সিঁড়িতে নীচে কে পড়ে আছে? হ্যারি জিগ্যেস করল।
–এই জাহাজের দলপতি। ওর সঙ্গীদের অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছ। কথাটা বলে ফ্রান্সিস গায়ে লাগা ছোট জাহাজের সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বলল–সবার আগে একটা কাজ করতে হবে। তোদের জাহাজে নিশ্চয়ই কিছু শ্বেতাঙ্গকে ক্রীতদাস হিসেবে আরবীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করবি বলে বন্দী করে রেখেছিস। এক্ষুনি সবাইকে আমাদের জাহাজে তুলে দে। তোদের দলপতি আর সঙ্গীদের তখন তোদের জাহাজে তুলে দেব। তার আগে নয়।
সঙ্গীরা দলপতিকে না দেখে আর সঙ্গীদের ঐ অবস্থা দেখে বুঝেছিল একটা কিছু, হয়েছে। দু’তিনজন তরোয়াল ফেলে দিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে সাতজন শ্বেতাঙ্গ বন্দীকে ডেক-এ নিয়ে এল। শতচ্ছিন্ন পোশাক। মাথার চুলে জট পাকানো। তবে সুস্থ সবাই। ক্রীতদাসের ব্যবসাতে সুস্থদেহী যুবকই বেশি দাম দিয়ে কেনা হয়। শেষের জনকে দু তিনজন সঙ্গী ধরে ধরে নিয়ে এল। বয়স্ক। মাথার চুল দাড়ি গোঁফ সাদা। বেশ দুর্বলও। পরনে শতচ্ছিন্ন পোর্তুগীজ পোশাক। হ্যারি বলে উঠল-আশ্চর্য। এই বৃদ্ধকে তো একটা রুপোর মুদ্রা দিয়েও কেউ কিনবে না। একে বন্দী করে রেখেছিস কেন?
–নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। ফ্রান্সিস বলল। সুস্থরা সবাই সহজেই দুলনির মধ্যেও ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠে এল। কিন্তু বৃদ্ধকে কাঁধে চাপিয়ে সঙ্গীরা আর কয়েকজন ভাইকিং মিলে এই জাহাজে নিয়ে এল।
–এর পরেও এই জঘন্য ব্যবসায়ীদের বাঁচিয়ে রাখা উচিত? ফ্রান্সিস দাঁত চাপাস্বরে বলে উঠল। হ্যারি শান্তস্বরে বলল–ফ্রান্সিস, ভুলে যেও না এরা সভ্যদেশের মানুষ। সভ্যজগতেই ওরা মানুষ হয়েছে। কাজই সভ্যভদ্র নীতিবাদী মানুষদের তো ওরা দেখেছে। দেখো না এদের সভ্য, সৎ ও ভদ্র জীবন কাটাবার জন্যে একটা সুযোগ দিয়ে। ভুল বুঝতে পেরে অন্যায় অমানবিক কাজ ছেড়ে হয়তো ভালো হতে পারে। যারা পারবে না তারা উচ্ছন্নে যাক।
ঠিক আছে। তোমার কথাই মেনে নিলাম। সেই বৃদ্ধকে তখন শাঙ্কোরা ধরে ধরে সিঁড়িঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ঐ বৃদ্ধকে আমার কেবিন ঘরে নিয়ে যাও। ওকে প্রথমে ভালো করে স্নান করাবে। নতুন পোশাক পরাবে। ভেনকে ডেকে আনবে। ভেন যেমন বলে করবে। তারপর ওকে মারিয়ার জিম্মায় রেখে চলে আসবে। শাঙ্কোরা বৃদ্ধকে কাঁধে নিয়ে সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। মারিয়াও ওদের পেছনে পেছনে চলল। এবার ফ্রান্সিস সুস্থ দুই সঙ্গীকে বলল–তোমরা সিঁড়ির নীচে যাও। তোমাদের সর্দারের জ্ঞান ফিরুক বা না ফিরুক তুলে নিয়ে ডেক-এ এসো।
ওরা দুজনেই ছুটল সিঁড়িঘরের দিকে। একটু পরেই ওরা অনেক কষ্টে দলপতিকে এনে ডেক-এ শুইয়ে দিল। দলপতির তখন জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু নড়াচড়া নেই। কোনোরকমে চোখ খুলে পিটপিট করল। মুখ দিয়ে শব্দও করতে পারছিল না। আহত সঙ্গীরা ডেক-এর এক পাশে শুয়ে-বসে ছিল। অল্পস্বল্প কাতরাচ্ছে নয়তো গোঙাচ্ছে। ওদের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–সবাই যেভাবে পারো তোমাদের জাহাজে গিয়ে ওঠো। তারপর ডেক-এ সবাই এসে দাঁড়াবে।
–ওরা একা একা গিয়ে জাহাজে উঠতে গেলে বেলা হয়ে যাবে। তার চেয়ে আমরা একটু সাহায্য করলে ওদের তাড়াতাড়ি বিদেয় করতে পারব। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল।
হ্যারি বিনোলাকে ডেকে ঐ আহতদের ওদের জাহাজে উঠতে সাহায্য করতে বলল। সুস্থ দুই সঙ্গী আর কয়েকজন ভাইকিং বন্ধুকে নিয়ে বিনোলা ওদের অনেক কষ্টে ঐ দুলুনির মধ্যে ওদের জাহাজে তুলে দিল। দলপতিকে ওরা তখন কেবিন ঘরে নামিয়ে নিয়ে গেলে বাকিরা এসে ওদের ডেক-এ সার দিয়ে দাঁড়াল। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে না পরে বসে পড়ল।
ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে গলা চড়িয়ে বলতে শুরু করল–ভালো করে শোনো। আমরা তোমাদের চেয়ে সংখ্যা বেশি। তোমাদের সবকটাকে নিকেশ করার ক্ষমতা আমাদের আছে। যারা আহত হবে তাদের ছুঁড়ে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া এমন কিছু কঠিন নয়। ক্ষুর্ধাত হাঙরের পাল তাহলে খুশিতে লাফালাফি করবে। কিন্তু আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধুর অনুরোধে তোমাদের মুক্তি দিলাম। ফ্রান্সিস থামল। দলপতির সঙ্গীরা ততক্ষণে ফ্রান্সিসের ক্রুদ্ধ মূর্তি দেখে বুঝে গেছে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেল ওরা। ফ্রান্সিস আবার বলতে লাগল–কিন্তু একটা শর্ত আছে। কেউ আর দাস-ব্যবসার মতো জঘন্য কাজে জড়াবে না। সোজা তোমাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাবে। যারা আবার এখান থেকে ডেরা বৈধে ঐ ব্যবসায় সাহায্য করবে তারা নরকে। যাক। ব্যস্-আর কিছু বলার নেই। এক্ষুনি জাহাজ ছেড়ে দাও। এক্ষুনি–যাও।
সঙ্গীদের মধ্যে নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে যাবার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। রাতের আবছা অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নিঃশব্দে যে কাছিটা ওরা ফ্রান্সিসদের জাহাজের কাছির সঙ্গে বেঁধেছিল, শাঙ্কো ছুটে গিয়ে সেই কাছিটা তরোয়াল দিয়ে কয়েকবার পেঁচিয়ে কেটে ফেলল। ওদের জাহাজটা যেন জোরে ধাক্কা খেয়ে দুলতে দুলতে বেশ দূরে চলে গেল। তিনটে পাল নামানো ছিল। দ্রুত সেই তিনটে পাল খুলে দিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই দস্যু ও দাস-ব্যবসায়ীদের জাহাজ অনেক দূরে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিস্তৃত প সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
