ফ্রান্সিস বিস্কোর বাড়ির দিকে চললো। ও জানে, ও পালিয়েছে জানলে বাবা প্রথমেই হ্যারির বাড়িতে খোঁজ নেবেন। কাজেই হ্যারিদের বাড়িতে থাকা চলবে না।
বিস্কোদের বাড়িতে যখন পৌঁছলো, তখন বেশ রাত হয়েছে। দোতলায় বিস্কো কোন ঘরে থাকে, ফ্রান্সিস জানতো। দেখলো সেই ঘরের জানালা অব্দি একটা মোটা লম্বাগাছ উঠে গেছে। কত ফুল ফুটে আছে সেই গাছটায়। ও দেওয়াল টপকে বাগানে ঢুকল। গাছের আড়ালে-আড়ালে চলে এলো জানলাটার নীচে। তারপর লম্বা গাছটা বেয়ে উঠতে লাগলে। নরম লম্বগাছ। বেশি চাপ দিয়ে ভরসা হচ্ছে না। খুব সাবধানে লতাগাছটা বেয়ে ও জানালাটার কাছে এল। জানালায় কয়েকটা টোকা দিল। বিস্কো তখন শুয়ে পড়েছিল। জানালায় টোকা দেওয়ার শব্দ শুনে এসে জানালা খুলে দিল। অন্ধকারে ফ্রান্সিসকে চিনতে ওর অসুবিধে হ’লও একটুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বললো–আমি ফ্রান্সিস। বিস্কো চিনতে পেরে হাসলো। হাত বাড়িয়ে বললো–কি ব্যাপার এত রাত্রে এভাবে লুকিয়ে ।
ফ্রান্সিস ওর বাড়ানো হাতটা ধরে লতাগাছটা থেকে জানালায় উঠে এলো। তারপর ঘরের মধ্যে নামলো। বিস্কো বিছানাটা দেখিয়ে বললে, বসো।
ফ্রান্সিস বসলো। ওর পালাবার গল্প বললো। তারপর বললো, তোমাদের বাড়িতে দুচারদিন আমাকে লুকিয়ে থাকতে হবে। আমার পালাবার খবর পেলেই বাবা আমার খোঁজে লোকজন পাঠাবেন। আমার প্রায় সব বন্ধুর বাড়িতেই বাবার পাঠানো লোকজন আমার খোঁজে আসবে। আমি জানি প্রথমেই খোঁজ হবে হ্যারিদের বাড়িতে। তারপর একে-একে সকলের বাড়ি।
–তুমি অনায়াসে আমাদের বাড়িতে লুকিয়ে থাকতে পারো। কেউ তোমার খোঁজ পাবে না। কিন্তু তুমি কি ভেবেছো, মানে তোমার পরিকল্পনাটি কি?
–সব বন্ধুদের আবার একত্র করবো। রাজার জাহাজ চুরি করে পালাবো। যাবো চাঁদের দ্বীপে। আবার মুক্তো আনবো।
এসব যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে দু’জনে কথাবার্তা হ’ল অনেকক্ষণ, তারপর দুজনে একই বিছানায় শুয়ে পড়লো। বাকি রাতটুকু ঘুমোল।
পরের দিন। ফ্রান্সিসের বাবা বুঝলেন, ফ্রান্সিস আবার পালিয়েছে। এবারের লক্ষ্য নিশ্চয়ই মুক্তোর সমুদ্র থেকে মুক্তো আনা। কারণ ফ্রান্সিস মুক্তোর ব্যাপারে কি যেন বলেছিলো। ওর বাবা নিজেই এলেন হ্যারির বাড়িতে। হ্যারি সে সব শুনে আকাশ থেকে পড়লো। ও বললো গত দু’দিন যাবৎ ফ্রান্সিসের সঙ্গে তার দেখা নেই, সে জানেইনা, যে ও পালিয়েছে। প্রায় সব বন্ধুদের বাড়িতে খোঁজ খবর করে ফ্রান্সিসের বাবা হাল ছেড়ে দিলেন। ওর মা মুখে কিছু বললো না। আড়ালে কাঁদলো কিছুক্ষণ।
পরের কয়েকটা দিন ফ্রান্সিস বিস্কোর বাড়িতেই খেয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলো। তারপর বিস্কোকে পাঠালো হ্যারি আর অন্য বন্ধুদের খবর দিতে। রাত্রিবেলা যেন সবাই সেই পোড় বাড়িতে আসে। সভা হবে।
পোড়ো বাড়িটায় যখন ফ্রান্সিস এলো, তখন রাত হয়েছে। অনেক বন্ধু এসে গেছে। বাকিরা দু’জন একজন করে আসতে লাগল। কিছু পরেই ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়ালো। বলতে লাগলো, ভাইসব, আমরা আবার সমুদ্রযাত্রা করবো। বাবার আপত্তি, কাজেই ইচ্ছে থাকলেও রাজা আমাদের জাহাজ দেবেন না। কাজেই সোজা রাস্তা জাহাজ চুরি। পরশুদিন এইসময় এইখানে সবাই তৈরি হয়ে হাজির থাকবে। রাত্রির অন্ধকারে জাহাজ চুরি করে আমরা পালাবো।
সবাই ও-হে-হো করে চীৎকার করে ফ্রান্সিসের প্রস্তাবে সম্মতি জানালো। সভা ভেঙে গেলো। নির্দিষ্ট দিনে ফ্রান্সিসের বন্ধুরা রাত একটু গম্ভীর হতে পোডড়া বাড়িটায় জড়ো হতে লাগলো। সবাই সমুদ্রযাত্রার জন্যে তৈরি হয়ে এসেছে।
দল বেঁধে সবাই জাহাজঘাটায় এসে হাজির। জাহাজঘাটায় এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। জলে সেই আলোর প্রতিবিম্ব কাঁপছে। খোলা তরোয়াল হাতে রাজার সৈন্যরা জাহাজ পাহারা দিচ্ছে। ফ্রান্সিস সবাইকে কেরোসিন কাঠের ভাঙ্গা বাক্স আর খড়ের গাদার পেছনে লুকিয়ে পড়তে বললো। পাথরের দেওয়াল আর থামের আড়ালে ফ্রান্সিস আর তার তিন-চারজন সঙ্গী পাহারাদার খুব কাছাকাছি চলে এলো। তারপর একটুক্ষণ অপেক্ষা করেই সুযোগ বুঝে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সৈন্য ক’জনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো। ফ্রান্সিস একটা মশাল নিয়ে খড়ের গাদা আর কেরোসিন কাঠের বাক্সের ওপর ছুঁড়ে দিলো। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো। অন্য পাহারাদারেরা ছুটে এলো। ওরা তাড়াতাড়ি কোমরে তরোয়াল গুঁজে বালতি নিয়ে সমুদ্র ঘাট থেকে জল তুলতে লাগল। আর আগুনে ছিটিয়ে দিতে লাগল। কিন্তু আগুন নিভলো না, বরং বেড়েই চললো। জাহাজেনা আগুন লেগে যায়, এই জন্য ওরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এই গোলমালের মধ্যে ফ্রান্সিস একটা ভালো দেখে জাহাজ লক্ষ্য করে, জাহাজঘাটা থেকে পাতা তক্তার ওপর দিয়ে ছুটলো, সঙ্গী কয়েকজনও ছুটলো। হাতে একটা মশাল নিয়ে ও জাহাজের ডেক-এর ওপর দাঁড়িয়ে নাড়তে লাগলো। জাহাজঘাটায় লুকিয়ে থাকা বন্ধুরা দ্রুত ছুটে গিয়ে জাহাজটায় উঠলো। তাড়াতাড়ি নোঙর তুলে নিলো ওরা। একদল চলে গেল দাঁড়ঘরে। দাঁড় বাইতে লাগলো। জাহাজ মাঝসমুদ্রের দিকে এগিয়ে চললো। এতক্ষণে যে সৈন্যরা আগুন নেভাচ্ছিল, তারা দেখলো একটা জাহাজ মাঝসমুদ্রের দিকে ভেসে চলেছে। তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। জাহাজটাকে আর ফেরাবার উপায় নেই।
