এটা একটা দুর্ঘটনা। শাঙ্কো বলল।
ঘটিয়েছি তো আমি। যাক গে, তোমাদের কারো লাগেনি তো? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
সে সামান্য। শাঙ্কো বলল।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। ফ্রান্সিস চুপ করে বসেছিল। পাথর গড়িয়ে পড়ার আগে ফ্রান্সিস আবছা একটা মোটা শেকড় দেখেছিল। শেকড়টা ধরতে চেয়েছিল তাড়াতাড়ি। বিপত্তি ঘটল। শেকড়টা কত লম্বা সেটাই দেখা হল না। অগত্যা দু’একদিন চুপ করে থাকতে হবে। পরে আবার উঠতে হবে।
এসময় একজন প্রহরী গরাদে মুখ চেপে গলা চড়িয়ে বলল–মহামান্য খলিফার দরবারে তোমাদের মধ্যে কে নাকি কী শুনিয়েছ। সে এগিয়ে এসো।
সিনাত্রা ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল–চলো তো ব্যাপারটা দেখি।
দুজনে গরাদের কাছে এলো। দেখল সেদিন দরবারে যে রোগামতন লোকটি মুখে মুখে কবিতা বলছিল সে দাঁড়িয়ে আছে। সিনাত্রাকে দেখে বলে উঠল, হ্যাঁ আপনি। শুনুন মহামান্য খলিফার আজ শরীর ভালো নেই। দরবারেও আসেননি। আজ রাতে মহামান্য খলিফার প্রাসাদেই গিজেলের এক মেহফিল হবে। সময়মতো মহামান্য খলিফার দুজন দেহরক্ষী আসবে। আপনাকে মেহফিলে নিয়ে যাবে। আবার পৌঁছে দেবে। আপনার গিজেল মহামান্য খলিফার খুব ভালো লেগেছে।
ওর নাম সিনাত্রা। খুব ভালো গান গায়। আমাদের দেশের ভেড়া-পালকদের গান ও জানে। ওর গলা খুব সুরেলা–ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে তো শুনতেই হবে। লোকটি বেশ উৎসাহের সঙ্গে বলে উঠল।
বুঝবেন না তো। ফ্রান্সিস বলল।
সুর তো বুঝব। পর্তুগীজ ভাষায় অর্থ বললে আরও ভালো লাগবে। ভেড়া পালকদের গান, মাটি-পাহাড়ের গান সরল সুন্দর। তাই কিনা? লোকটি হেসে বলল।
আপনার নামটা? ফ্রান্সিস বলল।
গরিবের নাম রামাদ্দি।
আপনি কবি?
আমি আর কী কবি! আমার কবিগুরু আবিদি রব্বাহি! কতো বছর আগেকার কবি! আজও বাজারে-ঘাটে-মাঠে লোকে সেইসব কবিতা সুর করে শোনায়। অনেক আরবী কবিতা তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। আমি তার দীন ভক্ত। রামাদ্দি হেসে বলল।
ফ্রান্সিস বলল–দেখুন রামাদ্দি, আমরা এখানে বড়ো কষ্টে আছি। আপনি যদি
ফ্রান্সিসকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই একটু যেন ভীত স্বরে রামাদ্দি বলে উঠল–এসব মান্যবর ইয়েপুদার হুকুম। এসব ব্যাপার আমাকে কিছু বলবেন না। আমি মুখে মুখে গিজেল বানাই, মেহফিলে বলি–ব্যস! এতেই আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।
ফ্রান্সিস বুঝল রামাদ্দিকে বিরক্ত করা উচিত হবে না।
রামাদ্দি এবার একটু দুঃখের সঙ্গে বলল–আমার কবিগুরু দরবারের গিজেল শুনিয়ে প্রচুর ধনসম্পদ পেয়েছিলেন। কিন্তু কী যে হল, তার শেষ জীবনটা স্বেচ্ছানির্বাসনে কেটেছে। যখন তার কবিখ্যাতি দেশকাল ছাড়িয়ে গেছে তখন এক গভীর রাতে সব ধনসম্পত্তি নিয়ে আর এক আবাল্যবন্ধু আবু হামিদকে সঙ্গে নিয়ে ঐ যে প্রায় ভেঙে পড়া দুর্গা দেখছেন তারই একটি ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারপর তার ও আবু হামিদের যে কী হল কেউ জানে না।
আর তার ধনসম্পদ? ফ্রান্সিস সাগ্রহে জিগ্যেস করল।
নিখোঁজ। কেউ জানে না কোথায় গেল সেই ধনসম্পদ। রামাদ্দি বলল।
একটু চুপ করে থেকে ফ্রান্সিস বলল ঠিক আছে। পরে আপনার কাছ থেকে যতটা আপনি জানেন শুনব। সিনাত্রা যাবে, সানন্দে যাবে। এ তো কত সম্মানের ব্যাপার।
তাহলে চলি।
রামাদ্দি চলে গেল। কেমন এক আত্মভোলা চলার ভঙ্গি। একবার পাহাড়ের দিকে তাকাচ্ছে, একবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। ফ্রান্সিস অনেকক্ষণ রামাদ্দির দিকে তাকিয়ে রইল।
রামাদ্দি সত্যিই কবি। অন্যরকম মানুষ। সিনাত্রা মৃদুস্বরে বলল।
ফ্রান্সিস বলল–সিনাত্রা, এসো কথা আছে।
ভেতরে ঢুকে দুজনে বসল। ফ্রান্সিস বলল–তুমি তো যাবে, যেভাবে হোক খলিফাকে বলবে আমরা বন্দী হয়ে পড়ে আছি। খুব কষ্ট আমাদের। আমাদের মুক্তি দিন।
ঠিক আছে। সুযোগ পেলেই বলব।
ফ্রান্সিস সরে এসে শুয়ে পড়ল।
দুপুর গড়িয়ে সন্ধে হল। কিছুক্ষণ পরে গরাদের পাশে মশাল জ্বালানো হল। প্রহরীর সংখ্যাও বাড়ল। তখনই খলিফার দুই দেহরক্ষী এল। বেশ বলিষ্ঠ চেহারা। গায়ে অন্যরকম জমকালো পোশাক। মাথায় শিরস্ত্রাণ। সিনাত্রা যে পোশাক পরেছিল, সেটা পরেই প্রহরীর সঙ্গে বেরিয়ে যাচ্ছে, ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–যা বলেছিলাম। সিনাত্রা মাথা নেড়ে বেরিয়ে এল। দেহরক্ষীদের সঙ্গে চলল।
গরাদ ধরে ফ্রান্সিস তাকিয়ে রইল। একটু আশান্বিত হল। হয়তো খলিফা এসব জানলে ওদের মুক্তি দিতে পারেন।
বেশ রাতে সিনাত্রা ফিরে এল। হাসিমুখে ফ্রান্সিসদের খলিফার দেওয়া পারিতোষিক নতুন সুন্দর পোশাক, পাঁচটা স্বর্ণমুদ্রা দেখাল।
ঠিক আছে। খলিফা হাকিম গুণীদের সম্মান দিতে জানেন। এবার আসল কথাটা বলো। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস, কড়া পাহারায় নিয়ে গেছে আমাকে। রক্ষীরা যেতে যেতে বলেছে পথে কারও সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। যে বিরাট ঘরটায় কবিগানের আসর বসেছিল সেখানে বেশ লোকজন জড়ো হয়েছিল। মুখে মুখে কবিতা বলা, গানটান চলল। শ্রোতারা সবাই। উৎসাহ দিয়ে উচ্চকণ্ঠে প্রশংসা করেছে। কিন্তু উজিরের সেদিকে কোনো নজর নেই। উৎসাহও নেই। সে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়িয়েছে। সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। আমি তো খলিফার কাছে যাবারই সুযোগ পাইনি। ফেরার পথেও কড়া পাহারা। সিনাত্রা বলল।
হুঁ। উজির ইয়েপুদা ধুরন্ধর লোক। যাগে, প্রাসাদ কেমন দেখলে?
