কিছুক্ষণের মধ্যেই দড়ি আর নোঙর নিয়ে সেনাপতি এল। এত তাড়াতাড়ি কী করে আনল সেটা আর কেউ জিগ্যেস করল না। ফ্রান্সিস বলল, মান্যবর, এবার সেনাপতিকে চলে যেতে বলুন। ওঁকে আর দরকার নেই।
উজির আর কারণ জানতে না চেয়ে সেনাপতিকে চলে যেতে ইঙ্গিত করলেন। সেনাপতি ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল।
ফ্রান্সিস চুপ করে কান পেতে রইল। বাইরে সেনাপতির ঘোড়র ক্ষুরের শব্দ শোনা গেল। সেটাও মিলিয়ে গেল এক সময়। ফ্রান্সিস উজিরের দিকে তাকিয়ে বলল–সব গোপন রাখব। কথা দিয়েছিলাম। তাই সবাইকে সরিয়ে দিলাম। কবি রামাদ্দিকে আপনি কোনও গুরুত্বই দেননি। তাই উনি থাকুন। উনি অন্যরকম মানুষ। এবার আমার সঙ্গে আসুন।
ফ্রান্সিস ধীর পায়ে সেই ভেঙে পড়া জায়গাটায় এসে দাঁড়াল। উজির পাশে এসে– দাঁড়ালেন। ফ্রান্সিস সেই কড়াটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল–ওটা একটা কাঠের গিল্টিকরা সিন্দুক। ওটার মধ্যেই আছে বিখ্যাত কবি আবিদি রব্বাহির ঐশ্বর্যভাণ্ডার।
উজির ভীষণভাবে চমকে উঠে বললেন–বলো কী? তার তখন দু’চোখ কপালে।
ওটা তুলতেই দড়ি-নোঙর আনিয়েছি। ওখানে নামতে গেলে যে কোনও মুহূর্তে মেঝে ভেঙে পড়তে পারে। তাতে প্রাণহানি ঘটবে। এবার কাজে নামা যাক। শাঙ্কো, : দড়ি নিয়ে এসো। রামাদ্দিও আসুন।
শাঙ্কো তো এসব ব্যাপারে অভ্যস্ত। ও দড়ি এনে নোঙরের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধল। ওরা দক্ষ নাবিক। দুড়ির নানারকম গিঁট বাঁধতে ওস্তাদ। তারপর ঐ ভাঙা গর্তের মতো জায়গাটায় নোঙরটা নামিয়ে দিল। আবছা আলোয় লক্ষ্য স্থির করে নোঙরের বঁড়শির মতো মুখটা আস্তে আস্তে ঐ কড়ার মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। তারপর টেনে ধরল।
রামাদ্দি, হাত লাগান। ফ্রান্সিস দড়িটা ধরে বলল–খুব বেশি ভার হবে না। আবু হামিদ একাই কাঁধে করে এতখানি পথ এসেছিল।
বিস্ময়াভিভূত রামাদ্দিযন্ত্রচালিতের মতো এগিয়ে এসে দড়িটা ধরল। দেখে উজিরও এগিয়ে এসে ধরলেন। চারজনে মিলে টানতে লাগল। একটু পরেই ভাঙা-আস্ত পাথরের পাটাতনে ঢাকা-পড়ে-যাওয়া সিন্দুকটা উঠে আসতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ওটা তোলা হল। সত্যি কাঠের ওপর সোনা রুপোর সুন্দর কাজ করা সিন্দুক। কিন্তু কোনও তালা ঝুলছেনা। উজির একলাফে এগিয়ে এসে ডালা ধরে টান দিলেন। বেশ শক্তভাবে আঁটা কতদিন আগের সিন্দুক! দু’একবার টানাটানি করে জোরে শ্বাস ফেলে সরে দাঁড়ালেন। এবার শাঙ্কো এগিয়ে এসে জোরে একটা হ্যাঁচকা টান দিতেই ডালাটা খুলে গেল। কিন্তু এ কী? –ভেতরটা শূন্য! পড়ে আছে চামড়া মেশানো কাগজের একটা বান্ডিল মতো। পাশে ওল্টনো একটা পাথরের দোয়াত আর ছুঁচোলো করে কাটা কলম। দোয়াতের কালো কালি কাগজের কোনায় আঠার মতো সেঁটে আছে। উজির স্তব্ধ হয়ে ওগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু রামাদ্দি উল্লাসে আনন্দে দু’হাত তুলে লাফিয়ে উঠল। দ্রুত হাত বাড়িয়ে তুলে নিল কাগজগুলো। ওপরের কাগজটায় আরবি ভাষায় : লেখা কয়েক লাইন পড়েই সব কাগজগুলি বুকে চেপে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। চরম বিরক্তিতে নির্বাক উজির সেই কান্নার শব্দে সচকিত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন–থাম্ উজবুক।
কিন্তু কে থামাবে রামাদ্দিকে? রামাদ্দি কেঁদেই চলল। উজির অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে দেখলেন সে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ-মুখ শুকিয়ে গেছে যেন। উজির উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন–এই তোমার আবিষ্কার! কতকগুলো বস্তাপচা কাগজ!
শাঙ্কোও বিস্ময়ে নির্বাক। ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়েই রইল।
এই রামাদ্দি, এই সিন্দুক তোল–তোল।
কাকে বলা? রামাদ্দি তখন বাহ্যজ্ঞানশূন্য। কাগজগুলো বুকে জড়িয়ে বসে বসে কেঁদে চলেছে।
ঠিক আছে, আমিই ছুঁড়ে ফেলছি। উজির কথাটা বলে ছুটে এসে ভারী সিন্দুকটা তুলে নিলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে ভাঙা দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে সেটাকে বাইরে ফেলে দিলেন। খুব জোরে শব্দ হল না। কতদিন আগেকার সিন্দুক। হয়তো ভেঙে কাঠের ডালা ছিটকেই গেল। সেই শব্দে ফ্রান্সিস চমকে উঠে ভাঙা দেয়ালের দিকে তাকাল। গরাদ থাকলে উজির কি পারতেন ঐ সিন্দুকটা ছুঁড়ে ফেলতে? সঙ্গে সঙ্গে রামাদ্দির পড়া শেষ দিকটা মনে পড়ল–সব ছুঁড়ে ফেলে দেব–মহা শান্তি! ফ্রান্সিসের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মুখে হাসি ফুটে উঠল। উজিরের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে বলল–বাইরে ঐ জঙ্গলের দিকে চলুন।
তার মানে? উজিরের বিস্ময়ের শেষ নেই।
ওখানেই ছড়িয়ে আছে কবি আবিদির ঐশ্বর্যভাণ্ডার। চলুন। ফ্রান্সিস একই ভাবে শান্ত স্বরে বলল। উজির বিস্ময়ে বারুদ্ধ হয়ে গেলেন। লোকটা বলে কী?
ফ্রান্সিস ভাঙা সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে বলল–আসুন। উজির কী বুঝল কে জানে। ফ্রান্সিসের পেছনে পেছনে ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। পেছনে শাঙ্কো। ফ্রান্সিসের উজ্জ্বল চোখ-মুখ দেখেই বুঝল–ফ্রান্সিস এবার ঠিক খুঁজে পেয়েছে।
তিনজন পেছনের জঙ্গলের কাছে এল। দুর্গের ভাঙা জানালাটা দেখিয়ে ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডেকে বলল–ওই জানালা বরাবর জোড়া খেজুর গাছ পর্যন্ত এলাকাটা ভালো কের খুঁজতে হবে। সাবধান–বিষধর সাপ আছে। বুনো ঝোঁপ-জঙ্গল, গাছের নীচে পাবে মূল্যবান মণিরত্ন, সোনা রুপো। রামাদ্দি থাকলে খুঁজতে সুবিধে হত। কিন্তু উনি এখন হিসেবের বাইরে। এসো। উজির কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো ঝোঁপ-জঙ্গল কখনো উপড়ে ফেলে কখনো ডাল-টাল ভেঙে ফেলে নীচের পাথরকুচি মেশানো মাটি দু’হাতে সরিয়ে সরিয়ে দেখতে দেখতে এগোতে লাগল। কিছু পাওয়া গেল না। ফ্রান্সিস বুঝল প্রায় দেড়শো বছর আগের ঘটনা। পাথরকুচি মাটি জমে উঁচু হয়েছে। খুঁড়ে না ফেললে কিছু পাওয়া যাবে না। তখন জোড়া খেজুর গাছের কাছে এসে একটা ছোট বুনো গাছ হ্যাঁচকা টান দিয়ে উপড়ে ফেলল। এক চাপড়া পাথরকুচি মেশানো মাটি উপড়ে এল সেই সঙ্গে। দেখল চৌকোনা কিছুর একটা কোনা বেরিয়ে আছে। শাঙ্কো দ্রুত বসে পড়ে দু’হাতে ঘাস ছিঁড়ে মাটি সরিয়ে দেখল একটা ধুলো-মাটি মাখা চৌকোনা কিছু। ওটাও কয়েকটা টানে তুলে ফেলে ডাকল–ফ্রান্সিস, দেখো তো এটা কী? ফ্রান্সিস দ্রুত পায়ে শাঙ্কোর কাছে এল। কোমর থেকে ফেট্টিটা খুলে চেপে চেপে মাটি, ঘাস, ঘষে তুলে ফেলতে ফেলতে দেখল সোনার লম্বাটে চৌকোনা পাটা মতো। তাতে কিছু লেখা। কিন্তু ভাষাটা বুঝল না। ওটা হাতে নিয়ে ফ্রান্সিস উজিরের কাছে এল। উজিরের হাতে দিয়ে বলল– দেখুন তো, সোনার ওপরে কী যেন কুঁদে লেখা? উজির নিরেট সোনার জিনিসটা দেখে বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গেল। মাটিমাখা লেখাগুলো দেখতে দেখতে সবিস্ময়ে বলে উঠল কবি আবিদি রব্বাহিকে দেওয়া মানপত্র। হিব্রু ভাষায় লেখা। নীচে একজন খলিফার নাম রয়েছে। সন-তারিখটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
