–ফ্রান্সিস ওঁকে বিশ্রাম করতে দাও। ঘুমিয়ে পড়ুক। মারিয়া একটু ভয়-মেশানো সুরে বলল।
আলফানসো মৃদু হেসে হাত তুলে অভয় দিল। তারপর বলতে লাগল–সেই রাতে সরাইখানার শুয়ে খুব গভীরভাবে ভাবতে লাগলাম সেই কবির কথাগুলো। তারপর প্রায় শেষ রাতে স্থির করলাম–আর বিদেশে-বিভুঁইয়ে নয়। দেশে এই সিনহো বন্দর নগরে ফিরে এলাম। দেখলাম–স্বদেশের চেহারা পাল্টে গেছে। দুর্ধর্ষ মুরজাতি স্বদেশের অনেক অংশ দখল করে নিয়েছে। এখানেও যিনি শাসক তিনিও মুর। ইবু সালোমান। দুর্ধর্ষ সাহসী যোদ্ধা ওরা। তবে মুররা ছিল পরধর্ম-অসহিঞ্চু। দোষ কী দেব বলো? জীবনকে যে যেমনভাবে দেখে। কিন্তু আশ্চর্য কি জান এই ইবু সালোমান একেবারে অন্য ধাতুতে তৈরি। নিজের ধর্মের প্রতি যেমন পরধর্মের প্রতিও তেমনি শ্রদ্ধা। শুধু তাই নয়–নিজে যথার্থ কবি। মুওয়া মু মুহাম মানে আরবী ভাষায় মুখে মুখে কবিতা বানিয়ে বলা মানে
–হ্যাঁ। জানি–জিগেল। সুর করে বলা হয়। হ্যারি বলল।
–তোমরা জান? আলফানসো একটু আশ্চর্য হল।
–হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই প্রকৃতির এক মুর শাসকের পরিচয় আমরাও পেয়েছি। ফ্রান্সিস বলল।
–সত্য অদ্ভুত মানুষ এই ইবু সালোমান। তার কথা বলে শেষ করতে পারব না। যাক-কী করে তার সংস্পর্শে এলাম, কী করে তার অভিন্নহৃদয় বন্ধু হয়ে গেলাম সে অনেক কথা। বিরাট তাঁর বাড়ির একটি ঘর নির্দিষ্টই ছিল। জিগেলের আসর বসত সেখানে। সেই ঘরের পাশেই একটি শয়নকক্ষের পালঙ্কে তিনি মাঝে মাঝেই আমাকে ডাকতেন। কত রাত আমরা কাব্যর্চচা করেছি। আরবী ভাষা জানাই ছিল। ভাষা শিক্ষার সূত্র আমার আয়ত্তে ছিল। অল্প দিনের মধ্যেই আমি আমার পুরোনো কবিতাগুলি আরবী ভাষায় অনুবাদ করে তাকে শোনাতে লাগলাম। তিনি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেন। আমি তো খোদ কবিতার দেশেই সুনাম অর্জন করেছিলাম। কাজেই আমার কবিতার গভীরতা তিনি সহজেই বুঝতেন। আলফানসো থামল। তারপর বলতে লাগল তিনি কিন্তু আরবীয় ধনী বণিকদের সঙ্গে ব্যবসা সূত্রেও জড়িয়ে পড়েছিলেন। আর প্রচুর কুফি বা আরবীয় স্বর্ণমুদ্রা জমিয়েছিলাম। সব রাখতেন একটা সোনার গিকিরা লম্বাটে সিন্দুকে। আমি সেটা দেখেছিলাম। তাঁর কড়া হুকুম ছিল কেউ যেন সেটা স্পর্শ না করে। কিন্তু সেই সিন্দুক ভর্তি স্বর্ণমুদ্রাই তার কাল হল। জ্যেষ্ঠ পুত্র ইবু গ্যাব্রিওল ছিল পিতার ঠিক উল্টো প্রকৃতির। দুর্বিনীত, হিংস্র প্রকৃতির, চূড়ান্ত স্বার্থপর। কিছু অসৎ বন্ধুর পাল্লায় পড়ে হয়ে উঠেছিল অত্যাচারী নিষ্ঠুর। মাঝে মাঝেই ও অসৎ সঙ্গীদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে মজা করতে যেত। কোনও কারণে রেগে গেলে প্রজাদের বাড়িঘর, ক্ষেত-খামারে আগুন লাগিয়ে দিত। এই জায়গায় ইবু সলোমন ছিলেন ভীষণ দুর্বল। পুত্রস্নেহে অন্ধ। কারণ, ঐ একটি মাত্র সন্তানই তার বেঁচেছিল। অসৎ বন্ধুদের পরামর্শে সে ক্রমে ক্রমে যোদ্ধাদের প্রচুর অর্থের বিনিময়ে নিজের কজায় নিয়ে এল। তবু নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। কারণ, যোদ্ধারা জানত ইবু সালোমনকে প্রজারা দেবতার মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। তাদের বাগ মানানো খুব কঠিন। বন্ধুরা পরামর্শ দিল–পিতাকে চিরদিনের মতো সরিয়ে দিতে না পারলে শাসকের আসন পাওয়া যাবে না। ইবু সালোমন সবই জেনেছিলেন। এক রাতে মাত্র কয়েকজন বিশ্বস্ত বলশালী প্রহরীকে নিয়ে যে কোথায় চলে গেলেন কেউ জানতেই পারল না। জানল কয়েকদিন পরে ফিরে না আসার জন্যে। তিনি ফিরেছিলেন একা। বিশ্বস্ত প্রহরীর কথা জিগ্যেস করাতে তিনি বলেছিলেন–তারা প্রচুর অর্থ নিয়ে স্পেনে চলে গেছে। তার হঠাৎ অন্তর্ধানের পরেই জানা গেল পালঙ্কের নীচে রাখা স্বর্ণমুদ্রা বোঝাই সেই সিন্দুটাও উধাও। কিন্তু সিন্দুকটা নিয়ে কেউ কিছু জিগ্যেস করতে সাহস করল না। এমনকি প্রধান পরামর্শদাতাও না। আলফানসো থামল। ফ্রান্সিস বেশ আয়েসি ভঙ্গি তে বসে শুনছিল। এবার দ্রুত উঠে বসল। হ্যারি তাই দেখে সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত বলে উঠল–ঠিক আছে। এখন থাক। আপনি বিশ্রাম করুন। পরে শুনব সব। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে হ্যারির দিকে তাকিয়ে বলল হ্যারি একমাত্র তুমিই আমার চিন্তাভাবনা, মনোভাব সঠিক বুঝতে পার। মারিয়াও বুঝতে ভুল করে। যাক গে–আলফানসো, আপনি আরামে ঘুমিয়ে পড়ন। পরে আমার কিছু জানার আছে।
আলফানসো এতক্ষণ একটানা কথা বলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আর কোনও কথা না বলে পাশ ফিরে ঘুমের উদ্যোগে করল।
পরের সারাদিন এ বিষয়ে আর কথা হল না। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর আবার সবাই বসল।
এবার আপনার কথা সংক্ষেপে বলুন। ফ্রান্সিস বলল।
–ইবু সালোমন কবি ছিলেন সত্যি। সেই সঙ্গে অত্যন্ত বুদ্ধিমানও ছিলেন। কে কেমন মানুষ, কী তার উদ্দেশ্য, বিশ্বাসযোগ্য কিনা সহজেই বুঝি নিতেন। একমাত্র পুত্র যে অত স্বর্ণমুদ্রার ভাণ্ডার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সহ্য করবে না সেটা তিনি খুবই সহজেই বুঝে ফেলেছিলেন। কিন্তু ঐ যে বললাম অন্ধ পুত্রস্নেহ। তিনি কাউকে কিছু বললেন না। ছেলেকে তো নয়ই। নিঃশব্দে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। সেই সময়ে যে জিগেলগুলো রচনা করেছিলেন তা মৃত্যুর জন্যে প্রতীক্ষারত নির্ভীক এক মানুষের মর্মকথা। অপূর্ব জিগেল সে সব। কথাগুলো বলার সময় আলফানুসোর গলা কান্নার বুজে এল। বলতে লাগলেন-সেই রাতটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। সেই শয়নকক্ষে অনেক রাত অব্দি পরস্পরকে জিগেল শোনাচ্ছিলাম। রাত গভীর হল। দুজনেই বিশ্রাম নিলাম। ওঁর একটাই পছন্দের জিনিস ছিল–ক্লান্তিবোধ হলে একটা সুদৃশ্য কাঁচের বড় লম্বাটে নলওয়ালা পাত্রে আঙুরের রস রাখতেন। সেখান থেকে নিজেই পাশে রাখা একটা গ্লাসে ঢেলে খেতেন। আমাকেও দিতেন। সেই ঘরে অন্য কারো প্রবেশের অধিকার ছিল না। একে যদি বিলাসিতা বল তো বলতে পার। কিন্তু আলবোলার নল মুখে তামাক খেতে তাকে কোনোদিন দেখিনি। যাক গে– হঠাৎ তিনি গ্লাসে অর্ধেকটা নিয়ে তাড়াতাড়ি রেখে দিলেন। ফিসফিস করে বললেন–কোন রকম শব্দ শুনলেন? শব্দটা আমিও শুনেছিলাম। গভীর রাতের স্তব্ধতায় এরকম শব্দ শোনা যায়। উনি বলে উঠলেন–একটা জিগেল বলছি। লিখে ফেলুন তো। সুন্দর চামড়া মেশানো কাগজ ওখানে বরাবরই থাকত। বাজপাখির পাখা থেকে তৈরি কলমও। আমিও গ্লাস রেখে লিখতে লাগলাম। এক পংক্তি লিখেই বুঝলাম এটা তার পূর্বেই ভেবে নেওয়া কবিতা। আমি দ্রুত লিখতে লাগলাম। তাড়াতাড়িই শেষ হল কবিতাটা। উনি ম্লান হেসে বললেন, এটাই আমার শেষ কবিতা। জিগেল না কিন্তু। আমার সব লেখা কবিতা আপনি রেখে দিয়েছেন?
