অন্ধকারে শাঙ্কো আস্তাসোকে নিয়ে এল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল, আস্তাসো, সেই। ওপরে ওঠার জায়গাটা দেখিয়ে দাও তো।
তাহলে উঠবেন? আস্তাসো একটু দ্বিধার সঙ্গে বলল।
আমার সংকল্প বড় দৃঢ়, আস্তাসো। মাথা নিচু করে চলো৷ ফ্রান্সিস বলল।
আস্তাসো আর কিছু বলল না। প্রায় হামা দিয়ে সে পাহাড়ের গা ঘেঁষে ভেতরের দিকে গেল। অন্ধকারে একটা জায়গায় এল। পেছনে পেছনে ফ্রান্সিসও এল। অন্ধকারে আস্তাসো উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে একটা ওঁচানো পাথরের মাথায় হাত দিয়ে বলল এই পাথরটা ধরে উঠতে হবে। নীচে একটা খোদল আছে। ওখানে পা চেপে উঠুন।
ফ্রান্সিস হাত বুলিয়ে খোদলটা পেল। ও পায়ের চাপে উঠে ওঁচানো পাথরটা ধরে পাহাড়ের গায়ে বুক চেপে উঠতে লাগল। ততক্ষণে শাঙ্কোরা চার-পাঁচজন ঠিক নীচে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে। ফ্রান্সিস হাত দিয়ে খুঁজে খুঁজে আর একটা বেশ উঁচিয়ে থাকা পাথর পেল। ওটা ধরে উঠতে শুরু করল। পাহাড়ের পাথরে বুক চেপে চেপে শরীরের ভর রেখে রেখে সেই সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য রেখে রেখে উঠতে ভাবল, সেই দুঃসাহসী যুবকটি কত রাত জেগে প্রহরীদের ফাঁকি দিয়ে এই পথটা বের করতে পেরেছে। হয়ত পাথর সরিয়ে ঘষে ঘষে এই পথ করেছে। সেই পাঁচ মৃত বন্দী কী কষ্ট করেই না উঠেছিল।
ফ্রান্সিস একটু থেমে দম নিল। হাঁপ ধরা ভাবটা একটু কমল। ওপরে তাকিয়ে তারার আলোয় দেখল ঝুঁকে পড়া কাটা গাছের কাণ্ডের অনেকটা আবছা দেখা যাচ্ছে। তখনও ওখানে পৌঁছতে হাত পাঁচেক উঠতে হবে। ফ্রান্সিস হাত বাড়িয়ে একটা ওঁচানো পাথর পেল ওপরে ডানদিকে। পাথরটার পাশেই হাতে ঠেকল একটা লম্বাটে মোটা দড়ির মতো। বুঝল, গাছটার শেকড় নেমে এসেছে। শেকড়টা আস্তে টেনে দেখল বেশ শক্ত। ভাবল, এই শেকড়ের সবটা টেনে বের করতে পারলে বাকি পাঁচ হাত পার হয়ে অনায়াসে কাটা কাণ্ডটা ধরা যাবে। অত সতর্ক ঠান্ডা মাথার ফ্রান্সিসও মুক্তির আনন্দে ভুল করে বসল। শেকড়টা ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিল। শেকড় বেশ কিছুটা বেরিয়ে এল সত্যি, কিন্তু ওঁচানো পাথরটা খুলে এসে পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে জোরে গড়গড় শব্দ তুলে পাথরটা গিয়ে পড়ল ঘুমন্ত কোনো বন্দীর ওপর। মুর যুবকটি ঘুম ভেঙে চিৎকার করে উঠল–মাথাটা গেল! ও-ও মাথাটা গেল! মুহূর্তে ফ্রান্সিস হাত-পা ছেড়ে দিয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে নেমে এল। পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দে সচকিত বন্ধুরা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ন্ত ফ্রান্সিসকে হাত বাড়িয়ে আটকাল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল–শুয়ে পড়ো। ওদিকে মুর যুবকটিও চাঁচামেচি শুরু করেছে। অনেক বন্দীই ততক্ষণে ঘুম ভেঙে উঠে বসেছে। একটু পরেই প্রহরীরা গরাদের কাছে ছুটে এল! একজন গলা চড়িয়ে বলল–ওপর থেকে পাথর গড়িয়ে পড়েছে। একজনের মাথায় পড়েছে। পাথর গড়িয়ে পড়া দেখিনি কোনোদিন।
ও। ঠিক আছে। শুয়ে পড়ো৷ প্রহরীটি বলল।
তোমাদের বৈদ্যিকে ডাকো।
বৈদ্যি নয়। হেকিম। হেকিম তোমাদের জন্যে রাত জেগে বসে আছে না? প্রহরী বলল।
খুব লেগেছে। শাঙ্কো বলল।
ঠিক আছে। কাল সকালে দেখা যাবে। প্রহরী সরে গেল।
শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এসে বলল–প্রহরীদের বললাম। কানেই নিল না।
ওরা এরকমই। শুধু হুকুম তামিল করতে পারে আর বন্দীকে পালাতে দেখলে নির্দ্বিধায় হত্যা করতে জানে।
তখনই আস্তানো ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–কেমন আছেন?
মনটা ভালো নেই। একজন নিরীহ মানুষকে আহত করলাম। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
আপনি তো ইচ্ছে করে পাথর ছুঁড়ে মারেননি। এ তো দুর্ঘটনা। নিজেকে দোষী মনে করবেন না।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল–যাও, আহত লোকটিকে দেখে এসো।
শাঙ্কো তাড়াতাড়ি সেই মুর যুবকটির কাছে এল। অন্ধকারে মাথায় হাত বুলিয়ে দেখে বুঝল ফেটে যায়নি। ও তাড়াতাড়ি ওর কোমরবন্ধনী ছিঁড়ে যুবকটির মাথায় বেশ শক্ত করে বেঁধে দিল। যুবকটি একটু আরাম পেল। গোঙানি বন্ধ হল।
সকালে শাঙ্কো গরাদের সামনে গিয়ে তাগাদা দিল। কিছুক্ষণ পরে দরজা খোলা হল। লম্বাটে, রোগা, সাদা দাড়ি-গোঁফ-ওয়ালা তালিমারা ঝোলা কাঁধে হেকিম ঢুকল। শাঙ্কো হেকিমকে আহত যুবকটির কাছে নিয়ে এল। ও ফেট্টি খুলে ফেলল। আস্তে ক্ষত জায়গাটার চারপাশে চাপ দিয়ে দেখল। চোখ দেখল। তারপর শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে আরবি শব্দ মেশানো পোর্তুগীজ ভাষায় বলল–ফাটেনি। সেরে যাবে। বলে ঝোলা থেকে বোয়াম বের করল। ভেন-এর মতোই দু’হাতে একটা কালো দলামতো নিল। ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিল। তারপর হাতের তালুতে অন্য বোয়াম থেকে কী নিয়ে চেপে চেপে ঘুরিয়ে কয়েকটা বড়ি বানাল। বোয়াম ঝোলায় ভরে উঠে দাঁড়াল। বলল– ভয় নেই। চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই সেরে যাবে। হেকিম চলে গেল। শাঙ্কো যুবকটির পাশে বসে বলল–সব কথা তো ভাই বলা যাবে না। এটাকে দুর্ঘটনা বলেই মনে করো। কোনো অসুবিধে হলে আমাকে ডেকো। এখন শুয়ে বিশ্রাম করো।
শাঙ্কো ফ্রান্সিনের কাছে এল। কথাটা মনে হতেই বলল–তুমিও দেখিয়ে নিলে পারতে।
কী যে বল! ওরা অভিজ্ঞ বৈদ্যি। বুকে, কনুইয়ে, হাঁটুতে হাচড়ানোর দাগ থেকে সব বুঝে ফেলবে।
খুব কেটেছে? শাঙ্কো বলল।
ফ্রান্সিস বলল, দু-তিনটে জায়গায় পাথরের খোঁচায় বেশ কেটে গেছে। বুঝতে পারছি রক্ত বেরিয়ে এসেছে। বাকি জায়গা ছড়ে গেছে। ভীষণ জ্বালা করছে। কিন্তু আমার কোনো শব্দ করার উপায় নেই। প্রহরীদের কানে গেলে সন্দেহ করবে। একটু থেমে বলল–আমার বেশি কষ্ট হচ্ছে না। একটা নিরীহ মানুষকে আহত করলাম।
