.
এবার পরপর বলে যান। যতটুকু পড়তে পেরেছেন, সাজাতে পেরেছেন–পড়ুন। রামাদ্দি পাতাগুলো একটা একটা করে নিয়ে পড়তে লাগল
শহরে জোর গুজব-সীমান্তে শত্রুসৈন্য-কদিন ধরেই গুজবের পর গুজব আতঙ্ক। গভীর রাত। ঘুম ভেঙে–জনাব রব্বাহিকে– রব্বাহি প্রচণ্ড উত্তেজিত পায়চারি–ভীষণ বিপদজনাব রব্বাহিকে–অনেক রাতে–মুখে মুখে গিজেল– লুকিয়ে লিখি–এরকম দেখিনি। আজ দেখছি–অন্যরকম–দেখছি–হামিদ–সব ধনসম্পদ–পালাবলুঠ হয়ে যাবে। রামাদ্দি থামল। বলল–পাতা নেই। তারপর আবার লেখা–চোরকুঠুরি থেকে কাঠে গিল্টিকরা–ভার–জনাব তৈরি–অন্ধকার পথবঁধ ভেঙে আসছিল–জনশূন্য চারদিক–আমাকেই দুর্গে ঢোকার ব্যবস্থা পরিত্যক্ত ঘর– রামাদ্দি থামল। বলল–পাতা নেই। একটা পাতা পড়াই যাচ্ছে না।
ফ্রান্সিস উত্তেজিত স্বরে বলে উঠল–তারপর? রামাদ্দি পড়তে লাগল–খাদ্য-পানীয়–গভীর রাতে–খোঁড়া সুলেমান–সব জমা করি। রামাদ্দি থামল। বলল–পড়া যাচ্ছে না।
যা পড়তে পারছেন বলে যান। ফ্রান্সিসের গলায় স্পষ্ট উত্তেজনা। রামাদ্দি পড়তে লাগল–একটা বিষধর সাপ–মেঝেয় ঘোরে–মারতে দিলেন না সিন্দুক রাখা ফোঁস ফোঁস শব্দ–ঘুম-ভয়–আদর করেন–পোকামাকড়-বনজঙ্গল ঘুরে জমাই–জানালার গরাদে-রাত জাগেন গিজেল শুনি–গোপনে লিখি–জমিয়ে রাখি–এক গভীর রাতে–চিৎকার–অর্থহীন ঐশ্বর্য ছুঁড়ে ফেলে দেব সিন্দুক ওঠা–গরাদ–বাইরে জোড়া খেজুর গাছ–খেজুর গাছ দীর্ঘজীবী মানুষের জীবন–ফেলে দেব সব ছুঁড়ে-ঈশ্বরের আরাধনাই–শ্রেষ্ঠতম সঞ্চয়ে শান্তি নেই–ছুঁড়ে ফেলে দেব। মহা শান্তি খুঁসে উঠল সাপ– রামাদ্দি থামল। বলল আর কোনও কাগজ নেই। হয়তো আরও কিছু গুছিয়ে লেখা ছিল। ফ্রান্সিস উত্তেজনার মধ্যে কথাগুলির ফাঁকগুলো মনে মনে সাজিয়ে ভেবে নিচ্ছিল। হ্যারির কথা বারবার মনে পড়তে লাগল। হ্যারি থাকলে ঠিক সব সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে পারত। কিন্তু হতাশ হওয়া চলবে না। ও বলে উঠল-রামাদ্দি, মান্যবর উজিরকে খবর পাঠান, আর সব যোদ্ধাকে চলে যেতে বলুন। ওদের কাজ শেষ।
রামাদ্দি এ কথার কোনও অর্থই বুঝল না। ও ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। শাঙ্কো পাশে বসে সব শুনছিল। মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস যখন বলছে জানবেন এর পেছনে কোনও মানে–গোপন কারণ আছে। ও যা বলছে তাই করুন।
রামাদ্দি উঠে দাঁড়াল। কাগজগুলো রেখে সেনাপতির কাছে এল।
কী সব বকবক করছিলেন? গিজেল বানাচ্ছিলেন? বিরক্ত সেনাপতি বলল।
ঐ রকমই। তবে লেখা গিজেল। এক্ষুনি মান্যবর উজিরকে খবর দিন। উনি যেন তাড়াতাড়ি আসেন। রামাদ্দি বলল।
সেনাপতি চলে গেল। বাইরে পাথুরে রাস্তায় ঘোড়ার পায়ের শব্দ শোনা গেল– ঠক্ ঠকা। রামাদ্দি যোদ্ধাদের কাছে গেল। বল–ভাই, কাজ শেষ। মান্যবর উজির আসছেন। তোমাদের ছুটি। মান্যবরকে আমি যা বলার বলব।
যোদ্ধারা আস্তে আস্তে চলে গেল। শাঙ্কো দেশের ভাষায় মৃদুস্বরে বলল-উনি আসছেন। তুমি কি নিশ্চিত?
নীচে একটা গোল লোহার কড়া দেখেছ তো? ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
হ্যাঁ, খুব অস্পষ্ট। শাঙ্কো বলল।
ওটা একটা গিল্টিকরা সিন্দুকের কড়া। ওটাতেই রয়েছে কবি আবিদি রব্বাহির গুপ্ত ঐশ্বর্যভাণ্ডার। অবশ্য এখনও সঠিক সেটা বলার সময় আসেনি। অপেক্ষা করি।
সাবাস ফ্রান্সিস! তোমার সব অনুমান সত্যি। শাঙ্কো খুশির স্বরে বলে উঠল।
ওদের মৃদুস্বরে কথা বলতে দেখে রামাদ্দি কাছে এল। বলল–কী কথা হচ্ছিল?
এই ঘরের ওপরের ঘরেই কবি আবিদি রব্বাহি তার স্বেচ্ছা নির্বাসনের শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল তাঁর বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী আবু হামিদ। সাপ পোষ মানে কিনা জানি না। তবে এক বিষধর সাপের কামড়ে আবিদি মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু আবু হামিদের মৃত্যুর কারণ বা সময় এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। ফ্রান্সিস বলল।
তবে তো তাদের পবিত্র দেহাবশেষ এইখানেই পাওয়া যাবে। রামাদ্দি বলল।
নিশ্চয়ই পাবেন। যদিও এতদিন পরেকতটা অক্ষত আছে বলতে পারব না। ফ্রান্সিস বলল।
আর কী সব খুঁজছিলেন সে সব? রামাদ্দি জানতে চাইল।
মান্যবর উজির এলে সবই জানবেন, দেখবেন। ফ্রান্সিস বলল।
একটু পরেই ঘোড়ার পায়ের শব্দ শোনা গেল পাথুরে রাস্তায়। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। দ্রুতপায়েই উঠে এলেন উজির। একটু হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন–কী ব্যাপার? উদ্ধার করতে পেরেছ সেই ঐশ্বর্যভাণ্ডার?
না। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল।
শুনে উজির দু’হাত ছড়িয়ে হতাশার ভঙ্গি করলেন। বললেন–তাহলে আমাকে কেন এভাবে ছুটিয়ে মারলে?
সেনাপতিকে বলুন একটা শক্তদড়ি আর জাহাজের একটা নোঙর আনতে। ফ্রান্সিস বলল।
কী হবে ও সবে? উজির অবাক।
একটু তাড়াতাড়ি আনতে বলুন। ফ্রান্সিস শান্ত স্বরে বলল।
বিরস মুখে উজির সেনাপতিকে শক্ত দড়ি আর একটা নোঙর আনতে বললেন। রামাদ্দি তখনও অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে। ও তখন ভাবছে। লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি! পরক্ষণেই ভাবল, ফ্রান্সিস তো কবি আবিদির মৃত্যুর ঘটনা বেশ গুছিয়ে বলে গেল। এটা কী করে সম্ভব? এত কথা যে বলতে পারে সে কখনওই পাগল নয়। সবাই নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে লাগল। শুধু উজির হাতে ধরা ঘোড়া চালানোর চাবুকটা হাতে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে আবার ছেড়ে দিচ্ছিলেন। বেশ অসহিষ্ণু ভঙ্গি।
