হ্যাঁ, হ্যাঁ। মরুভূমিতে হয় আর এখানে হবে না? খেজুর গাছ বাঁচেও অনেক বছর। রামাদ্দি বলল।
ফ্রান্সিস মুখ তুলে দেখল বেশ উঁচু গাছ দুটো। ছুঁচোলো পাতাগুলো অনেকটা ছড়ানো। খেজুরও হয়েছে। তবে পাকা নয়, কাঁচা।
এগুলো কেমন জাতের খেজুর গাছ? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
একবার ওপরের দিকে তাকিয়ে নিয়ে রামাদ্দি বলল, খুব ভালো জাতের খেজুর গাছ। এসব গাছের খেজুর খুব মিষ্টি হয়। এবার ফিরে চলুন। রামাদ্দি একটু বিরক্ত হয়েই বলল।
সাপের ভয়? তাই না? ফ্রান্সিস হেসে বলল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। কখন দুটো-একটা ফোঁস করে ওঠে তার কি ঠিক আছে?
ঠিক আছে, চলুন। পরে না হয় আসা যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
বন-জঙ্গল, ঝোঁপঝাড় ঠেলে তিনজন বেরিয়ে এল।
আর কিছু দেখার আছে? আমার তো মনে হয়
রামাদ্দিকে থামিয়ে ফ্রান্সিস বলল, দেখি ভেবে।
পাটা-ভাঙা, পাথর-ছড়ানো রাস্তাটা দিয়ে তিনজনে পাহাড়ি রাস্তাটায় উঠল। চলল সেই গিরিসংকটের দিকে। বেলা বেড়েছে। খিদেও পেয়েছে। রামাদ্দি দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, আমি তাহলে চলি?
কালকে সকালে আসবেন কিন্তু। ঐ দুর্গে যাব।
ঠিক আছে। বেশ ব্যাজার মুখে রামাদ্দি বলল। তারপর আস্তে আস্তে চলে গেল।
ঘেরা জায়গার বন্দীশালায় আসতে বিনোলারা কয়েকজন এগিয়ে এল। শাঙ্কো ভাঙা দুর্গ দেখার অভিজ্ঞতার কথা বলতে লাগল।
.
রাতে ওপরের তারাজ্বলা কালো আকাশ আর ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস ভাবতে লাগল–হাতে সময় বেশি নেই। যত দ্রুত সম্ভব ঐ ধনৈশ্বর্যের ভাণ্ডার খুঁজে বের করতে হবে। মারিয়া, হ্যারি আর কতদিন ঐ বাড়িতে থাকতে পারবে? কিন্তু কোনও সূত্রই তো আজ পাওয়া গেল না।
পরের দিন সকালে রামাদ্দি এল। আবার তিনজন দুর্গের দিকে চলল। রামাদ্দির মুখে হাসি নেই। ফ্রান্সিস আড়চোখে ওর মুখ দেখে বুঝল, কবিতার ভাবনা ছেড়ে এইসব ধনৈশ্বর্যের সন্ধান ওর কবিস্বভাবের বিরোধী। কিন্তু উজিরের হুকুম। ও নিরুপায়।
ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে সন্তর্পণে ওপরে উঠতে উঠতে ফ্রান্সিস ভাবল, প্রথমেই খুঁজে বের করতে হবে কোন ঘরে কবি আবিদি স্বেচ্ছাবন্দী ছিলেন। ফ্রান্সিস আবার সেই ধসে পড়া মেঝে আর ভাঙা জানলাটার কাছে এল। ভাঙা প্রায় চৌকোনা খোঁদলটা দিয়ে পেছনের বন-জঙ্গলের দিকে চেয়ে রইল। আবার সেই জোড়া খেজুর গাছ দুটো অন্য গাছগুলির মধ্যে দিয়ে বেশ দেখা যাচ্ছে। বোধহয় ছড়ানো থাকায় খেজুর গাছের পাতাগুলিও দেখা যাচ্ছে। এবার ফ্রান্সিস নীচে ভাঙা পাথরের পাটাগুলির দিকে তাকাল। ভালো করে হিসেব করে দেখল মেঝের পাথরের পাটাগুলি ভেঙে পড়লেও সব একেবারে নীচে পড়ে যায়নি। কারণ, নীচের ঘরের মেঝেটা অটুট আছে। সেখানেই ভাঙা পাথরের পাটাগুলি পড়েছে। কিছু লোকের সাহায্য পেলে সরানো যাবে। যদি ধরে নেওয়া যায় এখানে একটা ঘর ছিল তাহলে এই ঘরে যা কিছু ছিল, যেমন খাওয়ার বাসন-কোসন, জলের জায়গা, শোবার জন্য কাঠের কোনও আসবাব সবই চাপা পড়ে গেছে পাথরের পাটার তলায়। ফ্রান্সিস রামাদ্দিকে বলল, ঐ তলার পাথরের ভাঙা পাটাগুলি সরাতে হবে। আপনি উজিরকে গিয়ে বলুন আমাদের কিছু লোক লাগবে। আমরা মাত্র তিনজন ওসব সরাতে গেলে সাত-আটদিন লেগে যাবে।
কিন্তু ওসব সরিয়ে কী হবে? রামাদ্দি কিছুই বুঝে উঠতে পারল না।
ঠিক আছে। আগে তো জায়গাটা পরিষ্কার করা হোক। ফ্রান্সিস বলল।
কী যে পাগলামি! রামাদ্দি বিরক্ত হয়ে বলল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল, আমার পাগলামি বলেই ধরে নিন না। তারপর বলল, কাজটা আমি এখনই শুরু করতে চাই। দেশে ফিরব। খুব তাড়া আমাদের।
কিন্তু এখন উজিরের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তো উনি খেপে যাবেন। আপনাদের ছেড়ে চলে এলাম কেন তার জবাবদিহি তো করতে হবে। রামাদ্দি বলল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। উনি খুব বুদ্ধিমান মানুষ তো। ধরে নিতে পারেন এটা আমাদের দুজনের পালাবার ফিকির। ফ্রান্সিস বলল।
কী জানি! রামাদ্দি কথাটা ঠিক বুঝল না।
ফ্রান্সিস হেসে বলল, কাল থেকে এখানে আসা-যাওয়ার সময় পাগড়িপরা একজন লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। উজিরের নজরদারিতে কোনও ফাঁক নেই। এক কাজ করুন–ঐ লোকটিকে বলুন এখানে এসে আমাদের নজরে রাখতে। সুবিধে পেলে আমরা পালিয়ে যেতে পারি একথাও বলবেন।
একটু ভেবে নিয়ে রামাদ্দি বলল, ঠিক আছে, যাচ্ছি। এসব ঝামেলা যত তাড়াতাড়ি মিটে যায় ততই ভালো।
কথাটা বলে রামাদ্দি নীচে নেমে গেল। কিছুক্ষণ পরে সেই পাগড়িপরা লোকটি এল। কোনও কথা না বলে একটা লম্বা পাথরের পাটাতনে চুপ করে বসে রইল। ভাবভঙ্গি নির্বিকার।
রাজি হবে? শাঙ্কো দেশের ভাষায় মৃদুস্বরে বলল।
আলবৎ রাজি হবে! ধনৈশ্বর্য পাবে অথচ একটা আঙুল নাড়ার কষ্টও হবে না এ হয়? ফ্রান্সিসও দেশিয় ভাষায় বলল।
ফ্রান্সিস অপেক্ষা করতে লাগল। বেশ কিছু সময় গেল। রাস্তার দিকে পাথরের টুকরোর ওপর দিয়ে তোকজনের চলার শব্দ হল। একটু পরেই একদল যোদ্ধা উঠে এল। পেছনে রামাদ্দি।
নিন–লোকজন আনা হয়েছে। আপনার ইচ্ছে পূরণ করুন। একটু বিরক্তির সঙ্গেই রামাদ্দি বলল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–কবিরা বোধহয় একটু অভিমানী হয়। এবার রামাদ্দি হেসে বলল–সত্যি, এভাবে বলা আমার উচিত হয়নি। মাফ চাইছি।
ফ্রান্সিস যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে বলল–নীচে যে ভাঙা পাটা পাথরের স্তূপ পড়ে আছে, ওগুলো সব হাতে হাতে ফেলে দিতে হবে।
