হ্যাঁ হ্যাঁ। যত্ন করে রেখে দিয়েছি। আমি বললাম। আপনি রাজি হলেই সব বাঁধিয়ে রাখব।
তাই রাখুন। অনেক সুখ দুঃখ বেদনার স্মৃতি তো জড়িয়ে আছে ঐ কবিতাগুলোর সঙ্গে। তবে এই শেষ কবিতাটা শুধু আলাদা করে আপনার কাছে রেখে দিন। একমাত্র আপনার মতো একজন যথার্থ উচ্চমানের কবিই এই কবিতাটার অর্থ বুঝবেন। অন্যের কাছে এটা দুর্বোধ্য মনে হবে। অবশ্য সেই অর্থের বাইরেও একটা অন্য অর্থও আছে। এখন নয়–পরে–অর্থাৎ আমাব অবর্তমানে–মানে
আমি বাধা দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিতে যাব তখনই বাইরের দিককার দরজায় মৃদু টকটক শব্দ শোনা গেল। ইবু সালেমান আস্তে বললেন–দয়া করে দরজাটা খুলে দিন। গভীর রাতের নৈঃশব্দ্যের মধ্যে শব্দটা বেশ জোরেই শোনা গেল। আমি তো হতবাক। একে তার এই কক্ষে কারো প্রবেশের হুকুম নেই। তার ওপর এত রাতে কে এল? তার অন্দরমহল থেকে কি কেউ এল? কিন্তু বাইরের দরজা দিয়ে তারা আসবেন কেন? এলে ভেতরের দরজা দিয়েই তো আসবেন। আবার টোকা দেওয়ার শব্দ। এবার একটু জোরে।
–যান। খুলে দিন দরজা। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন যেন আপন মনে –নিঃশব্দ মৃত্যু। এর অপেক্ষাতই ছিলাম। আমি চমকে উঠলাম। একথার অর্থ কী? আবার টোকা দেওয়ার শব্দ। উনি নিঃশব্দে আঙুল তুলে দরজাটা দেখালেন। আমি তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে দিলাম। ঘরের মৃদু আলোয় দেখলাম তার জ্যেষ্ঠপুত্র ইবু গ্যাব্রিওল দাঁড়িয়ে। তার পেছনে তার দুজন বিশ্বস্ত দেহরক্ষী। কঠিন মুখ তাদের। গ্যাব্রিওল একটু হেসে বলল–বাড়ি যান। অনেক রাত হয়েছে। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। এক ঝলক পেছনে তাকিয়ে দেখি ইবু সালোমন দু’চোখ বন্ধ করে নিথর বসে আছেন। ঠোঁট দুটো অল্প অল্প নড়ছে। বোধ হয় কিছু প্রার্থনা করছেন।
যান। ইবু গ্যাব্রিওল প্রায় চাপা ধমকের সুরে বলল। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম নিঃশব্দ মৃত্যুর অর্থ কি? আমি দ্রুত বাইরে চলে এলাম। বুকে একরাশ আতঙ্ক নিয়ে। কী করে সরাইখানায় ফিরে এলাম বলতে পারব না। একটু থেমে ভগ্নস্বরে বৃদ্ধ আলফানসো বলল–ওটাই তার শেষ কবিতা। কথাটা বলে আলফানসো দু হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
উত্তেজনায় তখন ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মুহূর্তে নিজেকে সংযত করল। বসে পড়ল আবার। আলফানসো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল একটু পরে শান্ত হল। ফ্রান্সিসরা তিনজনেই ততক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ করে রইল। হ্যারি আস্তে আস্তে চলে গেল। ফ্রান্সিস নিঃশব্দে কম্বলটা টেনে নিয়ে মেঝেয় পেতে শুয়ে পড়ল। মারিয়া হাত বাড়িয়ে আলফানসোকে আস্তে আস্তে শুইয়ে দিল।
পরেরদিনও খাবার খেতে খেতে আলফানসোকে ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল,
এখন আপনার শরীর কেমন?
আলফানসো খুশির হাসি হেসে বলল–বুকে জমে থাকা এত কথা তোমাদের বলতে পেরে আমি যেন হালকা বোধ করছি। তোমাদের ধন্যবাদ।
ফ্রান্সিস তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল–আমরা এরকমই। তবে ইবু সালোমনের শেষ কবিতার প্রসঙ্গটা অন্তত আমার মনে একটা প্রশ্ন তুলেছে। সেই কবিতাটা এখন কোথায়? ..
–সে তো আর এক ইতিহাস। আলফানসো বলল।
–সে সব আমার জানা। শুনুন অতি সংক্ষেপে বলছি–ইবু গ্যাব্রিওল দেশটায় অত্যাচারের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল। সর্বপ্রথমে সে আপনাকেই বন্দী করেছিল। ইবু গ্যাব্রিওল অত্যন্ত ধুরন্ধরের মতো পরিকল্পনা করে এগিয়েছিল। অবশ্য তার অসৎ বন্ধুরাও তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছিল। ফ্রান্সিস বলল–তাই কিনা?
–ঠিক তাহলেই বুঝতেই পারছ যে অমানুষটা নিজের দেবতুল্য পিতাকে হত্যা করতে পারে, সে আমার ওপর কী রকম অত্যাচার করতে পারে! ওই অমানুষটাকে আমি কতবার বলেছি–ইবু সালোমান তার স্বর্ণমুদ্রার ভাণ্ডার সম্বন্ধে একটি কথাও আমাকে বলেননি। সেটা ও বিশ্বাসই করতে চাইল না। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম ইবু সালোমনের শেষ কবিতাটা লুকিয়ে রাখার জন্যে। কিন্তু অতটুকু কয়েদঘরে কোথায় লুকোব। সব পোশাক কেটেকুটে খোলার সময় কাগজটা মেঝেয় পড়ে গেল। ঘামে জলে লেখাগুলো প্রায় মুছে গেছে তখন। ওটা এক লাফে তুলে নিয়ে ও পড়ল। মুখ বেঁকিয়ে বলল–ও! উদ্ভট পাগলের প্রলাপ। এ পড়ে কী হবে?
কবিতা ওরকমই হয়। আমি মৃদুস্বরে বলেছিলাম।
জাহান্নামে যাক সব। কথাটা বলে ও কবিতা লেখা কাগজটা একটা টানে দু ফালি A করে ফেলল। হাত বাড়িয়ে বললাম ঐ পাগলের প্রলাপটা একেবারে ছিঁড়ে ফেল না। আমাকে দাও। ও কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলল। কী যে দুঃখ হল আমার, কী বলবো!
কবিতাটা মনে আছে আপনার? ফ্রান্সিস সাগ্রহে জিগ্যেস করল।
–আমিই তো লিখেছিলাম। কতবার পড়েছি। আলফানসো বলল।
–মারিয়া। কাগজ কলম বের করো। লিখে ফেলো তো। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া ওর চামড়ার সুদৃশ্য ব্যাগ থেকে কাগজ আর পাখার কলম বের করে তৈরি হল। আলফানসো আস্তে আস্তে বলতে লাগলো–
চির উদাসীন লোভাত বয়ে চলেছে।
কোথাও প্রচণ্ড ঘূর্ণির আবর্ত।
হিংসা দ্বেষ স্বর্ণতৃষা।
হানাহানি রক্তপাত অমোঘ মৃত্যু।
জেনো অতল তলে।
গভীর অবঞ্চল প্রশান্তির সম্পদ।
যারা আজীবন কাঁদে
একটু শান্তির জন্যে
তাদের সেই প্রশান্তির সম্পদ।
বিলিয়ে দাও।
সার্থক হোক তোমার মনুষ্যজীবন।
লেখা শেষ হলে ফ্রান্সিস কাগজটা হ্যারিকে দিল। হ্যারি কয়েকবার পড়ে বলল—
