ঠিক আছে। আপনি আমাদের অনুমতি দিন। ফ্রান্সিস বলল।
তার মানে পালাবার ফিকির। উজির সেঁতো হাসি হাসল।
বন্ধুদের জন্য আমরা জীবন বিসর্জন দিয়ে থাকি। তাদের ফেলে রেখে হাজার প্রলোভনেও আমরা সরে পড়ি না। আমাদের এটুকু বিশ্বাস করতে পারেন। ফ্রান্সিস বলল।
ঠিক আছে। এবার আসল কথাটা বলো তো। সেই ঐশ্বর্য ধরো উদ্ধার করলে। তারপরে? উজির মৃদু হেসে জানতে চাইল।
মহামান্য খলিফা হাকিমকে সব ঐশ্বর্য সম্পদ দিয়ে দেব। আমরা একটা স্বর্ণমুদ্রাও নেব না। ফ্রান্সিস বলল।
আশ্চর্য! তোমরা এত নির্লোভ? উজির একটু অবাক হয়ে বলল।
হ্যাঁ মান্যবর। যে সম্পদ কষ্ট করে ঘাম-রক্ত ঝরিয়ে সঞ্চিত করিনি, তার প্রতি আমাদের বিন্দুমাত্র লোভ নেই।
বিশ্বাস হল না। উজির মাথা নাড়ল।
আপনিই প্রথম নন। এর আগেও অনেকেই আমাদের বিশ্বাস করেনি। তারপরে গুপ্ত ধনভাণ্ডার যখন উদ্ধার করেছি, তাঁরা উল্লসিত হয়ে অনেকে অর্ধেক ধনসম্পদ আমাদের দিতে চেয়েছেন। আমরা একটা সাধারণ সোনার আংটিও নিইনি। আর যদি আমাদের বিশ্বাস না করেন তবে মহাকবির ঐ স্বর্ণভাণ্ডার চিরদিনের জন্য নিখোঁজই হয়ে যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ। তোমার আর কী বলবার আছে? উজির বলল।
আর দুটো কথা। এক সভাকবি রামাদ্দি আমাদের সঙ্গী হবেন। কারণ আরবী ভাষা আমরা জানি না। কবি রামাদ্দি নানাভাবে আমাদের সাহায্য করতে পারবেন। ফ্রান্সিস বলল।
হুঁ। আর একটা? উজির জানতে চাইল।
যদি আমরা ঐ নিখোঁজ সম্পদ উদ্ধার করতে পারি তাহলে আমাদের সবাইকে মুক্তি দিতে হবে। ফ্রান্সিস বেশ জোর দিয়ে বলল।
ভেবে দেখি। উজির বলল।
আমারও তাড়াতাড়ি দেশে ফিরতে চাই। কাজেই কাল সকালের মধ্যে আমাদের খবর পাঠান। আমরা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে পারব না। ফ্রান্সিস বলল।
আমরাও একটা শর্ত আছে। উজির বলল।
বলুন।
ঐ সম্পদ উদ্ধার হলে সব তোমাদের গোপন রাখতে হবে। কাউকে বলা চলবে না। উজির আস্তে বলল যাতে প্রহরীরা শুনতে না পারে।
কিন্তু কবি রামাদ্দি তো আমাদের সঙ্গেই থাকবেন। ফ্রান্সিস বলল।
রামাদ্দি? ওটা উটের মতোই বোকা। উজির বিরক্তির সঙ্গে বলল।
তাহলে আমাদের নজরে রাখতে কেউ কি থাকবে না? ফ্রান্সিস বলল।
দরকার নেই। আমার লোকজনকে ফাঁকি দিতে পারবে না।
উজির ঘুরে দাঁড়াল। প্রহরীরা সার বেঁধে দাঁড়াল। উজির চলে গেল।
ফ্রান্সিসের বুঝতে অসুবিধা হল না উজিরের লক্ষ্য কী। খলিফাকে অন্ধকারে রেখে সব সম্পদ গোপনে আত্মসাৎ করবে। উজির আগে থেকে অনেকদূর ভেবে রেখেছে। উজির একই সঙ্গে বুদ্ধিমান আর ধূর্ত। এটা বুঝল। উজির চলে গেল ফ্রান্সিসদের সুযোগ দেওয়া যাবে কিনা এসব ভাবতে ভাবতে। রাতে চোখ বুজে ভীষণ ঠাণ্ডা পাথুরে মেঝেয় শুয়ে শুয়ে ফ্রান্সিস ভাবছিল উজির ওর প্রস্তাবে রাজি হবে কিনা। ও বুঝে নিয়েছে উজিরের সঙ্গে কথায় আর ব্যবহারে খুব সতর্ক থাকতে হবে। উজির সন্দেহবাতিক। বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলেই উজির বেঁকে দাঁড়াবে। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। মৃদুস্বরে বলল-ঘুমোওনি?
অনেক চিন্তা শাঙ্কো, ঘুম কী আসে! ফ্রান্সিস বলল।
কী ভাবছো? শাঙ্কো জিগ্যেস করল।
আকাশ-পাতাল। মৃদু হেসে ফ্রান্সিস বলল।
সাবধান ফ্রান্সিস। তুমি অসুস্থ হয়ে পড়লে—
মায়েদের মতো উপদেশ দিও না তো। শোনো, মনে হয় কাল সকালেই জানতে পারব উজির কী সিদ্ধান্ত নিল। আর একটা কথা, উজিরের সামনে বেস কিছু বলে কি বসো না। তোমরা চুপ করে থাকবে, যা কথা বলার আমি বলব।
শাঙ্কোর একটু অভিমান হল। কিন্তু কিছু বলল না। পাশ ফিরে শুল।
সকালে গরাদে মুখ চেপে একজন প্রহরী হেঁড়ে গলায় বলল–রামাদ্দি এসেছেন। ফ্রান্সিস কে? এখানে এসো।
ফ্রান্সিস তখন বসেছিল। বেশ দ্রুতই গরাদের কাছে এল। দেখল রামাদ্দি দাঁড়িয়ে আছে। মুখে হাসি নেই। ফ্রান্সিসকে দেখে বলে উঠল–এ কী ঝামেলায় ফেললেন আমাকে?
কোনও ঝামেলায় আপনাকে ফেলা হবে না। এবার বলুন মাননীয় উজির কী বললেন? ফ্রান্সিস সাগ্রহে বলে উঠল।
আপনাদের মধ্যে নাকি কী সব শর্তটর্ত হয়েছে। যাকগে, ওসব নিয়ে আমার কোনও আগ্রহ নেই। মাননীয় উজির বললেন, আপনারা কী সব খোঁজাখুঁজি করবেন, আমাকে আপনাদের সঙ্গে থাকতে হবে অর্থাৎ সাহায্য করতে হবে।
হ্যাঁ, আপনাকে কিছু করতে হবে না। আমাদের কাজ আমরা করব। প্রয়োজনে আপনার কাছে নানা বিষয় জানতে চাইব। ব্যস। আপনাকে একটা আঙুলও নাড়তে হবে না। ফ্রান্সিস বলল।
কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। রামাদ্দি দ্বিধান্বিত সুরে বলল।
সময় আসুক, সব জানবেন–বুঝবেন–দেখবেন। আমরা দেরি করব না। তাড়াতাড়ি দেশে ফিরব। আমরা আজ এখনই কাজে নামব।
বেশ, চলুন। কিন্তু উজিরের হুকুম, মাত্র দু’জন ছাড়া পাবেন।
মুশকিল হল। ঠিক আছে। প্রথমে দু’জনই থাকব। পরে আরও লোকজন লাগবে কিনা দেখি। ফ্রান্সিস বলল।
কোথায় যাবেন? রামাদ্দি জিগ্যেস করল।
ঐ আধভাঙা দুর্গে।
ওটা তো একটা পরিত্যক্ত দুর্গ। কখন ভেঙে পড়ে। রামাদ্দির আবার দ্বিধা।
বন্ধু রামাদ্দি, দুর্গের গাঁথনি অত পলকা হয় না। থাকগে, আমরা দুজন এখন বেরোতে চাই।
রামাদ্দি আর কথা না বাড়িয়ে প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে বলল–মাননীয় উজিরের হুকুম দু’জন বন্দীকে ছেড়ে দিতে হবে। আমার সঙ্গে যাবে ওরা।
একজন প্রহরী এগিয়ে এল। গরাদের তালা খুলে দিল। শাঙ্কোকে নিয়ে ফ্রান্সিস বেরিয়ে এল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল উজ্জ্বল রোদে ভরা এক সুন্দর সকাল। কিন্তু এই সৌন্দর্য দেখার বা মুগ্ধ হবার সময় কোথায়? সামনে তো অনিশ্চিত ঘটনার অন্ধকার। সেই অন্ধকারে খুঁজে বের করতে হবে মুক্তির আলো।
