এবার ওই জোড়া খেজুর গাছ পর্যন্ত সমস্ত এলাকাটারই জঙ্গল, ঘাস খুঁড়ে ফেলুন। কিন্তু এখন নয়। গোপনে। রাত্রে। কয়েকজন বিশ্বস্ত লোক নিয়ে খুঁড়বেন। কারণ আপনি সব গোপন করবেন বলেছিলেন।
–সব ধনৈশ্বর্য এখানে আছে? উজির আগ্রহে অধীর।
ফ্রান্সিস বলল–অবশ্যই আছে। একটা নমুনা তো আপনার হাতে। তারপর শান্তস্বরে বলল–এবার আমার শর্ত মনে করুন। আমাদের সবাইকে মুক্তি দিন।
আগে সব উদ্ধার করি। উজির বলল।
–তাহলে আজ রাতেই কাজে নামুন। সারারাতে কিছু সম্পদ তো পাবেনই। তাহলে কাল সকালে আমাদের মুক্তি দিন। ফ্রান্সিস বলল–আমরা তাড়াতাড়ি পোত বন্দরে গিয়ে জাহাজে উঠবো।
একটু ভেবে নিয়ে উজির বলল–কয়েকটা দিন থাকো। কিছু ভাগটাগ তো নেবে।
–একটি স্বর্ণমুদ্রাও চাই না। আমরা শুধু মুক্তি চাই। ফ্রান্সিস দৃঢ় স্বরে বলল।
–ঠিক আছে। কাল সকালে দেখা যাবে। উজির বলল।
তখনই দেখা গেল রামাদ্দি ওদের দিকে ছুটে আসছে। ওর দু’গাল, বুকের কাছে পোশাক চোখের জলে ভেজা। ছ্যাকড়া ছ্যাকড়া কালি লেগে আছে। উজির দ্রুত সোনার মানপত্রটা ঢোলা আলখাল্লার বুকের কাছে লুকিয়ে ধরে রইল। রামাদ্দি ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে ফ্রান্সিসের কাঁধে মুখ ঘষতে ঘষতে কান্নাভেজা গলায় বলল–কী অমূল্য সম্পদ যে আমাকে দিলেন! ফ্রান্সিস বুঝল ওর কাঁধের কাছে পোশাক রামাদ্দির চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে। হেসে বলল–বানান ভুল আছে কিন্তু। রামাদ্দি সে কথা কানেই তুলল না। বলল–আমার মহা সৌভাগ্য গুরুদেবের শেষ লিখিত গিজেলের আমিই প্রথম পাঠক। আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে! ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ওর আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে ওর আনন্দ উদ্ভাসিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তখনই রামাদ্দি বলে উঠল–আপনি কি এই মহা-সম্পদ খুঁজছিলেন?
এর কাছে সেসব তুচ্ছ। ফ্রান্সিস হেসে বলল। উজিরের দিকে তাকিয়ে বলল তাহলে বন্দীশালায় ফিরে যাচ্ছি।
কাল সকালেই আমরা মুক্তি চাই।
রাতটা তো হাতে আছে। সকালেই খবর পাবে। উজির বলল।
–চলো শাঙ্কো। ফ্রান্সিস বলল–আমাদের কাজ শেষ।
উজিরের কাছে ফ্রান্সিসদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। রাস্তায় এসে দেখল সেই লোকটা আজ দাঁড়িয়ে নেই। দুজনে হাঁটতে লাগল। শাঙ্কো বলল–অত মূল্যবান সম্পদ জঙ্গলে ছুঁড়ে ফেলল?
–মানুষের মন বড় বিচিত্র শাঙ্কো। কতরকম মানুষই তো দেখলাম।
–অত দামি দামি জিনিস কারো নজরে পড়ল না? শাঙ্কো বলল।
–দুর্গে সাধারণ লোকের প্রবেশ নিষেধ। তখনও সামান্য হলেও গাছ-গাছালি ছিল। সেই সময় যোদ্ধারাও বোধহয় বেশি থাকতো না দুর্গে। তারা জঙ্গলে যাবে কেন? তবে চোরটোর হয়তো গিয়েছিল। কিন্তু সব মূল্যবান সামগ্রী তো পায়নি। রাতের অন্ধকারে হাতের কাছে তাড়াতাড়ি যদি পেয়েও থাকে কিন্তু ভয়ে বাইরে প্রকাশ করেনি। তবে লোকমুখে হয়তো কিছু গল্পটল্প চালু ছিল। নইলে এখানে চোরেরা আসবে কেন? — গভীর রাতে সাপের কামড় খেয়ে মরতে লেকে কি যায়?
আধভাঙা দুর্গের বাইরে এল সবাই। উজির তো খুশিতে ডগমগ। সোনার মানপত্র লুকিয়ে নিয়ে দ্রুত লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘোড়ায় উঠল। জোরে ঘোড়া ছোটাল। রামাদ্দি সেই গিজেল লেখাগুলো নিয়ে ফ্রান্সিসদের কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিল। সেই মন্থর গতিতে হেঁটে চলল পাথুরে রাস্তা দিয়ে। সে-ও আনন্দিত। তবে ধনসম্পদের চেয়েও অনেক মূল্যবান গুরুদেবের লিখিত গিজেল পেয়ে।
একজন প্রহরী এসে গরাদ দেওয়া দরজা খুলে দিল। ফ্রান্সিস ও শাঙ্কো ঢুকতেই বিনোলারা দ্রুত ছুটে এল। শাঙ্কো একটু ক্লান্ত স্বরে বলল-খাওয়ার সময় সব বলবো। এখন খিদেয় পেট জ্বলছে। খেতে খেতে শাঙ্কো হাত ঘুরিয়ে চোখ-মুখে নানা ভাব প্রকাশ করে ফ্রান্সিসের কৃতিত্বের কথা বলতে লাগল।
রাতে ফ্রান্সিসের পাশে শুয়ে শাঙ্কো বলল–কী মনে হয় তোমার? উজির আমাদের মুক্তি দেবে?
–অবশ্যই। ধনসম্পদ রাত জেগে খুঁজে পাবেই। দু’এক রাত লাগতে পারে সব উদ্ধার করতে। উজিরের কাছে আমাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। কাজেই আমাদের মুক্তি দিতে আপত্তি করবে না। কারণ তাতে ওর কোনো লাভ নেই।
ভোর হল। সকালের খাবার খাওয়া হয়েছে সবে। গরাদে মুখ রেখে:চড়া গলায় এক প্রহরী বলল-শুধু ভাইকিংরা বাইরে বেরিয়ে এসো। বাকিদের কয়েদ চলবে। মান্যবর উজিরের হুকুম।
শাঙ্কো লাফিয়ে উঠে পড়ল। গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব, উঠে এসো! আমরা মুক্তি পেয়েছি। ভাইকিং বন্ধুরা ছুটে এসে গরাদের সামনে জড়ো হল। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াতেই আস্তাসো ছুটে এসে ফ্রান্সিসের দু’হাত জড়িয়ে ধরল। খুশি তবু দু’চোখে দুঃখ, কাতরতা। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে আস্তে আস্তে বলল–ভাই আস্তাসো, দুঃখিত। তোমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারলাম না। আমরাও যে এত তাড়াতাড়ি মুক্তি পাব ভাবিনি। উজির ইয়েপুদা মানুষটা বড় ধূর্ত। একটু থেমে বললঈশ্বরের কাছে তোমাদের দ্রুত মুক্তি কামনা করছি। আর কোনো কথা বলতে পারল না।
শব্দ করে গরাদের দরজা খেলা হল। বাইরে এসে ফ্রান্সিস আকাশের দিকে তাকাল। উজ্জ্বল রোদের আকাশ। সাদাটে খণ্ড মেঘ নিথর দাঁড়িয়ে। আঃ মুক্তি! পৃথিবী কী সুন্দর!
ভাইকিংরা দল বেঁধে পাথর ছড়ানো রাস্তাটা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সদর রাস্তায় উঠে এল। হাঁটতে লাগল পোত বন্দরের দিকে।
