রোদের তাত বাড়ছে। জোরে হাওয়া বইছে। ধুলো-বালি, শুকনো পাতা উড়ছে। রাস্তায় লোকজন। দু’পাশের বাড়ি-ঘর শেষ হল। শুরু হল চাষ-আবাদের এলাকা।
হঠাৎ শাঙ্কো বলে উঠল–ফ্রান্সিস, ওই দেখো কবি রামাদ্দি ছুটে আসছে। দেখা গেল রামাদ্দি ছুটতে ছুটতে আসছে। ওদের কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল– তোমরা মুক্তি পেয়েছো শুনে ছুটে আসছি। বলেই সিনাত্রাকে জড়িয়ে ধরল। বলল কবি-বন্ধু, কাল সারারাত জেগে কবিগুরুর গিজেলগুলো পড়েছি। কবি-বন্ধু, তোমাকে ছাড়া আর কাকে শোনাবো সেসব? কী অপূর্ব সেইসব গিজেল!
কিন্তু আমরা যে দেশে ফিরে যাব। বড় তাড়া আমাদের ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ে বলল সবাইদাঁড়াও। রামাদ্দির দিকে তাকিয়ে বলল–ঠিকআছে। একটা গিজেল বলুন। ওই রোদ, ধুলো-পাতা ও পরিবেশ রামাদ্দিকেদমাতে পারল না। ও সুর করে একা গিজেল বলল অর্থাৎ পোর্তুগীজ ভাষায় বলল কবে শুনেছিলাম ইবন্ মনজিরের গিজেল–
ঐশ্বর্য সবার জন্য নয়। বিশ্বাস করেছিলাম। সঞ্চয় করেছি ঐশ্বর্য, খ্যাতি, সম্মান। আজ আমি সেই বিশ্বাস হারিয়েছি। উপলব্ধি করেছি ঐশ্বর্য সবার জন্য। খ্যাতি, সম্মান তুচ্ছ। ঐশ্বর্য আজ আমার কাছে তুচ্ছ।
–ব্বাঃ কী সুন্দর! মুগ্ধস্বরে সিনাত্রা বলে উঠল।
কবি রামাদ্দি, রাত জেগে আপনি এখন ক্লান্ত। এবার ফিরে যান। বিশ্রাম করুন। ফ্রান্সিস শান্তস্বরে বলল।
না না। আমার অভ্যাস আছে রাত জাগার। কত রাত
–তবু আপনার মতো মানুষ যত দীর্ঘজীবী হয় আমাদের ততই মঙ্গল। ফিরে যান।
বেশ। আপনার কথা রাখতেই হবে। আপনি শুধু বুদ্ধিমান নন, হৃদয়বানও। রামাদ্দি বলল।
সিনাত্রার দিকে তাকিয়ে রামাদ্দি বলল–কবি-বন্ধু, গায়ক-বন্ধু, তাহলে বিদায়। রামাদ্দি ঘুরে দাঁড়াল। তারপর ধুলো-পাতা ওড়া পথ দিয়ে ফিরে চলল।
চলো। ফ্রান্সিস বলল। আবার চলা শুরু হল। সিনাত্রা মৃদুস্বরে বলল–আশ্চর্য মানুষ। কেউ কোনো কথা বলল না।
জাহাজের ডেকে উঠে ফ্রান্সিস বলল শাঙ্কো, এখুনি নৌকোয় চড়ে চলে যাও। মারিয়া, হ্যারিকে নিয়ে এসো। তোমরা এলে সবাই একসঙ্গে খাবো। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে হালের দিকে ছুটল। ভেন হাসিমুখে এগিয়ে এল।
–ভেন, তোমার কোনো কষ্ট হয়নি তো? ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল।
-না না। ভালো কথা, কয়েকজন যোদ্ধা এসেছিল। সব বাজেয়াপ্ত করা অস্ত্রশস্ত্র ফিরিয়ে দিয়ে গেছে। ওই যে ডেকে জড়ো করা।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–যাক, নতুন অস্ত্রশস্ত্র কেনার জন্যে কিছু সোনার চাকতি বাঁচল। তারপর গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব, হ্যারিরা ফিরে এলে আমরা খাওয়া দাওয়া সেরে জাহাজ চালাবো। মাতৃভূমির দিকে।
বন্ধুরা সমস্বরে ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো।
[তথ্যসূত্র : ১। দ্য ভাইকিংস–নিপোর্ড পি পোর্তুগাল– পান্ডি আর।
২। ওরাল ট্র্যাডিশান অব অ্যানসিয়েন্ট অ্যারাবিক পোয়েট্রি– ব্ৰিকাকি পি. জে.
৩। স্প্যানিশ অ্যান্ড পোর্তুগীজ মনাস্টিক হিস্ট্রি–বিশকো সি. জে.]
ইবু সলোমানের রত্নভাণ্ডার
বিকেল বিকেল সময়ে পোর্তো বন্দর থেকে ফ্রান্সিসদের জাহাজ ছাড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য পশ্চিমদিগন্তে সমুদ্রের ঢেউয়ের কাছে নেমে এল। লাল রং ছড়িয়ে পড়ল প্রায় মধ্য আকাশ পর্যন্ত। মারিয়া জাহাজের রেলিঙ ধরে বরাবরের মতো সূর্যাস্ত দেখছিল। ওর মনে আজ খুব আনন্দ। কতদিন পরে য়ুরোপে এসেছে ওরা। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের পাশের দেশগুলিতে তো য়ুরোপের দেশগুলির মতো অত বাড়ি-ঘর নেই, উঁচু উঁচু গির্জার চুড়োও দেখা যেত না। লোক জনও পরিচিত পোশাক পরা নয়। মালবাহী যাত্রীবাহী জাহাজগুলির চলাচলও কম। এখানে তো মাঝে মাঝেই তেমনি জাহাজের দেখা পাচ্ছে। জাহাজগুলোর মাথায় মাস্তুলের উপরে উড়ছে পতপত করে নানা য়ুরোপীয় দেশের পতাকা-স্পেনের, ফ্রান্সের, জার্মানির এমনকি দূরের দেশ ফিনল্যাণ্ডের পতাকাও দু’একটা দেখেছে। হ্যারি অনেক দেশের খবর জানে, পতাকাও চেনে। জলদস্যুদের ক্যারাভেলের (ছোট দ্রুতগামী জাহাজ) সাক্ষাৎ এখনও পায়নি। তবে ওরাও কম বুদ্ধিমান নয়। ওদের ক্যারাভেল জাহাজে নানা দেশের পতাকা ওড়ায়। কিন্তু কাছাকাছি এসে লুঠপাটের মতলব থাকলে হঠাৎ দুটো ঢ্যাঁড়া-দেওয়া সাদা হাড় আর নরকঙ্কালের মাথা আঁকা কালো পতাকা উড়িয়ে। দিয়ে দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ে যাত্রীজাহাজে নয়তো মালবাহী জাহাজের ওপর। অবাধে লুঠপাট চালিয়ে সবকিছু নিয়ে অন্য কোনও দেশের পতাকা উড়িয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। অবশ্য এটা য়ুরোপের এলাকা। বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে ইংল্যাণ্ডের নজরদারি জাহাজ ঘুরে বেড়ায়। জলদস্যুদের মতলব বুঝতে পারলে সেই জাহাজ কয়েকশো মাইল তাড়া করে ধরে ফেলে। নিরীহ যাত্রীদের গভীর সমুদ্রে অসহায় অবস্থায় পেয়ে সর্বস্ব লুঠ করা, হত্যা করা কোনও সভ্য দেশই সহ্য করে না। বন্দী করে দেশে নিয়ে যায়। ক্যাপটেন তো বটেই সঙ্গী জলদস্যুরাও রেহাই পায় না। প্রকাশ্য স্থানে জনসমক্ষে ফাঁসিকাঠে দেয়। তাই এই অঞ্চলে জলদস্যুদের ভয় অনেক কম।
চারদিক অন্ধকার করে সন্ধ্যা নেমে এল। আকাশে বাঁকা চাঁদের আলো উজ্জ্বল হল। ভাইকিংরা রাতের খাওয়া সেরে জাহাজের ডেকে অনেকেই এসে জড়ো হল। বসে যায় নাচগানের আসর। সিনেত্ৰা সুরেলা গলায় দেশের গানও গায়। নিজের তৈরি গানও গায়। ফ্রান্সিস ওকে খুব উৎসাহ দেয়। সবাই খুশি। স্বদেশ আর বেশি দূরে নয়।
