দুদিন পরে সেদিন রাতে আর আসর বসেনি। সবাই কেবিন ঘরে, ডেক-এ হালের কাছে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। জোরে হাওয়ার আরামে ঘুমোচ্ছে সবাই। নজরদার পেড্রোও মাস্তুলের মাথায় ওর ছোট্ট জায়গাটায় গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে।
গভীর রাত তখন। আবছা চাঁদের আলোয় একটা ছোটো জাহাজ বেশ দ্রুত? দুলতে দুলতে এসে ফ্রান্সিসদের জাহাজে ধাক্কা দিয়ে থেমে গেল। দশ-বারো জন য়ুরোপীয় নিঃশব্দে লাফিয়ে লাফিয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠে আসতে লাগল। সকলের হাতেই খোলা তরোয়াল। সমুদ্রে ঢেউয়ের ধাক্কায় জাহাজে দুলুনিতো আছেই। জাহাজটায় গায়ে জোর ধাক্কা লাগলেও ফ্রান্সিসদের কারো ঘুম ভাঙল না। হালের কাছেই ঘুমিয়ে থাকা শাঙ্কোর সামনে একজন তরোয়াল হাতে দ্রুত এসে জোরে তরোয়ালের খোঁচা দিল। শাঙ্কো উঃ শব্দ করেই উঠে বসল। অবাক চোখে দেখল অল্প দাড়িগোঁফওয়ালা একজন য়ুরোপীয় লোক ওর দিকে তাকিয়ে মুখে আঙুল চেপে চুপ করে থাকার ইঙ্গিত করল। লোকটার দশাসই চেহারা। গায়ে য়ুরোপীয় পোশাক। বেশ দামি। মাথায় লালচে লম্বা চুল সমুদ্রের হাওয়ায় এলোমেলো। কোমরে চামড়ার ফেট্টি। জলদস্যু নয় বোঝাই যাচ্ছে। তবে এ কে? ওদিকে বাকি কয়েকজনের গায়ে সাধারণ পোশাক। বোঝাই যাচ্ছে দামি পোশাক পড়া লোকটাই দলপতি। অন্য ভাইকিং বন্ধুদের সঙ্গীরা তরোয়ালের খোঁচা দিয়ে ঘুম ভাঙাচ্ছিল। সবাই উঠে বসতে লাগল।
শাঙ্কো জিগ্যেস করল–তোমরা কারা?
ফিনল্যাণ্ডের অধিবাসী। তোমরা নোর্স। তাই না? লোকটা মৃদুস্বরে বলল। লোকটা ফিনদের ভাষায় বলল। ফিনল্যাণ্ড শাঙ্কোদের দেশ থেকে উত্তরে। খুব একটা দূরে নয়। শাঙ্কো মোটামুটি বুঝল। বলল হ্যাঁ, আমরা ভাইকিং। য়ুরোপে আমরা নোর্স বলেও পরিচিত। কিন্তু হঠাৎ তরোয়াল উঁচিয়ে ভয় দেখাচ্ছ কেন?
পাশেই আমাদের জাহাজ। নিশ্চয়ই আমাদের জাহাজে খাবার জন্যে তোমাদের নিমন্ত্রণ করতে আসিনি। লোকটি দাঁত বের করে হাসল।
–তা তো ওরকম তরোয়ালের খোঁচা খেয়েই বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের জ্বালাতে এলে কেন? শাঙ্কো বলল।
-খুব সহজ। তোমাদের জাহাজে দামি কিছু জিনিস মানে সোনা রূপো হীরে মুক্তো নিশ্চয়ই আছে। জলদস্যু হিসেবে তোমরাও জাহাজ লুঠ কর। আমরা সেসব লুঠ করতে এসেছি। বলে না, চোরের ধন চুরি করা। লোকটা, আবার সেঁতো হাসি হাসল।
-আর কিছু?
–সেটা পরে মানে শ্বেতাঙ্গ লোকদের ধরে বন্দী করে আরবীয় বনিকদের কাছে বিক্রিও করি। আশাতীত স্বর্ণমুদ্রা পাই। আবার সেঁতে হাসি।
শাঙ্কো চুপ করে রইল। নিরস্ত্র অবস্থায় এদের সঙ্গে লড়াই করতে যাওয়া বোকামি। যা বলে শুনে যাও। যা করে দেখে যাও। এরা লুঠেরার দল। ও শুধু। বলল–আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
—এটা উত্তর পোর্তুগাল। কাছেই সিনহো শহর বন্দর। তারই শহরতলিতেই আমরা আস্তানা গেড়েছি। এখানে অনেক জায়গায় আমরা দলবদ্ধভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আস্তানা করেছি।
তাহলে সিনহো বন্দর নগরটা লুঠ করলেই তো ল্যাঠা চুকে যেত।
উঁহু। এই অঞ্চলের শাসক মুর। মুরদের রাজত্ব এখানে। শাসকের নাম ইবু গ্যাব্রিওল। সাংঘাতিক লোক, হিংস্র প্রকৃতির। সব সময় সন্দেহ। অবশ্য আমাদের ব্যবসায়ী বলে জানে। পশুর লোম, চামড়া, হাতে বোনা সুন্দর কাপড়টাপড়, কার্পেট এসব ধনী আরবীয় বণিকদের কাছে কেনা বেচা করি। থাকগে ওসব। তোমরা কতজন জাহাজে আছ? লোকটা জানতে চাইল।
–বেশি না। জনা পাঁচ-ছয়।
–তাহলে তো কেল্লা ফতে। একটু গলা চড়িয়ে সঙ্গীদের বলল–অ্যাই, তোরা পাঁচজন নীচে কেবিন ঘরটাতে তল্লাশি চালা। নিশ্চয়ই এদের লুঠ করা দামি সম্পত্তি পাবি।
দলনেতার কথা শেষ হতেই সিনাত্রা সুরেলা গলায় গেয়ে উঠল–চলো হে বন্ধুরা–পাহাড়ের উপত্যকায় বসন্ত এসেছে–এ-এ। শাঙ্কো সাঙ্গে সঙ্গে কাঠের ডেক-এ জুতো ঠুকে থপ থপ্ নাচ শুরু করে দিল। দলপতি সঙ্গে সঙ্গে থাম, বলে জোরে চেঁচিয়ে উঠেই সিনাত্রার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তরোয়াল চালাল সঙ্গে সঙ্গে। সিনাত্রার কাঁধের কাছে পোশাক কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। তবে খুব বেশি গভীর ক্ষত হল না। কারণ শাঙ্কো দ্রুত এক ধাক্কায় সিনাত্রাকে সরিয়ে দিয়েছিল।
ওদিকে ডেক-এ অনেকের চলাফেরার শব্দে ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুমের মধ্যেও সতর্ক থাকা ফ্রান্সিসদের চিরদিনের অভ্যেস হয়ে গেছে। পরক্ষণেই সিনাত্রার গান আর শাঙ্কোর নাচের শব্দে ফ্রান্সিস দ্রুত বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠল। মারিয়াও ঘুম ভেঙে দেখল ফ্রান্সিস বিছানার তলা থেকে এক ঝটকায় তবোয়ালটা বের করে ফেলেছে।
–কী হল? মারিয়া ভীতস্বরে বলে উঠল। ফ্রান্সিস ঠোঁটে আঙুল রেখে চাপাস্বরে বলে উঠল–ওপরের ডেক-এ নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। নইলে এত গভীর রাতে সিনাত্রা কক্ষনো গান গায় না, শাঙ্কোও নাচ জুড়ে দেয় না। ফ্রান্সিস সিঁড়ির দিকে ছুটল। কিন্তু ওপরে উঠল না। সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওপরে কী ঘটছে আর এক্ষুনি ওপরে উঠবে কিনা, শাঙ্কোরা কোনও সঙ্কেত দেয় কিনা তার জন্যে কান পেতে রইল।
ওপরের ডেক-এ এবার দলপতি নিঃশব্দে তরোয়াল উঁচিয়ে সিঁড়িঘর দেখাল। তারপর নিজেই সিঁড়িঘরের প্রথম সিঁড়িতে পা রেখে পেছন ফিরে সঙ্গীদের নামতে ইঙ্গি ত করল। পাঁচজন সঙ্গী খোলা তরোয়াল হাতে দলপতির পেছনে এসে দাঁড়াল। অন্যেরা ঘুরে ঘুরে শাঙ্কোদের পাহারা দিতে লাগল। বিনোলা এই সুযোগের জন্যে তক্কে তকে ছিল শেষ সঙ্গীটির ওঁচানো তরোয়ালের ডগাটা সিঁড়িঘরের মাথায় লেগে গেল। ও টাল খেয়ে মাথা নিচু করতেই বিনোলা বিদ্যুৎবেগে ছুটে গিয়ে মাথার কাছে ঝুলন্ত কাঁচ ঢাকা আলোটা এক থাবড়ায় নিভিয়ে দিয়েই শেষ সঙ্গীটির ওপর প্রচণ্ড বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেই ধাক্কায় অন্ধকারে শেষ সঙ্গীটি ছিটকে পড়ল সামনের সঙ্গীদের ওপর, সবাই মিলে অন্ধকারে টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ল সবার সামনে দলপতির এ উপর। সেই প্রচণ্ড ধাক্কায় দলপতি মুখ থুবড়ে পড়ল সিঁড়ি থেকে ছিটকে নীচের কাঠের মেঝেয়। দলপতির হাত থেকে অন্ধকারে কোথায় ছিটকে পড়ল তরোয়ালটা। ওর নাক ভেঙে গেল। ঠোঁট ফেটে গেল। সারা মুখে রক্ত ছুটল। পেছনের সঙ্গীদেরও কয়েকজনের কপাল ফেটে গেল, কারো হাঁটু ভাঙল, কারো হাত। তাদের হাতের তরোয়ালও ছিটতে গেল। শুধু দুজন সবার ওপরে ছিল। তাদের হাতেধরা তরোয়াল হাতেই রইল। সকলের ওপর পড়ল বিনোলা, অক্ষত। ওর ওপরে তো কেউ ছিটকে পড়েনি। সিঁড়িঘরের অন্ধকারে আঞ্জাদ, গোঙানি, শুরু হল। বিনোলা ততক্ষণে ডিগবাজি খেয়ে কয়েক হাত দূরে ফ্রান্সিসের পায়ের কাছে পড়েছে। ফ্রান্সিস বিনোলাকে তুলে পেছনে ঠেলে দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল–কেউ লড়তে এসো না, নির্ঘাৎ মারা যাবে। যে দুজনের হাতে তরোয়াল ছিল তারা উঠে দাঁড়াল ঠিকই, কিন্তু বাকি সবাই তখন ভাঙা কনুই, -পা, ফাটা কপাল নিয়ে গোঙাতে শুরু করেছে। অন্ধকারে সিঁড়িঘরে আর্তনাদ, গোঙানি চলল। তরোয়াল হাতে দুই সঙ্গী অন্ধকারে ফ্রান্সিসকে দেখতেই পেল না। ফ্রান্সিস এক ঝটকায় এগিয়ে এসে সামনের সঙ্গীটির গলায় তরোয়ালের ডগা চেপে বলল–তরোয়াল ফেলে দাও। ও কিছু না বুঝে থমকে গেল। ফ্রান্সিস তরোয়ালের ডগা আরো জোরে চেপে ধরল। কেটে গেল গলা। অন্যজন তখন ভয়ে তরোয়াল ফেলে দিয়েছে। ফ্রান্সিস সিঁড়িঘর দিয়ে আসা নিস্তেজ আলোয় ভালো করে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। গলা চড়িয়ে বলল–মারিয়া, মোমবাতি জ্বেলে নিয়ে এসো। কোনও ভয় নেই।
