একটু পরেই মারিয়া মোমবাতি জ্বেলে নিয়ে এল। মোমবাতিটা বিনোলা হাতে নিয়ে তুলে ধরল। মোমবাতির আলোয় দেখা গেল, সামনেই চিৎ হয়ে পড়ে আছে, দলপতি। পরনে দামি পোশাক ও কোমরের চওড়া চামড়ার কোমরবন্ধনী সোনার কাজ করা। নাক-চোখ মুখ রক্তে মাখামাখি। ফ্রান্সিস সেদিকে তাকিয়ে থেকে বলল বিনোলা এটাই গুণ্ডা দলের সর্দার, তাই না?
–হ্যাঁ, বিনোলা বলল।
–যা দেখছি মাসখানেক বিছানা থেকে উঠতে পারবে না। কিন্তু এই গুণ্ডার দল এখানে এল কী করে?
–একটা ছোটো জাহাজ চড়ে। এরা ফিনল্যাণ্ডের লোক। এখানে উত্তর পোর্তুগা ডেরা বেঁধেছে। নিজেদের সাধারণ ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দেয়। আসলে দাস ব্যবসায়ী। তবে খুব উঁচু দরের। শুধু শ্বেতাঙ্গদের ধরে। তারপরে প্রচুর আরবীয় স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে বড়লোক আরবীয় বণিকদের কাছে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে। বিনোলা বলল।
–ব্বাঃ! তাহলে তো শুধু মুখ-হাত-পা ভাঙলে চলবে না, সবকটাকে নিকেশ করতে হবে। কথাটা বলে ফ্রান্সিস তরোয়াল উঁচিয়ে ধরল।
আহত সঙ্গীরা তখন কেউ ভাঙা পা চেপে ধরে, হাতে কনুই চেপে ধরে উঠে দাঁড়াতে শুরু করল। সকলেই মুখচোখ বিকৃত করে ব্যথাবেদনা সহ্য করছে। মৃদু গোঙাচ্ছেও। যে সঙ্গীটি তরোয়াল ফেলে দিলেছিল সে এবার করুণ স্বরে বলে উঠল–আমাদের মেরো না। সর্দারের নির্দেশেই আমরা এই জঘন্য কাজ করতে বাধ্য হয়েছি।
-ঠিক আছে তোমাদের জাহাজে চলে যাও। কিন্তু প্রতিজ্ঞা করো–বরং উপোস করে মরবো কিন্তু এরকম দস্যুতা আর ক্রীতদাস ব্যবসায়ে জড়াবে না।
দুজনই একসঙ্গে বলে উঠল–আমরা প্রতিজ্ঞা করছি। ফ্রান্সিস আহতদের দিকে তাকিয়ে বলল–সবাই ওপরের ডেক-এ যাও। কেউ নিজেদের জাহাজে গিয়ে উঠতে পারবে না। চলো, আমরাও যাচ্ছি। আহতরা হাত-পা চেপে ব্যাথায় গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল।
ওদিকে ওপরে যে কজন দলপতির সঙ্গী ছিল তারা বিনোলাকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখল। দলপতি আর সঙ্গীদের হুড়মুড় করে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ার জোর শব্দ শুনল। বুঝল ওরা পরস্পর জড়াজড়ি করে গড়িয়ে পড়ল। তারপরই আর্ত চিৎকার। ওরা হকচকিয়ে গেল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। শাঙ্কো এই সুযোগটা কাজে লাগাল। দেশীয় ভাষায় গলা চড়িয়ে বলল– সবাই এদিকে-ওদিকে ছুটোছুটি করতে থাকো। সবাই সারি ভেঙে হালের দিকে, সামনের দিকে, সিঁড়িঘরের দিকে ছুটোছুটি শুরু করল। কিন্তু সব কজনকে সামলাবে কী করে? ওরা অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে পরে হাঁপাতে লাগল। এবার শাঙ্কো আবার গলা চড়িয়ে বলল–ওদের ওপর ঝড়িয়ে পড়ো। তরোয়াল কেড়ে নাও। সঙ্গে সঙ্গে ভাইকিং বন্ধুরা বিদ্যুৎগতিতে ছুটে এসে ক্লান্ত সঙ্গীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এসব লড়াই শাঙ্কোরা অনেক বার লড়েছে। দুজন সঙ্গীর হাতের তরোয়াল ছিটকে গেল। শাঙ্কোরা কয়েকজন ছুটে গিয়ে তরোয়াল দুটো তুলে নিয়ে রুখে দাঁড়াল। সঙ্গীরা এত দ্রুত আক্রমণের আশঙ্কা করেনি। হতবাক হয়ে শাঙ্কোদের দিকে তাকিয়ে রইল। তরোয়াল হাতেই রইল। শাঙ্কো জোর গলায় বলে উঠল–তরোয়াল ফেলে দে। লড়তে এলে কেউ বাঁচবি না। বাকিরা তবু তরোয়াল ফেলল না। তখনই আহত সঙ্গীরা গোঙাতে গোঙাতে ডেক-এ উঠতে লাগল। সবাই উঠে এল। নীচে দলপতির তখনও জ্ঞান ফেরেনি। অসাড় পড়ে আছে।
ততক্ষণে সূর্য উঠেছে। চারদিকে ভোরের নরম রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিস বিনোলা-মারিয়াও এবার ডেক-এ উঠে এল। তিনজনের হাতে তরোয়াল দেখে ফ্রান্সিস তরোয়াল উঁচিয়ে ছুটে এল। ফ্রান্সিদের সেই রুদ্রমূর্তি দেখে ওরা পিছু হটে গেল। শাঙ্কো আর এক বন্ধু তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিসের পেছনে পেছনে ছুটে এস। সঙ্গীরা এবার ভয়ে হাতের তরোয়াল ডেক-এর ওপর ফেলে দিল।
ফ্রান্সিস দলপতির ছোট জাহাজটার কাছে এসে দাঁড়াল। দেখল দলপতির পাঁচ সাতজন সঙ্গী খোলা তরোয়াল হাতে ডেক-এর ওপর সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–তোদের মারাত্মক জখম সঙ্গীদের তো দেখতেই পেলি। তোদের দলপতি অজ্ঞান হয়ে নিচে পড়ে আছে। ওরা ওকে নিয়ে আসছে। তোরা গোপনে ক্রীতদাস ব্যবসা করিস। এই জঘন্য নির্মম কাজের জন্যে তোদের সভ্য সমাজে স্থান নেই। লড়তে এলে সব কটাকে আহত নয়, একেবারে নিকেশ করে, দেব।
ওদিকে দলপতিসহ তার সঙ্গীদের সিঁড়ি দিয়ে ছিটকে গড়িয়ে পড়ার জোর শব্দে অন্য ঘুমন্ত ভাইকিংদের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। হ্যারিও ঘুম ভেঙে লাফিয়ে উঠে। পড়েছিল। তিলমাত্র দেরি না করে অস্ত্রঘরের দিকে ছুটে যেতে যেতে চিৎকার করে বলে উঠল, ভাইসব, তরোয়াল নিয়ে ডেক-এ উঠে আসো। ওরাও উঠে পড়ে দ্রুত অস্ত্রঘরের দিকে যেতে লাগল। তরোয়াল নিয়ে ওরা সিঁড়ির দিকে ছুটল। আবছা আলোয় কেউ দেখল সিঁড়ির নিচে কে কনুই চেপে ভর করে দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। অন্যরকম পোশাক। কেউ দলপতিকে ডিঙিয়ে ছুটল। কেউ ওর কাঁধ, হাত মাড়িয়ে দিয়ে গেল। দলপতি আবার সটান শুয়ে পড়ল। কয়েকজন ওর মুখ বুক মাড়িয়ে দিয়ে ছুটে গেল। দলপতি আবার অজ্ঞান হয়ে গেল।
দু-তিনজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এসে দাঁড়াল। বাকিরা কাছে এসে দাঁড়াল। বাকিরা আহত ও অন্য সঙ্গীদের ঘিরে দাঁড়াল।
