যোদ্ধারা কিছুই বুঝল না কেন ঐ সব ধসে-পড়া ভাঙা পাথর তুলে ফেলে দিতে হবে। কিন্তু যোদ্ধা তো। প্রশ্ন করতে ওরা অভ্যস্ত নয়। ওরা ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এল। বন-জঙ্গলের দিকে পাথরের দেওয়ালটা ভেঙে গেলেও সবটা ভেঙে পড়েনি। ওরা পাথরের ভাঙা ও আস্ত পাটাগুলো তুলে সেই ভাঙা জায়গাটা দিয়ে বাইরে ফেলতে শুরু করল। নিস্তব্ধ জায়গাটায় পাথর ফেলার শব্দ শুরু হল। বেশ কিছু পাটা ফেলা হতেই পাথরের মধ্যে একটা কাঠের পায়া উঁচু হয়ে আছে দেখা গেল। সেখানকার পাথর ফেলে দিতেই একটা শোবার আসবাব দেখা গেল।
খুব সাধারণ আসবাব। ধুলো-কাদায় মাখামাখি। ফ্রান্সিস খুশির চোখে শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল, শাঙ্কো, এবার আমি নিশ্চিত। এর ওপরে একটা ঘর ছিল। কবি আবিদি সেই ঘরেই স্বেচ্ছাবন্দী ছিলেন।
ভাঙা দেওয়ালের দিকটায় দেখা গেল বেশ কয়েকটা ময়লা চামড়া মেশানো হলদেটে কাগজ। ফ্রান্সিস বলে উঠল, শাঙ্কো, যাও, খুব সাবধানে কাগজগুলো তুলে আনো। আর কাউকে হাত লাগাতে দিও না। শাঙ্কো খুব একটা বিস্মিত হল না। ফ্রান্সিসের অনেক বিস্ময়কর আবিষ্কারের প্রত্যক্ষদর্শী শাঙ্কো। ও একছুটে গিয়ে খুব সাবধানে কাগজগুলো তুলতে লাগল। তবুজীর্ণ পাতাগুলোর এখানে-ওখানে ছিঁড়ে গেল। রামাদ্দির বিস্ময়ের শেষ নেই। শাঙ্কো সব কটা কাগজ সাবধানে তুলে এনে ফ্রান্সিসের হাতে আস্তে আস্তে একটা একটা করে দিতে লাগল। প্রথমটায় খুব অস্পষ্ট কিছু লেখা দেখে ফ্রান্সিস বুঝল আরবি অক্ষর। ওর বোধগম্য নয়। তখনই বাইরে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শোনা গেল। ফ্রান্সিস কোথাও কোথাও খসে পড়া পাতাগুলির একটা রামাদ্দির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল সাবধানে ধরুন। রামাদ্দি সাগ্রহে হাত বাড়িয়ে পাতাগুলি নিতে লাগল।
পরে পড়বেন। সাবধানে, ঘেঁড়ে না যেন। ফ্রান্সিস মৃদু স্বরে বলল।
রামাদ্দি যন্ত্রচালিতের মতো পাতাগুলি হাতে জড়ো করতে লাগল। তখনই সেনাপতি উঠে এল। যোদ্ধারা সন্ত্রস্ত হয়ে কাজ থামাল।
কাজ চলছে? যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে সেনাপতি গম্ভীর গলায় বলল। দু’একজন যোদ্ধা বলে উঠল-হা, জনাব।
ফ্রান্সিস বলল–রামাদ্দি, ভালো করে দেখুন তো, কিছু লেখা আছে মনে হচ্ছে।
একটা কাগজ আলতো হাতে নিয়ে একটুক্ষণ অস্পষ্ট হয়ে আসা অক্ষরগুলো দেখে রামাদ্দি বলল, আপনার অনুমান ঠিক।
কী লেখা আছে? ফ্রান্সিস সাগ্রহে জিগ্যেস করল।
ভালো পড়া যাচ্ছে না। যা পড়া যাচ্ছে সেটুকু পড়ে মনে হল, কেউ রোজনামচা মতো কিছু লিখেছে। তবে সন-তারিখ কিছু নেই।
রামাদ্দি, ওসব কবি আবিদির ছায়াসঙ্গী আবু হামিদের লেখা রোজনামচা। তাড়াতাড়ি পাঠোদ্ধার করুন। এই লেখাগুলো থেকে অনেক কিছু জানা যাবে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এসব। ফ্রান্সিস বল।
দেখছি বানান-টানান ভুল আছে। রামাদ্দি বলল।
স্বাভাবিক। আবু হামিদ খুব উচ্চশিক্ষিত ছিল না। এক কাজ করুন, বাইরে চড়া রোদে গিয়ে বসুন। সাবধানে পাতাগুলো পরপর সাজাবার চেষ্টা করুন। আস্তে আস্তে। পাঠোদ্ধার করুন। দেখবেন, কোনও কাগজ যেন একেবারে ছিঁড়ে না যায়। একটু তাড়াতাড়ি করুন।
বিস্মিত রামাদ্দি কাগজগুলো নিয়ে ভাঙা ঘরের বাইরে চলে গেল। একটা লম্বাটে পাথরের পাটায় বসে আলতো হাতে কাগজগুলো নিয়ে নিয়ে পরপর সাজাল। তারপর পড়তে লাগল। সেনাপতি কোনও কথা না বলে ফ্রান্সিসের কাণ্ড দেখছিল। তার বিরক্ত মুখ দেখেই শাঙ্কো বুঝল, সেনাপতি এসবের কোনও অর্থই বুঝে উঠতে পারছে না। যোদ্ধারা কাজ থামিয়ে দাঁড়িয়ে একটু একটু হাঁপাচ্ছিল। ফ্রান্সিস ওদের দিকে তাকিয়ে বলল–মেঝের কোনার দিকটা এখনও পরিষ্কার হয়নি। হাত লাগাও ভাই। ওরা সেনাপতির মুখের দিকে তাকাল। সেনাপতি মাথা তুলে সম্মতির ইঙ্গিত করল। শুরু হল পাথর সরানোর কাজ। ভাঙা দেওয়ালের বাইরে পাথরের ভাঙা আস্ত পাটা পড়তে লাগল। আবার ঠক্ঠকাশব্দ শুরু হল। তখনই দেখা গেল কোনার দিকটা ভেঙে পড়েছে। ফ্রান্সিস দ্রুত এগিয়ে এসে ভাঙা জায়গাটা দিয়ে নীচের দিকে তাকাল। বাইরে কড়া রোদ। কিন্তু ওখানটা খুব অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অস্পষ্ট একটা উঁচিয়ে থাকা গোল লোহার কড়ামতো দেখল ভাঙা পাথরগুলির মধ্যে। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে সাবধান হল। ও উজিরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সব গোপন রাখবে। দু’তিনজন যোদ্ধাও ঐ লোহার কড়াটা অস্পষ্ট দেখেছিল। তাদের একজন ফ্রান্সিসকে বলল–ওটা কী? ফ্রান্সিস প্রশ্নটার কোনও গুরুত্ব না দিয়ে বলল–তেমন কিছু না। দেওয়ালে গাঁথা থাকে মশাল রাখার যে কড়া তেমনই কিছু। তোমরা ভাই কাজ বন্ধ রাখো।
যোদ্ধারা ওখান থেকে সরে ওপরের ভাঙা সিঁড়িতে এসে দাঁড়াল। সেনাপতি কাছেই দাঁড়িয়েছিল। যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে বলল–কী ব্যাপার? ওখানে কী আছে? একজন যোদ্ধা হাত নেড়ে বলল–কিছু না। একটা ভাঙা লোহার কড়া।
ও। সেনাপতি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল। তখনই রামাদ্দি কাগজগুলো নিয়ে ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–আপনি ঠিকই বলেছেন। এগুলো আবু হামিদেরই লেখা রোজনামচা। যথাসম্ভব পরপর সাজিয়েছি। অনেক শব্দ পড়া যায়নি। সবই কেমন ছাড়া ছাড়া হয়ে গেছে।
আসুন। ফ্রান্সিস সরে এসে সিঁড়িতে বসল। রামাদ্দিকে পাশে বসতে ইঙ্গিত করল। রামাদ্দি পাশে বসল।
