প্রথমে কোথায় যাবেন? রামাদ্দি জানতে চাইল।
প্রথমে যাব ঐ ভাঙা দুর্গে। কারণ, ওখানেই কোনও একটা কক্ষে কেটেছে কবি আবিদির শেষ নির্বাসিত জীবন। তাই কিনা? ফ্রান্সিস বলল।
বেশ, চলুন। রামাদ্দি হাঁটতে শুরু করল।
পাথুরে পথ দিয়ে কিছুদূর এসে একটা বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে রামাদ্দি আঙুল তুলে ভাঙা দুর্গা দেখাল। কালচে শক্ত পাথরে গাঁথা দুর্গ যেমন হয়। দুর্গে যাবার পথটা একসময় নিশ্চয়ই বড় ছিল। পাথরে বাঁধানো ছিল। এখন পরিত্যক্ত। ভাঙা পাথর ছড়িয়ে আছে। তার ওপর দিয়ে দেখেশুনে হেঁটে চলল তিনজনে। এখানে-ওখানে বুনো ঝোঁপঝাড়। পাথরের ফঁক-ফোকরে সবুজ ঘাস গজিয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা প্রবেশদ্বারের কাছে এল। এখানে-ওখানে ভেঙে পড়লেও অর্ধচন্দ্রের মতো দেউড়িটা মোটামুটি দেখা যাচ্ছে। দেউড়ি পার হয়ে তিনজনে ভেতরে ঢুকল। উজ্জ্বল রোদে সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দুর্গ ঘিরে আধভাঙা প্রাকার দেখা গেল পেছনে। তাও সবটা দেখা গেল না। কারণ, মূল দুর্গের প্রায় গা ঘেঁষে শুরু হয়েছে বিরাট বিরাট গাছের জঙ্গল। খুব ঘন জঙ্গল নয়। ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে নানারকম গাছ। বোঝাই যাচ্ছে অনেক বছর ধরে এই গাছগুলো গজিয়েছে। বড় হয়েছে। বিনা যত্নেই।
রামাদ্দি, কবি আবিদি কোন কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিলেন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
এখানেই তো রহস্য। কেউ জানত না। তখন দুর্গা ছিল প্রায় জনশূন্য। শোনা যায়, তৎকালীন মুর শাসকের কিছু সৈন্য, কর্মচারী নাকি বিভিন্ন কক্ষে থাকত। তারা জানতই না যে অত বিখ্যাত একজন কবি সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি কারও সঙ্গে দেখা করতেন না। একমাত্র আবু হামিদ ছিল তার নিত্যসঙ্গী। শোনা যায়, আবু হামিদ ছিল নিরক্ষর। কবিই তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। প্রভুভক্ত আবু হামিদের কোনও পিছুটান ছিল না। ঘরসংসার বলেও কিছু ছিল না। সে নাকি কবিকে খাদ্য-পানীয় এনে দিত। তাও নাকি গভীর রাতে। রামাদ্দি বলল।
কিন্তু যেখান থেকে খাদ্য-পানীয় আনত তারা তো জানত। ফ্রান্সিস বলল।
মাত্র একজন খোঁড়া দোকানদারের কাছ থেকে আনত। আবু হামিদ নাকি অনেক মেতাশমেস মানে স্বর্ণমুদ্রা তাকে দিয়ে গেছিল। সেই খোঁড়া দোকানি কোনোদিন জানতেও পারেনি আবুহামিদ কে? জানতেও চায়নি কেন সে গভীর রাতে খাদ্য-পানীয় নিতে আসে। অত স্বর্ণমুদ্রা পেয়েই সে খুশি ছিল।
হুঁ, চলুন। যতখানি দেখা যায় আগে দেখে নিই। ফ্রান্সিস বলল।
চলুন। রামাদ্দি ওপরে ওঠার ভাঙা সিঁড়িটা। দেখিয়ে বলল।
ভারসাম্য বজায় রেখে ওরা ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। এপাশে-ওপাশে কয়েকটা ভেঙে পড়া মেঝে দেখে বোঝা গেল সেখানে থাকবার ঘর ছিল। তারপর ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডানদিকে ছোট বারান্দা মতো। তারপরেই ভাঙা মেঝের চিহ্ন। ওখান থেকে পেছনের প্রাকার পর্যন্ত বনজঙ্গল স্পষ্ট দেখা গেল। খুব মন দিয়ে চারপাশে তাকাতে তাকাতে ফ্রান্সিস বলল–এখানেও একটা ঘর ছিল। তবে মেঝেসুষ্ঠু ভেঙে পড়েছে। ওপরে তাকিয়ে খোলা আকাশ দেখল। এর পরে সিঁড়িটা অর্ধেক মতো উঠে একেবারে ভেঙে পড়েছে। আর ওপরে কিছু নেই। নীচের দিকে দেখল পাথরের পাটার। স্তূপ। ভাঙা-আস্ত মেশানো।
আর কিছু আস্ত নেই। রামাদ্দি বলল।
হ্যাঁ, চলুন।
তিনজনে নেমে আসতে লাগল। এবার ফ্রান্সিস লক্ষ করল একেবারে নীচে মোটামুটি আস্ত পাথুরে দেওয়ালে বন-জঙ্গলের দিকে একটা চৌকোনা ভাঙা ফোকর। ফ্রান্সিস ঐ ফোকরটার কাছে গেল। ফোকরটা ভালো করে দেখেটেখে বুঝল এখানে একটা জানলা ছিল। নীচে ভাঙা পাথরের স্থূপে দেখল একটা লোহার ডাণ্ডা কিছুটা উঁচিয়ে আছে। রামাদ্দির দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস বলল–তাহলে এই দুর্গের জানলাগুলিতে লোহার গরাদ বসানো ছিল।
আস্ত দুর্গা-যারা দেখেছে তারা তো কেউ বেঁচে নেই যে বলবে জানলা ছিল কি না। তবে এব্রো উপত্যকার একটা খুব পুরোনো দুর্গে মোটা মোটা গরাদ বসানো জানলা দেখেছি। বেশির ভাগই অবশ্য ভাঙা। রামাদ্দি বলল। তারপর বলল–ফিরে চলুন। এই ভাঙা দুর্গে কেউ আসে না। এই দুর্গে জঙ্গলে বড় সাপের উপদ্রব। বিষধর সব সাপ।
তিনজনে সাবধানে নেমে এল আধভাঙা সিঁড়ি দিয়ে।
পেছনের বন-জঙ্গলটা একবার দেখে আসি। ফ্রান্সিস বলল।
রামাদ্দি আঁতকে উঠে বলল–মাথা খারাপ! সাপের আড্ডা ওখানে।
কী করে জানলেন?
বাঃ! ভাঙা দুর্গে তো অনেক সময় দামি ধনরত্ন গোপনে রাখা হয়। অন্তত পাঁচজন চোর সেই ধনরত্ন খুঁজতে এসে নাকি সাপের কামড়ে মারা গেছে। রামাদ্দি বলল।
রামাদ্দি ফ্রান্সিস হেসে বলল–ধনরত্ন যেটুকু ছিল তা আগেই লোপাট হয়ে। গিয়েছিল। মনে হয় ওরা রাতের অন্ধকারে এসেছিল বলেই সাপের মুখে পড়েছিল। এখন তো উজ্জ্বল রোদের দিন। চলুন, যতটা দেখা যায়।
রামাদ্দি বেজার হয়ে বলল, চলুন।
দুর্গের পাথুরে দেওয়ালে প্রায় গা লাগিয়ে জঙ্গল শুরু হয়েছে। ফ্রান্সিস একবার মাথা উঁচু করে যে ধসে-পড়া ঘর আর ভাঙা জানলাটা দেখেছিল সেটার বরাবর জঙ্গ লে ঢুকল। বেশ ঘন বন এদিকটায়। বনের নীচে এই দুপুরেও আবছা অন্ধকার। সাবধানে চারদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে বেশ কিছুটা চলে আসতেই দেখল দুটো জোড়া খেজুর গাছ। গাছ দুটোর মধ্যে মাত্র হাতখানেক দুরত্ব।
তাহলে এসব জায়গায় খেজুর গাছও হয়? ফ্রান্সিস রামাদ্দিকে জিগ্যেস করল।
