নদীর জলে যে প্রবল ঘূর্ণি এখানে সেখানে দেখা যায়, মানুষের জীবনেও তেমনি সেই ঘুর্ণি আছে। হিংসা হানাহানি রক্তের ঘূর্ণি।
স্বাথপর নির্মম হৃদয়ের মানুষদের জীবন ঐ ঘূর্ণির মতো। কিন্তু সেই সব ঘূর্ণির নিচে যে জলভাগ সেখানকার জল কিন্তু শান্ত অচঞ্চল। স্থিতধী মহান মানুষেরাও তেমনি। সুন্দর অর্থ তারা ঘূর্ণিপাকের নীচে অচঞ্চল থাকেন।
–দেখুন, আমি কাঠখোট্টো মানুষ। কবিতা-টবিতা তেমন বুঝি না। কথাটা বলে ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–হ্যারি, তুমি কিছু বলল।
হ্যারি একটু চুপ করে থেকে বলল–আমারও তাই মনে হয়েছে। কিন্তু তবু আমার মনে খটকা যাচ্ছে না মনে হয় কবিতাটা আলফানসোকে লক্ষ্য করেই যেন লেখা। নইলে বিলিয়ে দাও কথাটা আসত না। আবার দেখো প্রশান্তি সম্পদ। প্রশান্তি নিশ্চয়ই মানুষের মনের সম্পদ। এটাই সঠিক বুঝতে পারছি না।
একপাশে বসে মারিয়া ওদের কথা শুনছিল। বলল-মনের সম্পদ কি বিলিয়ে দেওয়া যায়? সোনা হীরে মুক্তা এসব বিলোনো যায়। তারপর খাদ্যটাদ্যও। কিন্তু মনের সম্পদ? সেটা কি বিলোতে পারে?
আলফানসো, আপনি কী বলেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
আলফানসো কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইল। দুজনের ব্যাখ্যা ভাবল। তারপর চোখ পিটপিট করে তাকাল। বলল–ফ্রান্সিস, তোমার বন্ধু সত্যিই জ্ঞানী। শব্দের গভীর অর্থ বোঝে। রাজকুমারীও কম যান না। উনি কবিতা লেখেন কিনা জানি না। তবে কবিতার অর্থ উদ্ধারে নিঃসন্দেহে দক্ষ। একটু থেমে বলল–এভাবেও অর্থটা করা যায়। সত্যি কথাটা হল–কবিতার দু’এক পংক্তি মনে হতেই আমি আর শেষটুকু মনে করার কথা ভাবতামই না। চোখের জলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যেত। তাই খুব গভীরে বোঝবার চেষ্টাও করিনি কোনোদিন। তোমরা দুজন যেভাবে পংক্তিগুলির অর্থ উদ্ধার করেছ, একজন সামান্য কবি হিসেবে আমি তোমাদের ভূয়সী প্রশংসা করছি। হ্যাঁ, এইবার আমি সত্যিই বুঝতে পারছি উনি শেষ কবিতাটার মধ্যে দিয়ে আমাকেই কিছু একটা নির্দেশ দিয়ে গেছেন।
ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। সাগ্রহে বলে উঠল–হ্যারি, তোমরা তৈরি হও। আমার চিন্তায় যেটুকু ধোঁয়াশা ছিল তা কেটে গেছে। দেরি করা চলবে না। সকালের খাবার খেয়ে ইবু গ্যাব্রিওল কিছু আঁচ করার আগেই আমাদের কাজ শেষ করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব।
ফ্রান্সিস অবশ্য দুটো নৌকা নিল। নৌকো দুটো তৈরিই ছিল। ফ্রান্সিসের নির্দেশে একটা নৌকোয় হ্যারি বিনোলা আর সিনাত্রাকে নিয়ে দড়ির সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল। অন্যটায় ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো বসল। দুটো নৌকোই ছেড়ে দেওয়া হল। খুব উঁচু ঢেউ উঠছে না। নদীমুখে আসতেই দেখা গেল মুখটায় নদীর ঘোলা জল এসে মিশে যাচ্ছে। স্রোত খুব তীব্র নয়। সামনে রইল ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোর নৌকো। দুজনেই দাঁড় বাইতে লাগল। গতি বাড়াতে হবে। পেছনেরটায় হ্যারি বিনোলা আর সিনাত্রা। নদীর ঢেউয়ে দোল খেতে খেতে বেশ দ্রুতই চলল নৌকো দুটো। ফ্রান্সিস দু’ধারে তাকিয়ে দেখল–বাঁদিকে টানা উঁচু-নিচু পাহাড়। ডানদিকে কিন্তু বনভূমি। বড় বড় গাছগাছালি ঝোঁপঝাড়। নৌকো দুটো চলল। কিন্তু দু’পাড়ে কোনও জনবসতি নেই। তবে বাঁদিকে পাহাড়ি এলাকা কমে গিয়ে গাছগাছালি দেখা গেল।
