অপূর্ব। পাথরের থামে কত কারুকাজ। ছাদে, দেওয়ালে কী সুন্দর ভাস্কর্য। রঙিন ছবি আঁশ। কবি রামাদ্দি বলল খলিফা নিজেও নাকি অবসর সময়ে এসবে হাত লাগিয়েছেন।
হুঁ। খলিফা হাকিম শিল্পী মানুষ। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়তে পড়তে বলল, ক্রেন ঠিকই বলেছিল।
জানো ফ্রান্সিস, রামাদ্দি খলিফা হাকিমের সভাকবি।
বলো কী! ফ্রান্সিস বেশ অবাক হয়ে বলল।
হ্যাঁ। অথচ কী বিনয়ী। কী ভদ্র! কোনো গর্ব নেই। ফিরে আসার সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে কত প্রশংসা করল। বলল আল্লার কাছে প্রার্থনা করেছি তিনি যেন আপনাকে দীর্ঘজীবন দান করেন। আর একটা কথা, আমি একটা কবিতার পুঁথি লিখেছি, সেটা আপনাকে সসম্মানে উপহার দেব। শুনে আমি তো অবাক।
সত্যি, রামাদ্দি অন্যরকম মানুষ। ফ্রান্সিস বলল।
.
পরদিন সকালে খাবার খাওয়া সবে শেষ হয়েছে, একজন প্রহরী গরাদের কাছ এ থেকে গলা বাড়িয়ে বলল–সিনাত্রা কে? এদিকে এসো।
সিনাত্রা উঠে গরাদের কাছে গেল। ফ্রান্সিস, শাঙ্কোও উঠে এল। গরাদের কাছে এসে দেখল রামাদ্দি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ধরা কালো সুতোয় বাঁধা পার্চমেন্ট, কাগজের একটা পুঁথি। সিনাত্রার দিকে পুঁথিটা বাড়িয়ে ধরে বলল কবিবন্ধু, আপনার জন্য এই সামান্য প্রীতি উপহার কাল সারারাত জেগে পর্তুগীজ ভাষায় অনুবাদ করেছি। আপনার বুঝতে সুবিধে হবে।
ভালো করেছেন। আরবী ভাষা তো সিনাত্রা বুঝত না। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
জানেন, পর্তুগীজ ভাষায় অনেক আরবী শব্দ মিশে গেছে। রামাদ্দি বলল।
সবই বুঝলাম। কিন্তু এই নরকে থাকলে আপনার কবিবন্ধু আর কতদিন বেঁচে থাকবেন? ফ্রান্সিস বলল।
রামাদ্দির মুখ একটু গম্ভীর হল। বলল–বলেছি তো এসব ব্যাপার থেকে আমি দূরে থাকি। আমার মনের শান্তি আমি নষ্ট হতে দিতে রাজি নই।
কিন্তু মাননীয় খলিফাকে যদি আমাদের এই দুঃখকষ্টের কথা জানানো হয়–
কোন লাভ নেই। এসব ব্যাপারে মহামান্য খলিফা উদাসীন। তাই তো দেশের সব ধর্মের সব মানুষ মহামান্য খলিফাকে এত ভক্তি করে, শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। শুনলে আশ্চর্য হবেন মহামান্য খলিফা যতদিন এখানে শাসনক্ষমতায় আছেন কোনো শত্রুর দ্বারা এদেশ আক্রান্ত হয়নি। তাঁর দরবারে বিচার-টিচার হয়, সব মানুষ তো লোভ ক্রোধ হিংসা থেকে মুক্ত নয়; কিন্তু অপরাধ খুব অল্পই হয় এখানে। রামাদ্দি বলল।
আচ্ছা, আপনি কবি আবিদি রব্বাহির নিখোঁজ ধনভাণ্ডারের কথা বলছিলেন। আমরা এরকম বহুদিন আগের নিখোঁজ গুপ্তধন উদ্ধার করেছি চিন্তা করে বুদ্ধি খাটিয়ে। যদি মহামান্য হাকিম আমাদের সেই সুযোগ দেন তবে
কোনও লাভ নেই। ধনসম্পদের প্রতি মহামান্য খলিফার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। রামাদ্দি মাথা নেড়ে বলল।
তবে মান্যবর উজিরকেই বলুন। ফ্রান্সিস বলল।
অত কথা আমি বলতে পারব না। আমি শুধু মান্যবর উজিরকে বলতে পারি ভাইকিংরা আপনাকে কিছু বলতে চান। এর বেশি আমি কিছু বলতে পারব না। রামাদ্দি বলল।
বেশ। তাই বলুন। কিন্তু শুধু এটুকু বললে উনি ভাববেন আমরা মুক্তির জন্য অনুরোধ করব। উনি আমাদের সঙ্গে কথা বলতে কোনো আগ্রহই বোধ করবেন না। ফ্রান্সিস বলল।
ঠিক আছে। আমি বলব একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে। এর বেশি একটি কথাও বলব না। রামাদ্দি বলল।
ওতেই হবে। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। ফ্রান্সিস বলল।
রামাদ্দি হেসে হাত বাড়িয়ে সিনাত্রার হাত ধরল। বলল–চলি কবিবন্ধু। তারপর রামাদ্দি আস্তে আস্তে হেঁটে গিয়ে রাস্তায় উঠল। সেই উদাস ভঙ্গিতে হাঁটতে লাগল।
অদ্ভুত মানুষ। ফ্রান্সিস অস্ফুট স্বরে বলল।
যাই বল ফ্রান্সিস–এরকম কবিতা-পাগল মানুষ আমি মাত্র একজনকে দেখেছি। সেই পাগল কবিকেই দেখেছিলাম। সিনাত্রা বলল।
কবিতার পুঁথিটার চামড়ার মলাটে আরবী ভাষায় নাম লেখা। নীচে পর্তুগীজ ভাষায় অর্থটা লেখা-বিষাদ। ওর মনটা খারাপ হয়ে গেল। এমন নাম কেন? কী বেদনা কবি রামাদ্দির?
বিকেলের দিকে গরাদের কাছ থেকে একজন প্রহরীর হাঁক শোনা গেল–মান্যবর উজির এসেছেন। ভাইকিংরা এখানে এসো। ফ্রান্সিস পাথুরে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসেছিল। উঠে তাড়াতাড়ি উজিরের কাছে এল। দেখল উজির ইয়েপুদা দাঁড়িয়ে। প্রহরীরা সন্ত্রস্ত। ইয়েপুদা বলল, তুমিই তো দলনেতা?
হ্যাঁ মান্যবর। ফ্রান্সিস মাথা ওঠানামা করল।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে ইয়েপুদা বলল কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে শুনি?
সে অনেক কথা। শুধু এইটুকু বলি যে আগে আমরা অনেক গুপ্তভাণ্ডার আবিষ্কার করেছি ছড়া নকশা পাণ্ডুলিপি এসবের সাহায্যে। সভাকবি রামাদ্দির কাছে শুনলাম অনেকদিন আগে আপনাদের বিখ্যাত কবি আবিদি রব্বাহির ঐশ্বর্য সম্পদ নিখোঁজ হয়ে গেছে। উনি নাকি ঐ আধভাঙা দুর্গের একটি কুঠুরিতে তার এক দীর্ঘদিনের সহচর আবু হামিদকে নিয়ে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।
হুঁ। ঠিকই শুনেছো। তারপর বলো। উজির বলল।
আপনি যদি দয়া করে অনুমতি দেন তবে আমরা কয়েকজন মিলে সেই ঐশ্বর্যভাণ্ডার উদ্ধার করতে প্রস্তুত। ফ্রান্সিসের কথা শেষ হতে উজির জোরে হেসে উঠল। বলল– জানো কয়েকজন শাসক জ্ঞানী পণ্ডিতদের নিয়ে ঐ স্বর্ণভাণ্ডার দীর্ঘদিন খুঁজেছিলেন। আমিও দরবারের দুই পণ্ডিতকে নিয়ে কম চেষ্টা করিনি। আর শোনামাত্র তুমি তা উদ্ধার করবে? পাগলের প্রলাপ।
