সত্যি অপূর্ব! একজন প্রকৃত মানবপ্রেমীর অন্তরের ডাক।
–সত্যি তাই। এই শেষ কবিতাটার গুরুত্ব অপরিসীম। এই কবিতাটায় একটা রহস্যময় নির্দেশ আছে। আলফানসো বলল।
একটু ভেবে নিয়ে হ্যারি বলল হতে পারে। অসম্ভব নয়।
ফ্রান্সিস আলফানসোর দিকে তাকাল। বলল–লোভাত কী?
–একটা নদী, উত্তরের দিকে।
–কত দূরে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–সিনহো থেকে একদিনের পথ। আলফানসো বলল।
–খুব বড় নদী? ফ্রান্সিস বলল।
শীতকালে নয়। কিন্তু বর্ষাকালে আর সমুদ্রে জোয়ারের সময় দু’পাশের বসতি ভাসিয়ে দিয়ে বন্যা হয়।
দু’পাশের বসতি কি খুব ঘন?
–না না। ছাড়া ছাড়া কয়েকটা গ্রাম মতো। আলফানসো বলল।
–আমাদের জাহাজ ঢুকবে? হ্যারি জিগ্যেস করল।
–উঁহু। অত গভীর নয়। আলফানসো মাথা এপাশ-ওপাশ করল।
–ইবু সালোমান কি মাঝে মাঝেই ঐ নদীর দিকে যেতেন? ফ্রান্সিস বলল।
–জানি না। তবে আমি বার দুয়েক দেখেছিলাম তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত দেহরক্ষী কে এতামকে সঙ্গে নিতে।
–হুঁ। তিনি ঐ নদী দেখতে যেতেন। তাই না? হ্যারি বলল।
–মনে হয় উনি নগরের হইহট্টোগোল থেকে কিছুদিনের জন্যে প্রকৃতির কোলে যেতে ভালোবাসতেন। একটা ছোট্ট কবিতায় লিখেছিলেন–
নগরবাসী বন্ধু
সে ও হে প্রকৃতির মায়ের কোলে
অনেক সান্ত্বনা পাবে।
–সন্দেহ নেই তিনি সত্যিকারের কবি ছিলেন। আলফানসো, আমাদের জাহাজেও আছে একজন ভালো গায়ক বন্ধু। তাকে পেলে আপনি খুশি হবেন। হ্যারি বলল।
আর কোনও কথা হল না। আলফানসো শুয়ে পড়ল। মারিয়া মেঝেয় কম্বল পাততে পাততে বলল–আমি এখানে শোব আজ।
–কী যে বলো। ঐ কাঠের মেঝেয় তোমার কষ্ট হবে। ফ্রান্সিস আপত্তি করল।
–পারব। মারিয়া শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিসও শুয়ে পড়ল। আলফানসো ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে।
পরের দিন সকালে ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে জাহাজচালক ফ্লেজারের কাছে এল। বলল–ফ্লেজার আমাদের জাহাজ উত্তর পোর্তুগালের বন্দর নগর সিনহোর কাছে এসেছে। আমরা ঐ বন্দরনগরে যাব না। এবার অন্যভাবে ছক কষেছি। ঐ অঞ্চলের শাসক ভীষণ হিংস্র প্রকৃতির। নিজের পিতাকে সকলের অগোচরে ধুরন্ধর খুনির মতো ছক কষে হত্যা করেছে। ওকে বিশ্বাস নেই। তুমি উত্তরের দিকে দিক ঠিক রেখে চালাও। যেতে যেতে ডানদিকে একটা নদী–লোভাতের মুখ পাবে। ঐ নদীতে আমাদের যেতে হবে। জাহাজ ঢুকবে না। নৌকো নিতে হবে। যতটা দ্রুত পার চলো। আমরা আর বিনা কারণে এক মুহূর্তও দেরি করব না।
–ঠিক আছে। হুইল ঘুরিয়ে ফ্লেজার বলল।
দুজনে সরে এসে রেলিঙ ধরে দাঁড়াল। শাঙ্কোও এসে দাঁড়াল।
কী ঠিক করলে, ফ্রান্সিস? হ্যারি জানতে চাইল।
–আমরা সিনহো নগরে যাব না। ইবু গ্যাব্রিওলের থাবা এড়িয়ে লোভাত নদী এলাকায় যাব। শুধু তুমি, শাঙ্কো আর আমি নৌকা নিয়ে সমুদ্রের মুখ থেকে নদীতে ঢুকব। আগে নদীটা ঘুরে ভালো করে দেখব।
–তবে কি ঐ নদীতেই ইবু সালোমনের আরবী স্বর্ণভাণ্ডার গোপনে রাখা আছে? হ্যারি জিগ্যেস করল।
–অবশ্যই কোনও সন্দেহ নেই।
–কিন্তু কোথায়? লোভাত নদী কত লম্বা তা তো জানি না। হ্যারি সংশয় প্রকাশ করল।
–উজিয়ে গিয়ে দেখতে হবে। খোঁজাখুঁজি করতে হবে। হয়তো কাছাকাছি কোথাও সূত্র পেয়ে যাব। উৎস পর্যন্ত যেতে হবে। ইবু সালোমন খুব বেশি দূর যাননি বলেই আমার বিশ্বাস। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু সঠিক জায়গাটা খুঁজে পেতে তো অনেকদিন লাগবে। শাঙ্কো বলল।
সেটা তো সব খোঁজখবর না নিয়ে এখনই বলতে পারব না। একটা সমস্যা তো আছেই–মাঝে মাঝে আকাশে মেঘ জমছে। কখনও কখনও বৃষ্টিও হচ্ছে। পুরো বর্ষা আসতে খুব একটা দেরি নেই। তার আগেই সবরকম খোঁজাখুঁজি চালাতে হবে। গোপনে রাখা কুফির মানে আরবী স্বর্ণমুদ্রার ভাণ্ডার উদ্ধার করতে হবে। এক মুহূর্ত দেরি করা চলবে না।
জাহাজের গতি বাড়ানো হয়েছে। মনে হয় দু একদিনের মধ্যেই লোভাত নদীর মুখে পৌঁছতে পারব। তারপর কাজে নামতে হবে। তাও ভাটার সময়। নদীর জল তখন সমুদ্রমুখী বইবে। নদীটা কত বড়, স্রোত কেমন, উজানে নৌকো চালাতে হলে অনেককিছু জানার আছে, বোঝার আছে।
শাঙ্কো বা হ্যারি কেউ কোনও কথা বলল না। ওরা জানে ফ্রান্সিস অনেক ভেবেচিন্তে ছক কষে।
এও তো হতে পারে–শাঙ্কো বলতে গেল।
ফ্রান্সিস ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল–জানি তুমি কী বলবে। হ্যাঁ, তাও হতে পারে। হয়তো গোপন স্বর্ণ ভাণ্ডার সেখানে নেই। কিন্তু আছে কিনা তুমি বা আমি কেউ এক্ষুনি বলতে পারব না। দেখাই যাক না।
আর কোনও কথা হল না। ফ্রান্সিস পুবদিকের একটু মেঘলা দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বললশাঙ্কো, নজরদার পেড্রোকে গিয়ে বলল আজ রাতে ওর বিশ্রাম নেই। সারারাত পুবদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। শাঙ্কো বাধ্যর মতো সঙ্গে সঙ্গে পেড্রোর খোঁজে চলল।
–হ্যারি, আমরাও আজ রাতে ঘুমোত পারব না। তৈরি থাকতে হবে। লোভাত নদীর মুখ নজরে পড়বেই। কারণ, এখন সারারাত চাঁদের উজ্জ্বল আলো থাকবে। নদীমুখ চিনতে আমরা অভ্যস্ত। চলো, এখন বিশ্রাম করে নিই।
রাতের খাওয়া সেরে ফ্রান্সিস সেই যে ডেক-এ এসে ঐ রেলিঙ ধরে দাঁড়াল, আর নামল না। হ্যারি মাঝে মাঝে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসই বলল–হ্যারি, তোমার শরীর কিন্তু আমাদের মতো শক্তপোক্ত নয়। তুমি শুয়ে পড়ো গে।
রাত গভীর হতে লাগল। একটানা সমুদ্রের শোঁ শোঁ শব্দের বিরাম নেই। মাস্তুলের ওপরে নজরদার পেড্রো তো নজরদারির ব্যাপারে চির অভ্যস্ত। চারদিকে উজ্জ্বল চাঁদের আলো। আকাশে কালচে মেঘের আনাগোনা চলছে। কখনও চাঁদের মুখ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। মেঘ সরে যেতেই আবার চারদিকে জ্যোত্সর বন্যা। ঢেউ ভেঙ্গে জাহাজ দ্রুত চলেছে।
