শান্ত সমুদ্রের বুকের ওপর দিয়ে জাহাজ চললো। দাঁড়ঘরে যারা দাঁড় বাইছিল, তারা বাদে প্রায় সবাই ডেকঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। ফ্রান্সিস আর হ্যারির চোখে ঘুম নেই। ওরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথাবার্তা বলতে লাগলো। ফ্রান্সিস বললো–হ্যারি, আমাদের প্রথমেই খুঁজে বের করতে হবে মরিটাস দ্বীপটা কোথায়।
–আন্দাজে কোথায় খুঁজে বেড়াবে?
–আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ঐ দ্বীপে আছে পশ্চিম আফ্রিকার কাছাকাছি কোথাও, আর চাঁদের দ্বীপ থেকে বেশি দূরে নয়।
–কি করে বুঝলে?
–চাঁদের দ্বীপের রাজপুরোহিত যখন ওখানে মাঝে-মাঝে যেতো, তখন নিশ্চয় মরিটাস দ্বীপ চাঁদের দ্বীপেরই কাছাকাছি কোথাও আছে।
–তুমি কি মরিটাস দ্বীপে বসির আয়নাওয়ালাকে খুঁজবে?
–হ্যাঁ খুঁজে বের করতেই হবে। ওর কাছ থেকে আয়না তৈরি করিয়ে নিতে হবে। নইলে মুক্তোর সমুদ্র থেকে মুক্তো তোলা যাবে না।
–কিন্তু বসির আয়নাওয়ালাকে কি করে খুঁজে বের করবে?
–কত বড় আর হবে মরিটাস দ্বীপ। নিশ্চয়ই খুঁজে বের করতে পারবো। কথা বলতে বলতে ভোর হলো, রাত্রি জাগরণে ক্লান্ত ওরা ঘুমিয়ে পড়লো।
***
জাহাজ চলেছে। মাঝখানে এক সামুদ্রিক ঝড়ে ওদের জাহাজের দু’টো পাল ছিড়লো, হালেরও ক্ষতি হলো। ভূমধ্যসাগরের আশেপাশে বন্দরে জাহাজটাকে নোঙর করা হলো। পাল-হাল সারাই করা হলো। এসময়ে ফ্রান্সিস দেশী-বিদেশী জাহাজী নাবিকদের সঙ্গে গায়ে পড়ে ভাব জমাতে লাগলো। একটু কথাবার্তার পরেই ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করে, মরিটাস দ্বীপটা কোথায় বলতে পারেন? সকলেই মাথা নাড়ে–উঁহু জানি না, নামই শুনিনি কখনো। শুধু একজন বৃদ্ধ নাবিক বলেছিল–নাম শুনেছি, তবে সঠিক কোথায় বলতে পারবো না। ফ্রান্সিসও হাল ছাড়লো না। যাকে পায়, যার সঙ্গে আলাপ হয়, তাকেই জিজ্ঞাসা করে, মরিটাস দ্বীপটা কোথায় জানেন?
কেউ বলতে পারে না। অবশেষে পশ্চিম আফ্রিকার কেরুর বন্দরে ওদের জাহাজ ভিড়লো। তেকরুর বন্দর ফ্রান্সিসদের পরিচিত। এই বন্দর দিয়েই ওরা হীরে আনতে গিয়েছিলো। হীরে এনে এই বন্দর থেকেই ওরা দেশের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলো। তেকরুর বন্দরে পাঁচ-ছ’টা ছোট-বড় বিদেশী জাহাজ নোঙর করা ছিলো। জাহাজ ফাঁকা করে সবনাবিকরাই পারে নেমে এসেছিলো। হাজার হোক মাটির টান। যে ছোট হোটেলটা ওখানে ছিলো, সেখানে তিল ধারণের জায়গা নেই। ভীষণ ভীড় সেখানে। সবাই খাচ্ছে দাচ্ছে, আনন্দে হৈ-হল্লা করছে। ভাইকিংকরাও হোটেলে খাওয়া-দাওয়া, আনন্দে-হুঁল্লোড়ে ৩ মেতে উঠলো। হ্যারি জাহাজ থেকে নামেনি। ওরশরীরটাও ভালো নেই। ফ্রান্সিস হোটেলে কি খেতে-খেতে যাকে সামনে পেলো, তাকেই মরিটাস দ্বীপের কথা জিজ্ঞেস করলো। সকলেই বললো, তারা জানে না। একজন বললো দক্ষিণদিকে কোথায় শুনেছি।
হোটেলের ভেতরের হৈ-হট্টগোল আর ভালো লাগছিলো না।
ও বাইরে চলে এলো। দেখলো, হোটেলের কয়েকটা লোক রসুইঘরের কাছে কাকে মারছে। লোকটা চীৎকার করে কাঁদছে, আর ছেড়ে দেবার জন্যে কাকুতি-মিনতি করছে। ফ্রান্সিস জটলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। নির্দয়ভাবে মার খাচ্ছে লোকটা। ওর সহ্য হ’লো না। লোকগুলোকে দু’হাতে সরিয়ে দিল ও। দেখলো লোকটা এমন মার খেয়েছে, যে উঠে দাঁড়াতে পারছে না। ও হোটেলে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে? লোকগুলোর মধ্যে থেকে একজন মোটামতো লোক এগিয়ে এসে বলল–এটা চোর। প্রায় মাসখানেক হ’ল সুযোগ পেলেই রসুইঘরে ঢুকে খাবার চুরি করে খায়। এর আগেও মার খেয়েছে। কিন্তু স্বভাব যায় নি। আজকে তাই ধরে আচ্ছামত দিলাম। আর কোনোদিন এদিকে আসবে না।
ফ্রান্সিস নীচু হয়ে লোকটাকে তুলে দাঁড় করালো। তারপর ওকে ভীড় থেকে সরিয়ে নিয়ে আসবার সময় কিছুমুদ্রা মোটালোকটাকে হাতে গুঁজেদিলো। ওরা যে যার কাজে চলে গেলো।
ফ্রান্সিস লোকটাকে নিয়ে জাহাজঘাটার কাছে এলো। এখানে একটা আলো জ্বলছিল। সেই আলোতে দেখলো লোকটাকে। বৃদ্ধই বলা যায়। হয়তো না খেয়ে থাকার জন্যেই লোকটাকে আরো শীর্ণ লাগছে দেখতে। ফ্রান্সিস ওর হাতে কয়েকটা পর্তুগীজ মুদ্রা দিলো। তারপর বললো তোমার নাম কি?
–চুকো। লোকটা বুকে-পিঠে হাত বুলোতে-বুলোতে বললো।
–তুমি চুরি করো কেন?
–কি করবো? বয়স হয়েছে। জাহাজের ঐ অত খাটুনির কাজ করে পেরে উঠি না। তাই দিন কুড়ি আগে যে জাহাজে কাজ করতাম, তার ক্যাপ্টেন আমাকে এখানে ফেলে জাহাজ নিয়ে চলে গেছে। চুরি করে খেতে পেয়েছি বলেই এখনো বেঁচে আছি, নইলে কবে মরে ভূত হয়ে যেতাম। চুকো ভাঙা-ভাঙা গলায় বলল।
–হুঁ। ফ্রান্সিস একটু ভাবলো। মরিটাস দ্বীপের কথা একে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। সেই একই উত্তর শুনতে হবে–জানি না।
তবু জিজ্ঞেস করলো এ দিকটায় তুমি কতবার এসেছে।
–অনেকবার।
–চাঁদের দ্বীপ, ডাইনীর দ্বীপ চোনো এসব।
–ভালো করেই চিনি।
–চাঁদের দ্বীপে কারা থাকে?
–যারা থাকে, ওদের বলে ভাজিম্বা।
ফ্রান্সিস বেশ অবাক হলো। একটু আশান্বিত হয়ে ও জিজ্ঞেস করলো–মরিটাস দ্বীপ চেনো?
–চিনি বৈকি।
–ফ্রান্সিস চমকে উঠলো। লোকটা বলে কি। তবু একটু যাচাই করে নিতে হয়। বললো–মরিটাস দ্বীপটা কোথায় জানো?
–চাঁদের দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বে। ফ্রান্সিস যে হাতে স্বর্গ পেল। তাহলে তো একে ছাড়া হবে না। জিজ্ঞেস করল–ঐ দ্বীপে তুমি কখনো গেছো?
