দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। হ্যারিকে নিয়ে ফ্রান্সিস নিজেদের কেবিন ঘরে এল। দেখল সেই বৃদ্ধটি বিছানার একপাশে বসে আস্তে আস্তে খাচ্ছে। সামনে মারিয়া দাঁড়িয়ে থেকে বৃদ্ধের খাওয়া দেখাশুনো করবে। বৃদ্ধের পরনে নতুন পোশাক। বোঝ যাচ্ছে সযত্নে বৃদ্ধকে স্নান করানো হয়েছে। মাথার পাকা চুলও অনেকটা বিন্যস্ত। ফ্রান্সিসরা ঢুকতে বৃদ্ধ তৃপ্তির হাসি হেসে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিসও হেসে বলল–কী? এখন ভালো লাগছে তো? পোর্তুগীজ ভাষাতেই জিগ্যেস করল।
বৃদ্ধ কোনও কথা না বলে মাথা কাত করল। তারপর আস্তে আস্তে খেতে লাগল। ফ্রান্সিস বুঝল বৃদ্ধ পোর্তুগীজ। ও বলল–আপনার নাম কী?
–আলফানসো। খাওয়া থামিয়ে বৃদ্ধ মৃদুস্বরে বলল।
–আপনি পোর্তুগীজ?
–হ্যাঁ, দক্ষিণ পোর্তুগালে সমুদ্রের ধারে একটা গ্রামে আমার জন্ম।
–তবে এখানে এলেন কেন?
বৃদ্ধ ফোকলামুখে হেসে বলল–আমি আপনাদের দেশে স্ক্যান্ডানেভিয়াতেও গেছি। আপনাদের দেশের ভাষা, শুধু বুঝিই না বলতেও পারি। ফরাসি জার্মান আরবী ফার্সি মিলিয়ে পাঁচ-ছটা ভাষা আমি আমার মাতৃভাষার মতোই বলতে পারি।
ফ্রান্সিস অবাক হয়ে হ্যারির দিকে তাকাল। হ্যারিও অবাক। বলল এত দেশ ঘুরেছেন কেন?
–জ্ঞানসংগ্রহের জন্যে। একটা সত্য জেনেছি প্রত্যেক জাতিই তার মাতৃভাষাকে নিজের মায়ের মতো ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে।
ফ্রান্সিস বলল–আপনার এই অবস্থা দেখে বুঝতেই পারছি বেশ অত্যাচার হয়েছে আপনার ওপর। দেশ-দেশান্তরে গেছেন, ঘুরেছেন। শরীরটা আপনার তাই ভেঙেও পড়েছে। আপনার কাছে সবকিছু জানতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে আমাদের। কিন্তু এখন নয়। খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে নিন। রাতের খাওয়ার পরে আপনার সঙ্গে আমরা কথা বলব। ততক্ষণে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করুন। ওদিকে বাকি সাত শ্বেতাঙ্গ ক্রীতদাসদের জন্য একই ব্যবস্থা হল।
রাতের খাওয়া শেষ হল। ফ্রান্সিসরা নিজেদের ঘরে এসে বসল। আলফানসোকে অনেক তরতাজা মনে হল।
–আপনি এখন ভালো আছেন তো? ফ্রান্সিস একপাশে বসে আলফানসোকে জিজ্ঞেস করল। আলফানসো হেসে মাথা কাত করল। তারপর বলল-শুনলাম তোমরা ভাইকিং। তোমার নাম ফ্রান্সিস। অনেক গুপ্তধন নাকি বুদ্ধি খাটিয়ে খুঁজে বের করেছ।
-ওসব থাক। আপনার কথা বলুন। ফ্রান্সিস বলল।
–সে তো এক ইতিহাস। গপপো লেখা যায়। তবে সব সত্যি, গপপো না। থেমে বলল-শোনো তোমাদের বিরকা নগরেও আমি কিছুদিন ছিলাম। একটা সত্যিই আমি বুঝেছি তোমরা দুঃসাহসী বীরের জাত। অন্যায় তোমরা সহ্য কর না।
–আবার জলদস্যু হিসেবে আমাদের দুর্নামও আছে। হ্যারি হেসে বলল।
–হ্যাঁ তাও শুনেছি। দেখো, সবাই যদি নীতিবাদী সত্যবাদী হত, সব মানুষকে ভালোবাসতে পারত তাহলে তো স্বৰ্গই হত এই পৃথিবী। যাক গে–সে সব কথা। অতি সংক্ষেপে প্রথম থেকেই বলি। একটু ধৈর্য ধরে শুনতে হবে যে। ফোকলা মুখে হেসে আলফানসো বলল।
–নিশ্চয়ই শুনব। আপনি জ্ঞানীগুণী মানুষ এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তাই এমন একজন মানুষের এইরকম দুরবস্থা হল কেন সেটাই বুঝতে চাইছি। ফ্রান্সিস বলল।
ছোটবেলা কেটেছে দক্ষিণ বন্দর এলাকায়। অভাবী ঘরের সন্তান। দুবেলা খেতেই পেতাম না। পড়াশুনা করার কথা তো স্বপ্নেও ভাবতাম না। দিনরাতের অনেকটা সময় সমুদ্রতীরেই কাটাতাম। আর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম সীমাহীন সমুদ্রের দিকে। কত কথা ভাবতাম। সমুদ্রের সঙ্গে সেই আমার বন্ধুত্বের শুরু। সবে যুবক তখন। এক মালবাহী জাহাজে এক আবছা অন্ধকার সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়লাম। নামেই নাবিক। ডেক মোছা থেকে শুরু করে রান্নার সাহায্য করা সবই করতে হত। স্পেনের এক বন্দরে একরাতে নেমে পড়লাম। কাজ করে যে অর্থ রোজগার করেছিলাম তাই নিয়ে এক সস্তা সরাইখানায় আশ্রয় নিলাম। থেমে একটু দম নিল আলফানসো।
ঠিক আছে। এখন ঘুমোন। পরে না হয়–হ্যারি বলল।
আলফানসো মৃদু হেসে ওর পাকা চুলভর্তি মাথা নাড়ল। বলল–দেখো, স্মৃতি– তা যত সুখেরই হোক বা যত দুঃখের, যত বেদনারই হোক–অনেকটা কবিতা বা গানের মতো মনে করতে বসলে ডুবে যেতে হয়। বলতে ভালো লাগে। নিজেকে যেন নতুন করে বার বার চেনা যায়। যা হোক-একটা দুঃখ কিন্তু ছোটোবেলা থেকেই আমার ছিল। অভাব দারিদ্র্য নয়–অশিক্ষার নিরক্ষরতার দুঃখ। এই দুঃখ দূর করব শিক্ষিত হব এই সংকল্পটা আমার বরাবরই ছিল। তাই যেখানে গেছি, সেই দেশের ভাষা তো বটেই, সাহিত্য, ইতিহাস জানার সুযোগ নিয়েছি। সেই দেশে পৌঁছেই। খোঁজ করেছি শিক্ষার জায়গার। অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা নেব সে সাধ্য তোতা ছিল না।
শিক্ষাদানের স্থানে কাকুতি-মিনতি করে শিক্ষার্থীদের সবার পেছনে জায়গা জুটিয়েছি। আশ্চর্য কি জান তারা কিন্তু কেউ আমাকে বিমুখ করেননি। উপোসী থেকেও সেসব জায়গায় গেছি। পাঠ শুনেছি। কোনও কোনও রাত কোনও কোনও দিন আমার অনাহারে কেটেছে। একটা সত্য আমি জীবন দিয়ে বুঝেছি–যদি সতোর সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণের জ্ঞান সংগ্রহের চেষ্টা কর–কোনও বাধাই বাধা নয়। কথাটা বলে আলফানসো পোশাকের হাতা দিয়ে চোখ মুছল। ফ্রান্সিসরা কেউ কোনও কথা বলল না।
–যাক ওসব কথা। সবশেষে উত্তরের অত ঠান্ডা সহ্য করতে পারলাম না। চেয়ে চিন্তে ছেঁড়া পোশাক পরে থাকা–বেশ অসুস্থ হয়ে ফিরে এলাম ফরাসিদের দেশে। জান তো ফরাসিরা ভীষণ কবিতা ভালোবাসে। কত জায়গায় কবিতার আসর বসে। সময় পেলে শরীর সুস্থ থাকলে সেইসব আসরে যেতাম। মানুষ, পোশাক নিয়ে ওখানে কারো কোনও কৌতূহল নেই। কিছুদিনের মধ্যে ফরাসি ভাষা আয়ত্ত করে ফেললাম। এবার আমার বিচিত্র অভিজ্ঞতা কাজে লাগালাম। সমুদ্র আজও আমার কাছে বিস্ময়। প্রকৃতির বিচিত্র রূপও দেশে দেশে দেখেছি। কবিতা লিখতে লাগলাম। কিছু কিছু আসরে কবিতা পাঠও করতে লাগলাম। আমার মাতৃ ভাষা ফরাসি নয়। কাজেই অনেক কবির সঙ্গে এইজন্যেই আমার বন্ধুত্ব হল। এবার অভিজাত শ্রেণীর আসরেও আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হল। অর্থ ও খাদ্য যথেষ্ট পেলাম। আমি যেন নতুন জীবন পেলাম। এমনি এক আসরে পরিচয় হল এক বিখ্যাত কবির সঙ্গে। তিনি অযাচিতভাবে আমার কবিতার খুব প্রশংসা করলেন। কয়েকদিন মেলামেশার পর বললেন–আপনি বিদেশি। কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভালোবেশে শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিতা লিখেছেন। জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তাই আপনি নতুন একটা ধারা আনতে পেরেছেন। এটা কম কথা নয়। তবু আমি অনুরোধ করছি–দেশে ফিরে যান। নিজের মাতৃভাষায় কাব্যসাহিত্য রচনা করে স্বদেশের ভাষাকে সমৃদ্ধ করুন। একেই বলে মাতৃঋণ শোধ করা। আন্তরিক চেষ্টা করুন। আলফানসো থামল। কয়েবার জোরে শ্বাস নিল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
